ঢাকা,  মঙ্গলবার
২৭ অক্টোবর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

ভাষা বোঝেন না, আইনজীবীও নেই—সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডের মুখে প্রবাসীরা

প্রকাশিত: ০৯:৫৪, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

ভাষা বোঝেন না, আইনজীবীও নেই—সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডের মুখে প্রবাসীরা

সৌদি আরব

গত বছরের মে মাসের একদিন। সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ইথিওপিয়ার এক বন্দী দেশে থাকা মাকে ফোন করেছিলেন। জানিয়েছিলেন, পরদিন সকালে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হবে। সেটিই হবে তাঁর জীবনের শেষ সকাল। ছেলের মুখে এ কথা শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা।

কিন্তু তাঁর যন্ত্রণা সেখানেই শেষ হয়নি। ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সপ্তাহের পর সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পরিবারের কাছে ফেরত আসেনি মরদেহ। শেষবারের মতো ছেলেকে দেখার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মা। একপর্যায়ে তাঁকে ভর্তি করতে হয় হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগে।

ঘটনাটি লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে জানিয়েছিলেন ইথিওপীয় সম্প্রদায়ের এক সদস্য। সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা তাঁর নিজের ভাইও ছিলেন। তাঁর কথায়, ‘ওরা শুধু আমাদের ভাইদের মারছে না, আমাদেরও মারছে।’

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের পরিসংখ্যান, বিচারপ্রক্রিয়া এবং বিদেশি বন্দীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। বিশেষ করে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকদের বড় অংশের উপস্থিতি প্রশ্ন তুলছে দেশটির বিচারব্যবস্থায় বৈষম্য, আইনি সহায়তার ঘাটতি এবং ন্যায্য বিচারের সুযোগ নিয়ে।

সৌদি আরবের খামিস মুশাইত কারাগারেই বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন ৫৮ জন ইথিওপীয় বন্দী।

মৃত্যুদণ্ডের তালিকায় বিদেশিদের আধিক্য

সৌদি আরবের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৫৩ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ, অর্থাৎ ৪৪ শতাংশই বিদেশি নাগরিক। দেশটির অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে তাঁদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও মৃত্যুদণ্ডের পরিসংখ্যানে তাঁদের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে শুধু মাদকসংক্রান্ত অপরাধে ৫৯৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাঁদের প্রায় ৭৫ শতাংশই বিদেশি নাগরিক।

বার্লিনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের (ইএসওএইচআর) তথ্য আরও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে মোট ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৫৯ জন, অর্থাৎ প্রায় ৫৪ শতাংশ বিদেশি। একই সময়ে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ৭১ জনের মধ্যে ৪৯ জনই বিদেশি নাগরিক।

অ্যামনেস্টির হিসাবে, গত এক দশকে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৫৫ জন পাকিস্তানি, ৬৬ জন সিরীয়, ৫০ জন জর্ডানি, ৩৯ জন ইয়েমেনি, ৩৩ জন মিসরীয়, ৩২ জন নাইজেরীয়, ২২ জন সোমালীয় এবং ১৩ জন ইথিওপীয় নাগরিক রয়েছেন। একই সময়ে ১৫০ জন সৌদি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর হয়েছে।

এ ছাড়া ইরান, আফগানিস্তান, চাদ, বাহরাইন, লেবানন, সুদান, তুরস্ক, ভারত ও ফিলিস্তিনের নাগরিকদেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তালিকায় পাকিস্তানি নাগরিকের সংখ্যা সৌদি নাগরিকদেরও ছাড়িয়ে গেছে।

তবে এসব পরিসংখ্যানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অ্যামনেস্টির বিশ্লেষণ মূলত সৌদি কর্তৃপক্ষের সরকারি সংবাদ সংস্থার মাধ্যমে প্রকাশিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। পাশাপাশি গ্রেপ্তার, অভিযোগ, বিচার ও সাজা দেওয়ার প্রতিটি পর্যায়ে বিদেশিদের সঙ্গে বৈষম্য হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার মতো পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্যও সংস্থাটির হাতে নেই।

এ কারণে বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য আছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে অ্যামনেস্টি।

বিচারের আগেই শুরু হয় বিপদ

বিদেশি শ্রমিকদের সংকট শুরু হয় সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর নয়, বরং নিজ দেশ থেকে যাত্রা শুরুর সময়ই। দেশটির মোট কর্মী বাহিনীর প্রায় ৭৭ শতাংশ অভিবাসী শ্রমিক। তাঁদের অনেকেই বিদেশে কাজ পাওয়ার আশায় প্রতারণামূলক নিয়োগপ্রক্রিয়া, দালালের শোষণ এবং ঋণের ফাঁদে পড়েন।

সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর কাফালা বা স্পনসরশিপ ব্যবস্থা তাঁদের দুর্বল অবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে। এই ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীলতা অনেক শ্রমিকের চাকরি পরিবর্তন, কর্মস্থল ত্যাগ কিংবা নিজেদের অধিকার আদায়ের সুযোগ সীমিত করে দেয়।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) নির্দেশনা অনুযায়ী, হুমকি, বলপ্রয়োগ, জবরদস্তি কিংবা প্রতারণার মাধ্যমে শোষণের উদ্দেশ্যে কাউকে নিয়োগ, পরিবহন বা আশ্রয় দেওয়া মানব পাচারের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। এর আওতায় জোরপূর্বক শ্রমের পাশাপাশি কাউকে অবৈধ কাজে বাধ্য করার ঘটনাও আসতে পারে।

সৌদি আরবে অভিবাসী শ্রমিকদের ঝুঁকির কারণ হিসেবে আইওএম অনিয়মিত অভিবাসন, গৃহকর্ম ও সমুদ্রে কাজের মতো আড়ালে থাকা পেশা, নিয়োগকর্তার অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগে দুর্নীতি, দালালের ওপর নির্ভরতা এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছে।

এসব পরিস্থিতিতে কোনো শ্রমিক আইনি জটিলতায় পড়লে তাঁর পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। অর্থের অভাব, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা এবং স্থানীয় আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেকেই দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না। একই সঙ্গে কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার সুযোগও সীমিত থাকে।

অ্যামনেস্টির নথিবদ্ধ কয়েকটি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, তাঁদের জোর করে নিষিদ্ধ মাদক বহন করতে বাধ্য করা হয়েছিল। কিন্তু আদালত তাঁদের বক্তব্য যথাযথভাবে খতিয়ে দেখেননি বা গ্রহণ করেননি।

মানবাধিকার সংস্থাটির নথিতে আরও উঠে এসেছে, অভিবাসী শ্রমিকদের কেউ কেউ নিয়োগ-দালালের প্রতারণা, অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য হওয়া এবং মজুরি না পাওয়ার মতো পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। কিছু ঘটনা শ্রম শোষণের উদ্দেশ্যে মানব পাচারের শামিল হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরাও সতর্ক করেছেন, মৃত্যুদণ্ডের প্রভাব বিদেশি নাগরিকদের ওপর অসমভাবে পড়ছে। বিশেষ করে আর্থিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের পক্ষে বিচার ও আপিলের সময় কার্যকর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।

ভাষা বোঝেন না, আইনজীবীও পান না

সৌদি আরবে বিদেশি বন্দীদের বিচারপ্রক্রিয়ার বাস্তব চিত্র বুঝতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইএসওএইচআর এবং পাকিস্তানের জাস্টিস প্রজেক্টের সহায়তায় মিসর, ইথিওপিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান ও সোমালিয়ার ২৫ জন বিদেশি নাগরিকের মামলা নথিবদ্ধ করেছে। তাঁদের সবাই মাদকসংক্রান্ত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। কেউ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছেন, কারও সাজা ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে।

এসব মামলায় গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে বিচার, রায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও বন্দী ও তাঁদের পরিবারের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ জন্য বন্দীদের ১৩টি পরিবারের সদস্য, চারজন নিজ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং একজন কনস্যুলার কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। পাশাপাশি আরও ১৫ জনের আদালতের নথি পর্যালোচনা করা হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিক্ষার অভাব, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক সংকট বিদেশি বন্দীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজ দেশে প্রতারণার শিকার হয়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর পর তাঁরা নতুন করে আইনি সংকটে পড়ছেন।

অনেক বন্দী নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বুঝতে পারেননি। কেউ আদালতের নথি হাতে পাননি, কেউ আবার পর্যাপ্ত দোভাষী বা আইনজীবীর সহায়তা ছাড়াই বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেকে কনস্যুলার সহায়তাও পাননি।

ফলে সৌদি আরবের ফৌজদারি আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া, ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সীমিত ধারণা নিয়ে তাঁদের পক্ষে কার্যকরভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্রেপ্তারের সময় নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা ছাড়া স্বীকারোক্তি আদায়ের ঝুঁকিও তাঁদের দুর্বল অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

