ঢাকা,  শনিবার
০৭ নভেম্বর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

চাকরিজীবীরা কীভাবে সঞ্চয় করবেন, কোথায় বিনিয়োগে মিলবে ভালো মুনাফা

প্রকাশিত: ১৭:০২, ৭ নভেম্বর ২০২৬

চাকরিজীবীরা কীভাবে সঞ্চয় করবেন, কোথায় বিনিয়োগে মিলবে ভালো মুনাফা

চাকরিজীবীরা কীভাবে সঞ্চয় করবেন, কোথায় বিনিয়োগে মিলবে ভালো মুনাফা

চাকরিজীবীদের হাতে সাধারণত মাসের শুরুতে বেতন আসে। এরপর বাসাভাড়া, বাজার, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াত, চিকিৎসাসহ নানা খরচ মেটাতে মেটাতে মাস প্রায় শেষ হয়ে যায়। অনেকের ক্ষেত্রেই তখন সঞ্চয়ের জন্য আর টাকা অবশিষ্ট থাকে না। কেউ কেউ সামান্য কিছু টাকা জমালেও জরুরি প্রয়োজনে তা ভেঙে ফেলতে বাধ্য হন।

অথচ ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সঞ্চয়ের বিকল্প নেই। নিয়মিত আয় থাকায় চাকরিজীবীদের পক্ষে পরিকল্পিতভাবে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, খরচের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং উপযুক্ত বিনিয়োগের মাধ্যম নির্বাচন। কিন্তু একজন চাকরিজীবী মাসে কত টাকা সঞ্চয় করবেন? কীভাবে গড়ে তুলবেন সঞ্চয়ের অভ্যাস? আর জমানো টাকা কোথায় বিনিয়োগ করলে পাওয়া যেতে পারে ভালো মুনাফা?

অল্প টাকা দিয়েই সঞ্চয় শুরু করুন

সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে অনেকেই একটি ভুল করেন। মাসের সব খরচ মেটানোর পর যে টাকা অবশিষ্ট থাকে, তা জমিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, মাস শেষে হাতে খুব বেশি টাকা থাকে না। তাই ভালো উপায় হলো, বেতন পাওয়ার পরই নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা সঞ্চয়ের জন্য আলাদা করে রাখা। এরপর অবশিষ্ট টাকা দিয়ে মাসের খরচ চালানো।

তবে সঞ্চয় করতে গিয়ে এমন চাপ নেওয়া উচিত নয়, যাতে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে ঋণ করতে হয়। আয় ও পারিবারিক ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে বেতনের ১০ থেকে ২০ শতাংশ সঞ্চয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। শুরুতে এতটা সম্ভব না হলে ৫ শতাংশ দিয়েও শুরু করা যায়। এমনকি অল্প কিছু টাকা হলেও নিয়মিত জমাতে হবে। কারণ, সঞ্চয়ের পরিমাণের চেয়ে নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মাসিক আয়ের বাজেট তৈরি করুন

সঞ্চয় করতে হলে প্রথমেই জানতে হবে, প্রতি মাসে কোথায় কত টাকা খরচ হচ্ছে। এ জন্য আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি মাসিক বাজেট তৈরি করা প্রয়োজন।

প্রথমে বাসাভাড়া, খাবার, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল, যাতায়াত ও চিকিৎসার মতো প্রয়োজনীয় খরচের হিসাব করুন। এরপর পোশাক কেনা, বাইরে খাওয়া, বিনোদন ও ভ্রমণের মতো খাতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, তা নির্ধারণ করুন।

প্রয়োজনীয় খরচ কমানো সব সময় সম্ভব না হলেও অন্যান্য খাতে কিছুটা কাটছাঁট করা যায়। যেমন প্রতি সপ্তাহে বাইরে খাওয়ার পরিবর্তে দুই সপ্তাহে একবার যেতে পারেন। ছয় মাসে একবার ভ্রমণের পরিবর্তে বছরে একবার ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে পারেন। এভাবে ছোট ছোট পরিবর্তন আনলেও মাস শেষে কিছু টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব।

