তাওহিদ হৃদয়
প্রথম সেশনে ১৮৪ রানে ৭ উইকেট হারানোর পর দুই শ রান পেরোনোই কঠিন মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের জন্য। তাওহিদ হৃদয় ক্রিজে ছিলেন, তবে তাঁর কাছ থেকে এমন অবিশ্বাস্য কিছু দেখার প্রত্যাশা ছিল না কারও। মিরপুর টেস্টের দুই ইনিংসে দায়িত্বজ্ঞানহীন দুই শটে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে যে ব্যাটার সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন, সিলেটে সেই হৃদয়ই লিখলেন ঘুরে দাঁড়ানোর এক অবিশ্বাস্য গল্প। তাঁর ব্যাটে ভর করে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট পেল স্মরণীয় এক দিন।
সিলেটের উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য বেশ ভালো ছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফিল্ডাররাও কয়েকটি সুযোগ হাতছাড়া করেছেন। তবে সুযোগ কাজে লাগানোর দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের ব্যাটারদেরও। বাকিরা যখন একের পর এক ব্যর্থ, তখন এক প্রান্ত আগলে বুক চিতিয়ে লড়েছেন হৃদয়। অসম্ভবকে সম্ভব করে গড়েছেন একের পর এক রেকর্ড।
বাংলাদেশের হয়ে প্রথম সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়া প্রথম ব্যাটার তিনি। নিজের তৃতীয় টেস্টেই খেললেন দেশের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। মিডল অর্ডারে যাঁকে ভবিষ্যতে মুশফিকুর রহিমের বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে, সেই মুশফিকের ২১৯ রানের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেন হৃদয়। একই সঙ্গে তামিম ইকবালের এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ৭ ছক্কার রেকর্ড ভেঙে বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার মালিকও হলেন তিনি। ১১টি ছক্কা মেরে বিশ্ব রেকর্ডের খুব কাছাকাছিও পৌঁছে গিয়েছিলেন এই ডানহাতি ব্যাটার।
অথচ এক সপ্তাহ আগেও তাঁর দলে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। মিরপুর টেস্টে ব্যাখ্যাহীন দুই শটে উইকেট ছুড়ে দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি। মুমিনুল হক কনকাশন প্রটোকলের আওতায় না পড়লে সিলেট টেস্টে হয়তো সুযোগই পেতেন না হৃদয়। আগের টেস্টে মুশফিকুর রহিমের চোটে একাদশে জায়গা পেয়েছিলেন, এবার মুমিনুলের অনুপস্থিতিতে। আর সেই সুযোগেই দুই অভিজ্ঞ ব্যাটারকে ছাড়িয়ে রেকর্ড বইয়ে নিজের নাম লিখলেন তিনি। ক্রিকেটে ভাগ্যের এমন নাটকীয় পরিবর্তন সত্যিই বিস্ময়কর!
তাইজুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে অষ্টম উইকেটে হৃদয়ের গড়া ১১৭ রানের জুটি সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে এই উইকেটে সর্বোচ্চ। তাঁর অপরাজিত ২৪২ রানের ইনিংসে ভর করে ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ তুলেছে ৩৮৬ রান। একসময় দেড় শ রানে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কায় থাকা বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত উল্টো ৩০ রানের লিড নিয়েছে।
আগের দিন বিকেলে হৃদয় যখন ক্রিজে যান, তখন বেশ চাপে বাংলাদেশ। তিনি থিতু হওয়ার আগেই আরও একটি উইকেট হারিয়ে পরিস্থিতি কঠিন করে তোলে দল। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর বিদায়ে আরও বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিমকে সঙ্গে নিয়ে শেষ বিকেলের কঠিন সময় পার করেন হৃদয়। মিরপুরের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই হয়তো এবার ছিলেন অনেক বেশি সতর্ক।
ক্রিজে টিকে থেকে পরের দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন তিনি। তৃতীয় দিন সকালে ব্যাট করতে নেমেই পাল্টে দেন খেলার চিত্র। রানের গতি বাড়াতে থাকেন। আলগা বল পেলেই পাঠাতে থাকেন সীমানার বাইরে। মুশফিকের সঙ্গে জুটি জমে ওঠার ইঙ্গিত মিলতেই জোড়া ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। জোমেল ওয়ারিকনের ফাঁদে পড়ে পরপর ফিরে যান মুশফিক ও লিটন দাস।
শেষ দিকে সাধারণত প্রতিরোধ গড়েন মেহেদী হাসান মিরাজ। এবার তিনিও পারেননি। টিকতে পারেননি হাসান মাহমুদও। তখন হৃদয়ের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব নেন তাইজুল ইসলাম। বল হাতে খুব একটা সফল না হলেও ব্যাট হাতে হৃদয়কে দারুণ সঙ্গ দেন তিনি।
পুরোনো বলে ক্যারিবীয় বোলাররা ক্রমেই ছন্দ হারাতে থাকেন। সেই সুযোগে আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠেন হৃদয়। চার-ছক্কার বৃষ্টিতে মাতিয়ে রাখেন সিলেটের গ্যালারি। দর্শকসংখ্যা খুব বেশি না হলেও তাঁদের উল্লাসে তৈরি হয় উৎসবের আবহ।
আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি তাইজুলকে আগলে রাখার কাজটিও করেছেন নিপুণভাবে। ওভারের শেষ দিকে প্রান্ত বদল করে তাঁকে সঙ্গ দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর যেন একসময় ছড়ি ঘোরাতে শুরু করেন তিনি।
অবশ্য ভাগ্যও সহায় ছিল হৃদয়ের। সেঞ্চুরির পর শামার জোসেফের বলে আম্পায়ার্স কলের কারণে একবার বেঁচে যান। ডাবল সেঞ্চুরি পেরিয়ে জোমেল ওয়ারিকনের বলে উইকেটকিপারের হাতে দুইবার ক্যাচ দিয়েও রক্ষা পান। আগের দিন থিতু হওয়ার আগে ওয়ারিকনের ফিরতি ক্যাচ থেকেও বেঁচেছিলেন তিনি। তবে এবার আর আগের মতো দায়িত্বহীন শট খেলেননি। পরিস্থিতি বুঝে ব্যাট করেছেন, ধৈর্য ও আগ্রাসনের দারুণ সমন্বয় দেখিয়েছেন।
তাসকিন আহমেদের বিদায়ে শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস। তাতে থামে হৃদয়ের অসাধারণ লড়াইও। তখন কিছুটা আক্ষেপ ছিল, তাসকিন আরেকটু সময় টিকে থাকলে হয়তো বিশ্ব রেকর্ডটিও নিজের করে নিতে পারতেন হৃদয়।
তবে বিশ্ব রেকর্ড না হলেও তাঁর কীর্তি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। ২৫৯ বলে ২২টি চার ও রেকর্ড ১১টি ছক্কায় অপরাজিত ২৪২ রান—এ শুধু একটি ইনিংস নয়, সমালোচনার জবাব দিয়ে ফিরে আসার এক অসাধারণ গল্প। মিরপুরের হতাশা পেছনে ফেলে সিলেটে হৃদয় বুঝিয়ে দিলেন, ক্রিকেটে একটি দিনই বদলে দিতে পারে একজন খেলোয়াড়ের পরিচয়।



.png)
.png)