কাগজে-কলমে অবশ্য আইনি সহায়তার অধিকার রয়েছে। সৌদি আরবের ২০১৩ সালের ফৌজদারি কার্যবিধিতে তদন্ত ও বিচার—উভয় পর্যায়ে আসামির আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত এবং নির্যাতন নিষিদ্ধ।

কিন্তু ইএসওএইচআর খামিস মুশাইত, নাজরান ও তাবুক কারাগারের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের যেসব অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করেছে, তাতে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। অনেক বন্দীর পেশাদার দোভাষী বা পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা ছিল না। তাঁরা বিচারপ্রক্রিয়া বুঝতে পারেননি এবং নিজেদের পক্ষে কার্যকরভাবে বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগও পাননি।

কোনো কোনো বন্দী এমনকি জানতেন না, তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের রায় কবে বহাল হয়েছে কিংবা ক্ষমার আবেদন কবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডের আগে আতঙ্ক, পরে অনিশ্চয়তা

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বন্দী ও তাঁদের পরিবারকে জানানো হবে কি না, তা নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে।

অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আইনে বন্দী বা তাঁর পরিবারকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে স্পষ্টভাবে নোটিশ দেওয়ার নিশ্চয়তা নেই। বন্দীদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে বন্দী নিজে ফোন করে পরিবারকে খবর দিতে পেরেছেন।

আবার কারও ক্ষেত্রে কারা কর্মকর্তারা আগের দিন জানিয়ে দিয়েছেন, ‘তোমার পালা এসেছে।’

বন্দীদের কেউ কেউ তাঁদের পরিবারের কাছে বর্ণনা করেছেন, কীভাবে সহবন্দীদের মাঝরাতে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সেল থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর অন্য বন্দীরা নিজেদের পালার অপেক্ষায় আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন।

অনেক পরিবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পেয়েছে অন্য বন্দীদের ফোনে কিংবা গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য প্রকাশ করার পরও কোনো কোনো পরিবার জানতে পেরেছে তাদের স্বজনের মৃত্যুর খবর।

দূরত্ব, অনিয়মিত যোগাযোগ এবং মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্যের অভাব পরিবারগুলোর অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। বছরের পর বছর মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা বন্দীর স্বজনেরা একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর আশঙ্কায় ভোগেন, অন্যদিকে গ্রেপ্তারের কারণে পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যকে হারিয়ে আর্থিক সংকটেও পড়েন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগাম খবর না দেওয়ার চর্চারও সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, এ ধরনের আচরণ নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ নিষিদ্ধ করার আন্তর্জাতিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবে তিন মিসরীয় নাগরিকের আসন্ন মৃত্যুদণ্ড নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু ওই বছরের ৩ ডিসেম্বর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁরা তাবুক কারাগারে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা অন্তত ৪০ জন মিসরীয় বন্দীর একটি বড় দলের অংশ ছিলেন।

অ্যামনেস্টির হিসাবে, ২০২৪ সাল থেকে ওই দলের ২৩ জন মিসরীয়র মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। আরও ১৯ জন এখনো একই পরিণতির ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বিভিন্ন দেশের বিদেশি বন্দীদের একই ধরনের অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পর আলাদা ওয়ার্ডে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও নথিবদ্ধ করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। তাবুকে মিসরীয় এবং নাজরানে ইথিওপীয় ও সোমালীয় বন্দীদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটেছে। বন্দী ও তাঁদের পরিবার এসব স্থানান্তরকে অনেক সময় আসন্ন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অশুভ সংকেত হিসেবে দেখেন।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, কিন্তু ফেরে না মরদেহ

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও পরিবারের যন্ত্রণা শেষ হয় না। অনেক ক্ষেত্রে মরদেহ ফেরত দেওয়া হয় না, এমনকি কোথায় দাফন করা হয়েছে, সেই তথ্যও পরিবারকে জানানো হয় না।

অ্যামনেস্টির নথিবদ্ধ ২৫টি মামলার মধ্যে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে। তিনটি ক্ষেত্রেই সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁদের মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত দেয়নি এবং কবরের অবস্থানও জানায়নি।

ফলে পরিবারগুলো নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি অনুসারে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছে।

জর্ডানের নাগরিক হুসেইন আবু আল-খায়েরের ঘটনা এর একটি মর্মান্তিক উদাহরণ। মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার সময় নিজের মামলার অবস্থা নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ২০২৩ সালের মার্চে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

রাজধানী আম্মানে তাঁর পরিবার প্রথমে নীরব হয়ে বসে ছিল। পরে শুরু হয় কান্না ও আহাজারি। তাঁর বোনের ভাষায়, তাঁরা ভেঙে পড়েছিলেন। কারণ, শোক করার জন্য সামনে ভাইয়ের মরদেহটিও ছিল না, ছিল না শেষবিদায়ের কোনো আয়োজন।