ছোট ছোট অপ্রয়োজনীয় খরচ কমান

সঞ্চয় করতে হলে সব সময় আয় বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়েই ভালো পরিমাণ অর্থ জমা করা যায়। প্রতিদিন বাইরে কফি খাওয়া, ঘন ঘন অনলাইন কেনাকাটা, ব্যবহার না করা বিভিন্ন সাবস্ক্রিপশন কিংবা পরিকল্পনাহীন বিনোদনের পেছনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা খরচ হয়।

এসব খরচের হিসাব রাখলে সহজেই বোঝা যাবে কোথায় অর্থ অপচয় হচ্ছে। পাশাপাশি শখের কোনো জিনিস বা দামি পণ্য কেনার আগে অন্তত সাত দিন অপেক্ষা করার অভ্যাস করতে পারেন। এতে আবেগের বশে হঠাৎ কেনাকাটার প্রবণতা কমবে। অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় যে অর্থ ব্যয় হতো, তা সঞ্চয় করা সম্ভব হবে।

প্রথমেই গড়ে তুলুন জরুরি তহবিল

প্রত্যেক চাকরিজীবীর একটি জরুরি তহবিল থাকা প্রয়োজন। কারণ, যেকোনো সময় চাকরি হারানো, অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা পরিবারের কারও চিকিৎসার জন্য বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি তহবিল না থাকলে অনেককে ঋণ করতে হয়। আবার কেউ কেউ দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ভেঙে ফেলেন।

এ ধরনের আর্থিক চাপ সামাল দিতে অন্তত তিন থেকে ছয় মাসের প্রয়োজনীয় খরচের সমপরিমাণ অর্থ জরুরি তহবিল হিসেবে জমা রাখা ভালো। এই টাকা এমন জায়গায় রাখতে হবে, যেখান থেকে প্রয়োজনের সময় দ্রুত উত্তোলন করা যায়। ব্যাংকের সহজে উত্তোলনযোগ্য আমানত এ ক্ষেত্রে একটি বিকল্প হতে পারে। যাঁরা শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং পছন্দ করেন, তাঁরা মুদারাবাভিত্তিক আমানতও বিবেচনা করতে পারেন। তবে যে মাধ্যমেই টাকা রাখুন না কেন, উত্তোলনের নিয়ম, মুনাফা ও অন্যান্য শর্ত আগে জেনে নেওয়া জরুরি।

জমানো টাকা কোথায় বিনিয়োগ করবেন

জরুরি তহবিল গড়ে তোলার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য নিয়মিত বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে নিজের আয়, আর্থিক লক্ষ্য, বিনিয়োগের মেয়াদ ও ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা বিবেচনায় রাখতে হবে।

ব্যাংকে ডিপিএস করতে পারেন

প্রতি মাসে অল্প অল্প করে টাকা জমাতে চাইলে ব্যাংকের ডিপোজিট পেনশন স্কিম বা ডিপিএস একটি পরিচিত মাধ্যম। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৫০০, ১ হাজার, ২ হাজার কিংবা ৫ হাজার টাকা বা তার বেশি মাসিক কিস্তিতে ডিপিএস খোলার সুযোগ দেয়।

ধরা যাক, একজন চাকরিজীবী প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা করে পাঁচ বছর ডিপিএস করলেন। এ সময়ে তাঁর নিজের জমা হবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে ব্যাংকের নির্ধারিত মুনাফা যোগ হবে। তবে মুনাফার হার, কর, আবগারি শুল্ক ও অন্যান্য শর্তের কারণে চূড়ান্ত প্রাপ্তির পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।

সঞ্চয়ের অভ্যাস সহজ করতে বেতন যে ব্যাংকে জমা হয়, সেই ব্যাংকের সঙ্গে ডিপিএস হিসাব যুক্ত করে নেওয়া যেতে পারে। এতে বেতন জমা হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত টাকা ডিপিএসে চলে যাবে। আলাদা করে কিস্তি জমা দেওয়ার ঝামেলাও থাকবে না।

জীবনবিমা পলিসি বিবেচনা করুন

ডিপিএসের পাশাপাশি আর্থিক সামর্থ্য থাকলে জীবনবিমা পলিসিও বিবেচনা করতে পারেন। বিশেষ করে যাঁদের ওপর পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব রয়েছে, তাঁদের জন্য জীবনবিমা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বিভিন্ন বিমা পলিসিতে মাসিক, ত্রৈমাসিক বা বার্ষিক ভিত্তিতে প্রিমিয়াম দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ব্যাংকের সঙ্গে পলিসি যুক্ত করলে নির্ধারিত সময়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রিমিয়াম পরিশোধ করা যায়।

