কফি
সন্ধ্যায় এক কাপ কফি খেয়েও কেউ সহজেই ঘুমিয়ে পড়েন, আবার কারও অস্থিরতা বাড়ে, রাতে ঘুম আসে না। একই পানীয়ের প্রভাব মানুষের শরীরে আলাদা হয় কেন? বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, এর পেছনে রয়েছে জিনগত বৈশিষ্ট্য, যকৃতের কার্যক্রম এবং নিয়মিত কফি পানের অভ্যাস।
লন্ডনের একটি ক্যাফে থেকে সন্ধ্যা ৬টায় বের হচ্ছিলেন ২০ বছর বয়সী এমিলি। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘কফি আমার ওপর তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না। সাধারণত দিনে দুই কাপ কফি খাই, কখনো এনার্জি ড্রিংকও পান করি।’
এমিলির মতো অনেকেই রাতে কফি পান করেও সহজে ঘুমাতে পারেন। অন্যদিকে, কারও শরীরে ক্যাফেইনের প্রভাব কয়েক ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি সময় থাকে।
ক্যাফেইন শরীরে কী করে?
বিবিসি জানিয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মনঃপ্রভাবক পদার্থগুলোর একটি ক্যাফেইন। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে ২০০ কোটির বেশি কাপ কফি পান করা হয়। কোলা, এনার্জি ড্রিংক, চকলেট, চুইংগাম ও শরীরচর্চার কিছু পরিপূরকেও ক্যাফেইন থাকে।
ক্যাফেইন ক্লান্তির অনুভূতি কমিয়ে সতর্কতা ও মনোযোগ বাড়াতে পারে। তবে এটি শরীরে নতুন শক্তি তৈরি করে না। বরং মস্তিষ্কে ঘুম ঘুম ভাব তৈরি করা অ্যাডেনোসিন নামের রাসায়নিকের কার্যক্রমে বাধা দেয়। ফলে ক্লান্তি থাকলেও সাময়িকভাবে তা কম অনুভূত হয়। তবে বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ করলে মাথাব্যথা, অস্থিরতা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া ও ঘুমের সমস্যা হতে পারে।
একই কফিতে প্রতিক্রিয়া আলাদা কেন?
কফি পান করার পর ক্যাফেইন রক্তের মাধ্যমে দ্রুত মস্তিষ্কে পৌঁছায়। পরে যকৃতের একটি এনজাইম এটি ভেঙে ফেলে। এরপর শরীর থেকে তা বের হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার গতি সবার ক্ষেত্রে এক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির পুষ্টিবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক মেরিলিন কর্নেলিস বিবিসিকে বলেন, শরীর থেকে ক্যাফেইন বের হতে ছয় থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত লাগতে পারে।
অর্থাৎ, এক কাপ কফি পান করার কয়েক ঘণ্টা পরও শরীরে ক্যাফেইন থেকে যেতে পারে। এর মধ্যে আবার কফি পান করলে অস্থিরতা বা উদ্বেগ বাড়তে পারে।
ক্যাফেইন ভাঙার প্রক্রিয়ায় সিওয়াইপি ওয়ান এ টু নামের একটি জিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বংশগত বৈশিষ্ট্যের কারণে কারও শরীরে ক্যাফেইন দ্রুত ভাঙে, কারও ক্ষেত্রে ধীরে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর প্রকাশিত একটি গবেষণায় ইউরোপীয় ও দক্ষিণ আমেরিকানদের শরীরে ক্যাফেইন তুলনামূলক দ্রুত ভাঙার তথ্য পাওয়া গেছে।
ধূমপান, ওষুধ ও অভ্যাসের প্রভাব
ক্যাফেইনের প্রভাব কতক্ষণ থাকবে, তা শুধু জিনের ওপর নির্ভর করে না। ধূমপান যকৃতে ক্যাফেইন ভাঙার গতি বাড়াতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ গতি ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। তবে ভেপিংয়ের ক্ষেত্রে একই প্রভাব দেখা যায় কি না, তা স্পষ্ট নয়।
এ কারণে ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার পর আগের মতো একই পরিমাণ কফি পান করেও কেউ কেউ বেশি অস্থিরতা অনুভব করতে পারেন।
বিবিসি জানিয়েছে, কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি ও অন্যান্য ব্যবস্থাপত্রের ওষুধ ক্যাফেইন ভাঙার গতি কমিয়ে দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনেও এ প্রক্রিয়া ধীর হয়। ফলে শরীরে ক্যাফেইনের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
নিয়মিত কফি পান করলে শরীর ধীরে ধীরে ক্যাফেইনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। ফলে একই পরিমাণ কফি পান করেও আগের মতো প্রতিক্রিয়া নাও হতে পারে। আবার কয়েক সপ্তাহ কফি পান বন্ধ রাখার পর শুরু করলে অস্থিরতা বা অতিরিক্ত চনমনে ভাব দেখা দিতে পারে।
ঘুমের আগে কখন কফি এড়াবেন?
ঘুমের অন্তত ছয় ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন ঘুমবিষয়ক গবেষকেরা। তবে এটি সবার জন্য একইভাবে কার্যকর নাও হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী ও ঘুম বিশেষজ্ঞ লিন্ডসে ব্রাউনিং বিবিসিকে বলেন, ক্যাফেইন শুধু ঘুম আসতে দেরি করায় না, ঘুমের মানও খারাপ করতে পারে।
তার পরামর্শ, কেউ যদি রাত ১০টায় ঘুমাতে যান, তাহলে দুপুর ২টার পর ক্যাফেইন এড়িয়ে চলতে পারেন। তবে ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা ব্যক্তিভেদে আলাদা হওয়ায় কারও ক্ষেত্রে আরও আগে কফি পান বন্ধ করা প্রয়োজন হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএসের পরামর্শ, গর্ভবতী নারীদের দিনে ২০০ মিলিগ্রামের কম ক্যাফেইন গ্রহণ করা উচিত। ফিল্টার কফির মাঝারি আকারের প্রায় দুই মগে এ পরিমাণ ক্যাফেইন থাকতে পারে। গবেষণায় ক্যাফেইন গ্রহণের সঙ্গে শিশুর কম ওজন নিয়ে জন্মানোসহ কিছু জটিলতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক পিটার রজার্স বলেন, ক্যাফেইন তুলনামূলক নিরাপদ হলেও অতিরিক্ত গ্রহণে অস্থিরতা ও অস্বস্তি হতে পারে। ঘনীভূত ক্যাফেইনযুক্ত পণ্য থেকে বিরল ক্ষেত্রে গুরুতর বিষক্রিয়াও ঘটতে পারে।
কফি নিয়ে কয়েক দশকের গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত কফি পানকারীদের মধ্যে কয়েকটি বড় রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকতে পারে। তাদের আয়ুও কিছুটা বেশি হতে পারে।
তবে কফি পানই এসব স্বাস্থ্যগত সুবিধার একমাত্র কারণ, তা গবেষকেরা নিশ্চিত করতে পারেননি।



.png)
.png)