এভাবেই মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি শাস্তি—প্রিয়জনকে হারানোর পরও স্বাভাবিকভাবে শোক পালনের সুযোগ না পাওয়া।

বাংলাদেশি পরিবারগুলোর উদ্বেগও বাড়ছে

সৌদি আরবে বিদেশি শ্রমিকদের বিচারপ্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব বাংলাদেশের পরিবারগুলোর ওপরও পড়ছে।

সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা অন্তত ২৫ লাখ। বিদেশি কর্মীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী। এরপর রয়েছেন ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন ও মিসরের নাগরিকেরা।

ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১০৮ জনের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন। এর বাইরে সম্প্রতি মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যানের অন্তর্ভুক্ত নন। তবে ওই সময়ে ঠিক কতজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তা জানা যায়নি।

অ্যামনেস্টির নথিবদ্ধ ২৫টি মামলা মিসর, ইথিওপিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান ও সোমালিয়ার নাগরিকদের নিয়ে। মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের তালিকায় বাংলাদেশের নামও নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশিরা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকির বাইরে। ইএসওএইচআরের তথ্যেই বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উল্লেখ রয়েছে।

মূল সমস্যা হলো তথ্যের ঘাটতি। ইএসওএইচআর জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ১০৮টি ঘটনার মধ্যে ৯১টি, অর্থাৎ ৮৪ দশমিক ২ শতাংশের বিষয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তারা কোনো তথ্য জানতে বা নথিবদ্ধ করতে পারেনি।

অ্যামনেস্টির হাতেও গ্রেপ্তার, অভিযোগ কিংবা সাজা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান নেই। ফলে সৌদি আরবে কতজন বাংলাদেশি বন্দী রয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে, তাঁরা আইনজীবী ও দোভাষী পেয়েছেন কি না কিংবা বাংলাদেশের কনস্যুলার সহায়তা কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া কঠিন।

বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য এ তথ্যের অভাব শুধু পরিসংখ্যানগত সমস্যা নয়; এটি প্রিয়জনের নিরাপত্তা, বিচারপ্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তারও কারণ।

ন্যায়বিচারের প্রশ্নে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

সৌদি আরবের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় জাতিগত ও বর্ণগত বৈষম্য নিয়ে আগেও উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটি দেশটির বিচারব্যবস্থায় বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরে। শিয়া সংখ্যালঘু, অভিবাসী শ্রমিক এবং গৃহকর্মীরা যথেচ্ছ আটক, নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংস্থাটি।

কমিটি সৌদি আরবকে মৃত্যুদণ্ডের ওপর স্থগিতাদেশ আরোপ করে ধীরে ধীরে এই শাস্তি বিলোপের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও মৃত্যুদণ্ড ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বৈষম্য কিংবা পক্ষপাতিত্ব রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি তুলেছে।

ভাষা না বোঝা, আইনজীবী না পাওয়া, বিচারপ্রক্রিয়ার তথ্য থেকে বঞ্চিত হওয়া, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর দেরিতে জানা এবং মরদেহ ফেরত না পাওয়া—সব মিলিয়ে বিদেশি বন্দী ও তাঁদের পরিবার এক জটিল সংকটের মধ্যে পড়ছেন।

অ্যামনেস্টির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব সমস্যা একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। অপরিচিত বিচারব্যবস্থা, ভাষা ও সংস্কৃতির বাধা এবং আইনি সহায়তার অভাব একত্রে বন্দীদের নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করা কিংবা মৃত্যুদণ্ড এড়ানোর লড়াইকে প্রায় অসম্ভব করে তুলতে পারে।

এই সংকটের শেষ প্রান্তে রয়েছেন সেই ইথিওপীয় মা। ছেলের মুখে যিনি শুনেছিলেন, পরদিনই তাঁর শেষ নিশ্বাস নেওয়ার কথা। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও ছেলের মরদেহ ফিরে পাননি তিনি। অপেক্ষা আর শোকের ভারে শেষ পর্যন্ত তাঁকে আশ্রয় নিতে হয়েছে হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগে।

একজন বন্দীর মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে সীমান্ত পেরিয়ে—একটি পরিবারের জীবন, অসংখ্য স্বজনের মানসিক স্থিতি এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকারকে নাড়িয়ে দিয়ে।

Advertisement
Advertisement

আরো পড়ুন