ক্রিকেট মাঠে ব্যাট হাতে একসময় দাপট দেখিয়েছেন। আবার সেই ক্রিকেটের গণ্ডি পেরিয়ে পা রেখেছেন বলিউডের ঝলমলে জগতে। অভিনয় করেছেন ধর্মেন্দ্র, বিনোদ খান্না ও শাম্মি কাপুরের মতো তারকাদের সঙ্গে। ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন আলোচনায়—ভারতীয় অভিনেত্রী রিনা রায়কে বিয়ে করে তৈরি করেছিলেন দুই দেশের ক্রিকেট ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে বিরল এক সম্পর্কের গল্প।
তিনি পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার মহসিন খান।
১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর। ভারত ও পাকিস্তানের টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচ তখনও শুরু হয়নি। এর মধ্যেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের খ্যাতনামা পরিচালক জে পি দত্তা মহসিন খানের সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। দেখা হওয়ার পর সরাসরি তাঁকে নিজের ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন।
মহসিন তখন ক্রিকেট নিয়েই ব্যস্ত। দেশের হয়ে যত দিন সম্ভব খেলতে চান—এ কথা জানিয়ে পরিচালককে বলেছিলেন, ক্রিকেট ছাড়ার পর তিনি অভিনয়ের প্রস্তাব রাখবেন।
কিছুদিন পর মুম্বাইয়ে আবার দেখা হয় দুজনের। জে পি দত্তা তখন তাঁকে নিজের প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিয়ে জানান, ছবিতে ধর্মেন্দ্র ও বিনোদ খান্নাকে নেওয়া হয়েছে। মহসিনকে তিনি তৃতীয় নায়ক হিসেবে চান। এভাবেই শুরু হয় পাকিস্তানি ক্রিকেটার মহসিন খানের বলিউডযাত্রা।
রিনা রায়ের সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে
মহসিন খানের চলচ্চিত্রজীবনের গল্পে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম রিনা রায়। জে পি দত্তার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল এবং মহসিনের অভিনয়জীবন শুরু ও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও রিনা রায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
লন্ডনে মহসিন খানের সঙ্গে রিনা রায়ের প্রথম পরিচয়। সে সময় মহসিন ইংল্যান্ডে লিগ ক্রিকেট খেলছিলেন। রিনা রায় সেখানে গিয়েছিলেন মহসিনের বোনের সঙ্গে। তাঁর বোনই দুজনের পরিচয় করিয়ে দেন।
চলচ্চিত্রের প্রতি মহসিনের তখন তেমন আগ্রহ ছিল না। এমনকি রিনা রায়কে বিয়ে করার আগে তাঁর কোনো ছবিও দেখেননি বলে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গড়ায় প্রেমে। ১৯৮৩ সালে তাঁরা বিয়ে করেন।
তখন দুজনই নিজ নিজ ক্যারিয়ারের শীর্ষে। একজন পাকিস্তানের তারকা ক্রিকেটার, অন্যজন ভারতের জনপ্রিয় অভিনেত্রী। ফলে তাঁদের বিয়ে দুই দেশের সংবাদমাধ্যমেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
বিয়ের পর রিনা রায় চলচ্চিত্র থেকে সরে গিয়ে পাকিস্তানে বসবাস শুরু করেন। তবে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। পরে রিনা রায় ভারতে ফিরে এসে আবার চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। তাঁদের একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। মেয়ের অভিভাবকত্ব নিয়েও একসময় দুজনের মধ্যে আইনি লড়াই হয়েছিল।
‘বাঁটওয়ারা’ দিয়ে বলিউডে অভিষেক
মহসিন খানের বলিউড অভিষেক হয় জে পি দত্তার ‘বাঁটওয়ারা’ ছবির মাধ্যমে। ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন ধর্মেন্দ্র, বিনোদ খান্না ও শাম্মি কাপুরের মতো তারকারা।
অভিনয়ে আগে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় বড় তারকাদের সামনে কাজ করা সহজ ছিল না। তবে জে পি দত্তার নির্দেশনা মহসিনকে অনেক সাহায্য করে।