তবে জীবনবিমাকে শুধু সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে দেখা ঠিক নয়। পলিসির মেয়াদ, মৃত্যুজনিত সুরক্ষা, চিকিৎসাসুবিধা, মেয়াদ শেষে প্রাপ্ত অর্থ, আগাম বন্ধ করার শর্ত এবং বিমা কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। সব পলিসিতে চিকিৎসাসুবিধা বা একই ধরনের সুবিধা থাকে না।

মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ

ডিপিএস ও বিমার বাইরে বাড়তি অর্থ থাকলে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করতে আগ্রহীদের জন্য এটি একটি বিকল্প।

মিউচুয়াল ফান্ডে অনেক বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে পেশাদার ফান্ড ম্যানেজাররা বিভিন্ন শেয়ার ও অন্যান্য আর্থিক উপকরণে বিনিয়োগ করেন। ফলে একজন বিনিয়োগকারীকে নিজে শেয়ার নির্বাচন ও বাজার পর্যবেক্ষণের সব দায়িত্ব নিতে হয় না।

তবে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগেও ঝুঁকি রয়েছে। বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী ফান্ডের মূল্য কমতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে ফান্ডের ধরন, অতীত কার্যক্রম, ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি যাচাই করা জরুরি।

সঞ্চয়পত্র ও ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ

ছোট ছোট সঞ্চয় একসময় বড় অঙ্কে পরিণত হলে তা বিভিন্ন মাধ্যমে বিনিয়োগ করা যায়। যাঁরা তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য অর্থ বিনিয়োগ করতে চান, তাঁদের জন্য সরকারি সঞ্চয়পত্র একটি বিকল্প হতে পারে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। বিনিয়োগকারীর প্রয়োজন, যোগ্যতা ও আর্থিক লক্ষ্য অনুযায়ী উপযুক্ত সঞ্চয়পত্র বেছে নেওয়া যায়। এ ছাড়া সরকারি ট্রেজারি বন্ডেও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে এসব বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার, কর, মেয়াদ, আগাম নগদায়নের নিয়ম এবং বিনিয়োগের সীমা সম্পর্কে আগে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে যাঁদের শেয়ারবাজার সম্পর্কে ভালো ধারণা নেই, তাঁদের সরাসরি শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত। কারণ, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ঝুঁকি রয়েছে এবং বাজারের ওঠানামায় মূলধন কমে যেতে পারে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে চাইলে সরাসরি শেয়ার কেনার পাশাপাশি মিউচুয়াল ফান্ডের মতো বিকল্পও বিবেচনা করা যায়। তবে সেখানেও ঝুঁকি রয়েছে।

অল্প দিয়ে শুরু করুন, নিয়মিত চালিয়ে যান

চাকরিজীবীদের সঞ্চয়ের পথে বড় বাধা অনেক সময় অর্থের অভাব নয়, বরং পরিকল্পনা ও অভ্যাসের অভাব। মাসে ১ হাজার বা ২ হাজার টাকা দিয়েও সঞ্চয় শুরু করা সম্ভব। আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয়ের পরিমাণও বাড়ানো যায়।

তবে বিনিয়োগের আগে জরুরি তহবিল গড়ে তোলা, ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিজের আর্থিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিটি বিনিয়োগের ঝুঁকি, মুনাফা ও শর্ত বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সব অর্থ একটি জায়গায় বিনিয়োগ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন মাধ্যমে ভাগ করে রাখাও ভালো।

মনে রাখতে হবে, সঞ্চয়ের উদ্দেশ্য শুধু টাকা জমিয়ে রাখা নয়; বরং ভবিষ্যতের আর্থিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করা এবং নিজের ও পরিবারের জন্য নিরাপদ আর্থিক ভিত্তি তৈরি করা। বড় অঙ্কের টাকা জমানোর অপেক্ষায় না থেকে আজ থেকেই অল্প পরিমাণে সঞ্চয় শুরু করুন। নিয়মিত এই অভ্যাসই একসময় বড় আর্থিক নিরাপত্তার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

Advertisement
Advertisement