একটি দৃশ্য বোঝাতে পরিচালক ক্রিকেটের উদাহরণ টেনে বলেছিলেন—ধরুন, আপনি শতরান করেছেন, কিন্তু আপনার দল ম্যাচ হেরে গেছে। সেই পরিস্থিতিতে আনন্দের বদলে কীভাবে বেদনার অনুভূতি প্রকাশ করবেন, সেটিই অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলতে হবে।
‘বাঁটওয়ারা’য় অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে মনোনয়নও পেয়েছিলেন মহসিন খান। তবে শেষ পর্যন্ত পুরস্কার জেতেন ‘পারিন্দা’ ছবির জন্য নানা পাটেকর।
মহসিনের ব্যক্তিগত পছন্দের ছবির তালিকায় রয়েছে মহেশ ভাট পরিচালিত ‘সাথী’। বলিউডে মোট ১৩টি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মহানতা’ ছিল তাঁর শেষ বলিউড ছবি।
পাকিস্তানি ছবিতেও অভিনয়
বলিউডের পাশাপাশি পাকিস্তানি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন মহসিন খান। তাঁর প্রথম পাকিস্তানি ছবি ছিল ‘রাজ়’। এতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন বাবরা শরিফ। পরে ‘পিয়াসা সাওয়ান’ ছবিতেও তাঁর সঙ্গে জুটি বাঁধেন এই অভিনেত্রী।
‘হাথি মেরে সাথী’, ‘জান্নাত’, ‘ইনসানিয়ত’, ‘বেটা’, ‘সব কে বাপ’, ‘চোরো কে বাপ’, ‘ঘুঙঘট’, ‘দিল তেরা আশিক’ ও ‘চলতি কা নাম গাড়ি’সহ বেশ কয়েকটি পাকিস্তানি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। পাকিস্তানে তাঁর শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘সালা বিগড়া যায়ে’, যা মুক্তি পায় ১৯৯৯ সালে।
ক্রিকেটে আসা যেভাবে
মহসিন খান জন্মেছিলেন একটি শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর বাবা ছিলেন পাকিস্তান নৌবাহিনীর কর্মকর্তা এবং মা শিক্ষক ও ভাইস প্রিন্সিপাল। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলায় আগ্রহী ছিলেন তিনি।
ছাত্রজীবনে বিভিন্ন খেলায় অংশ নিলেও ক্রিকেট তাঁর প্রধান পছন্দ ছিল না। বরং পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও গণিত নিয়ে পড়াশোনা করতেন। এক ম্যাচে খেলোয়াড় সংকট দেখা দিলে পদার্থবিদ্যার শিক্ষক মুকাররম শেরওয়ানি তাঁকে কলেজ দলের হয়ে খেলতে বলেন।
সেই ম্যাচেই শতরান করেন মহসিন। ম্যাচের আম্পায়ার উমর খান, যিনি সাবেক প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার ও টেস্ট আম্পায়ার ছিলেন, তাঁর ব্যাটিং দেখে ক্রিকেটকে গুরুত্ব দিয়ে খেলার পরামর্শ দেন। এরপরই ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে একটি ত্রিশতকও করেন মহসিন। পরে করাচি ও পাকিস্তান ইউনিভার্সিটিজ দলের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেন।
লর্ডসে ঐতিহাসিক দ্বিশতরান
১৯৮২ সাল ছিল মহসিন খানের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময়। লাহোর টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শতরান করার পর আত্মবিশ্বাস বাড়ে তাঁর। এরপর লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেন ঐতিহাসিক দ্বিশতরানের ইনিংস।
তাঁর সেই ইনিংস পাকিস্তানের লর্ডসে প্রথম টেস্ট জয়ের ভিত গড়ে দেয়। একই বছরে এক ক্যালেন্ডার বছরে এক হাজার টেস্ট রান করা প্রথম পাকিস্তানি ব্যাটারও হন মহসিন খান। ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও সে বছর টেস্ট শতরান করেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টানা দুই শতরান
১৯৮৩-৮৪ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়া সফরেও দুর্দান্ত ব্যাটিং করেন মহসিন। অ্যাডিলেডে ১৪৯ এবং মেলবোর্নে ১৫২ রানের ইনিংস খেলেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টানা দুই টেস্টে কোনো পাকিস্তানি ব্যাটারের শতরান করার সেটিই ছিল প্রথম ঘটনা। ডেনিস লিলি, রডনি হগ, জেফ লসন ও কার্ল রাকম্যানদের মতো গতিময় বোলারদের বিপক্ষে এই ইনিংসগুলো খেলেছিলেন তিনি।
তবে অ্যাডিলেডের সেই ইনিংসের সঙ্গে একটি আক্ষেপও জড়িয়ে আছে। কিংবদন্তি ডন ব্র্যাডম্যান গ্যালারিতে বসে মহসিনের ব্যাটিং দেখছিলেন। কিন্তু মহসিন শতরান পূর্ণ করার আগেই অসুস্থতার কারণে ব্র্যাডম্যান মাঠ ছেড়ে চলে যান। ফলে তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ আর হয়নি।
নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছিল শতরান
১৯৮৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লাহোর টেস্টেও আলোচনায় আসেন মহসিন। ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে নামার আগে জানতে পারেন, টেস্ট সিরিজ শেষে ওয়ানডে সিরিজের দল থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তবে মাঠে নেমে দুর্দান্ত শতরান করেন তিনি। তাঁর পারফরম্যান্সের পর নির্বাচকেরা দল ঘোষণার সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন।
শতরানের পর প্রধান নির্বাচক হাসিব আহসান তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে পরের সিরিজেও একইভাবে খেলার আশা প্রকাশ করেন। জবাবে মহসিন জানতে চান, তাঁকে কি পরবর্তী সিরিজে খেলার বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল? এ নিয়ে দুজনের মধ্যে তিক্ত কথোপকথনও হয়।
মুদাস্সর নজরের সঙ্গে সফল জুটি
মুদাস্সর নজরের সঙ্গে মহসিন খানের ওপেনিং জুটি ছিল পাকিস্তান ক্রিকেটের অন্যতম সফল জুটি। উইজডেন ২০০৮ সালে টেস্ট ক্রিকেটের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে সর্বকালের সেরা ১০টি ওপেনিং জুটির তালিকায় তাঁদের নবম স্থানে রেখেছিল।
টেস্টে একসঙ্গে ৫৪ ইনিংসে ওপেন করে তাঁরা সংগ্রহ করেন ২ হাজার ৫৪ রান। তাঁদের জুটিতে ছিল তিনটি শতরান ও ১৬টি অর্ধশতরান।
ক্রিকেট থেকে কোচিং ও প্রশাসনে
ক্রিকেটার হিসেবে অধ্যায় শেষ করার পরও ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি মহসিন খান। পরবর্তীকালে পাকিস্তান জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক এবং প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করেন।
কোচ হিসেবে তাঁর অন্যতম বড় সাফল্য ছিল ইংল্যান্ডকে টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করা। সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন মিসবাহ-উল-হক। শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ সফরেও তাঁর কোচিংয়ে পাকিস্তান দল তিন সংস্করণেই সাফল্য পেয়েছিল।
পরে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন মহসিন খান।
ক্রিকেট নাকি চলচ্চিত্র—কোনটি বেশি কঠিন?
মাত্র ৩১ বছর বয়সে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছিলেন মহসিন খান। ক্রিকেট মাঠে তাঁর স্টাইলিশ উপস্থিতি যেমন আলোচনায় ছিল, তেমনি ছিল ব্যাটিংয়ের নান্দনিকতা।
ক্রিকেট ও চলচ্চিত্র—দুই জগতেই কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে কোনটি বেশি কঠিন, এমন প্রশ্নের উত্তরে মহসিন ক্রিকেটকেই এগিয়ে রেখেছেন।
তাঁর যুক্তি, চলচ্চিত্রে ভুল হলে পুনরায় দৃশ্য ধারণের সুযোগ থাকে। কিন্তু ক্রিকেটে মাঠে করা ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। মুহূর্তের সিদ্ধান্ত ও পারফরম্যান্সই হয়ে থাকে চূড়ান্ত।
ক্রিকেটার হিসেবে আন্তর্জাতিক সাফল্য, বলিউডে অভিনয়, এরপর কোচ ও ক্রিকেট প্রশাসক—মহসিন খানের জীবন তাই পাকিস্তানি ক্রিকেটের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়।



.png)
.png)