আন্তর্জাতিক ক্রিকেট
৪৫ বছরের জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে ক্রিকেটের মাঠে। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে ঘরোয়া ক্লাব, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট, বাংলাদেশ ‘এ’ দল হয়ে জাতীয় দল—সব পর্যায়েই খেলেছেন তিনি। বাংলাদেশের হয়ে খেলেছেন তিনটি টেস্ট ও তিনটি ওয়ানডে।
কিন্তু এত দীর্ঘ ক্রিকেটজীবন পাড়ি দেওয়ার পরও নিজের শরীরে লুকিয়ে থাকা একটি বড় সত্য জানতেন না সাবেক এই ক্রিকেটার। জন্ম থেকেই তাঁর শরীরে একটি কিডনি নেই। আর সেই বিষয়টি তিনি জানতে পারেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বশেষ ম্যাচ খেলার ২১ বছর পর, ৪৩ বছর বয়সে।
তিনি বাংলাদেশের সাবেক অফ স্পিনার ফাহিম মুনতাসির, ক্রিকেটে যিনি ‘সুমিত’ নামে পরিচিত।
বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে জাতীয় দলে
১৯৯৮ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে প্লেট চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ যুব দলের সদস্য ছিলেন ফাহিম মুনতাসির। পরের বছরই তিনি যুব দলের নেতৃত্ব পান।
১৯৯৮ সালের মার্চে বিসিবি একাদশের হয়ে ভারত সফরে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে অভিষেক হয় তাঁর। পরের বছর ঢাকায় ইয়ান বিশপের নেতৃত্বাধীন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দলের বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক করেন ফাহিম।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত প্রথম প্রথম শ্রেণির ম্যাচ ছিল সেটি। ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ২৬ ওভার বোলিং করে ১১৬ রানে চার উইকেট নিয়েছিলেন তিনি।
২০০১ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক। ওই সিরিজে আরও একটি ওয়ানডে খেলেন তিনি। পরের বছর সেপ্টেম্বরে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেন নিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডে।
টেস্ট অভিষেক হয় ২০০২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় পাকিস্তানের বিপক্ষে। এর আগে ২০০০ সালের নভেম্বরে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের স্কোয়াডেও ছিলেন তিনি। জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার আগে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে পাকিস্তান সফরও করেছেন।
সব মিলিয়ে ফাহিম ৩৭টি প্রথম শ্রেণির ও ৩৩টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ খেলেছেন।
২১ বছর পর জানলেন, একটি কিডনি নেই
ক্রিকেট ছাড়ার পরও ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ফাহিম। লেভেল-২ কোচিং কোর্স সম্পন্ন করে মোহামেডানের মতো বড় ক্লাবে কোচিং করিয়েছেন। কখনো ম্যানেজারের দায়িত্বও পালন করেছেন। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে আসা বিভিন্ন বিদেশি দলের লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবেও কাজ করেছেন।
কিন্তু নিজের শরীরে একটি কিডনি না থাকার বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না।
২০২৩ সালে শারীরিক পরীক্ষা করাতে ভারতের দিল্লিতে যান ফাহিম। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে তাঁর পেটের আলট্রাসনোগ্রাম করা হয়। তখনই চিকিৎসকের সন্দেহ হয়, তাঁর বাঁ পাশের কিডনি সম্ভবত নেই।
সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ফাহিম বলেন,
‘আলট্রাসনো করার সময় ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, আমার কখনো কোনো অস্ত্রোপচার হয়েছে কি না। আমি বললাম, হয়নি। উনি তখন সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, আমার কিডনি সম্ভবত জন্মগতভাবেই একটি, ডান দিকে। বাঁ দিকেরটা নেই। পরে রিপোর্টেও তাই আসে।’
চিকিৎসক তাঁকে জানান, জন্মগতভাবে একটি কিডনি নিয়ে বেঁচে থাকা বিরল হলেও অসম্ভব নয়। অনেক মানুষ একটি কিডনি নিয়েই স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। তবে একমাত্র কিডনিটি সুস্থ রাখার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়।
দিল্লিতে পরীক্ষার সময় আরও একটি বিষয় সামনে আসে। ফাহিমের রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল। অর্থাৎ তাঁর একমাত্র কিডনিটিও তখন সমস্যার দিকে যাচ্ছিল।
এক কিডনি নিয়ে ক্রিকেট খেলা কি সম্ভব?
মানুষের শরীরে সাধারণত দুটি কিডনি থাকে। তবে জন্মগতভাবে একটি কিডনি নিয়ে জন্মানো মানুষের সংখ্যাও কম নয়। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে প্রায় একজন একটি কিডনি নিয়ে জন্মাতে পারে।
একটি কিডনি না থাকলে ক্রিকেট খেলা নিষিদ্ধ—এমন কোনো নিয়ম নেই। ক্রিকেটে শারীরিক সংঘর্ষ তুলনামূলক কম হওয়ায় সরাসরি খেলায় বাধাও তৈরি নাও হতে পারে।
তবে ক্রীড়া চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ একমাত্র কিডনিটি কোনোভাবে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিসিবির প্রধান চিকিৎসক ডা. দেবাশীষ চৌধুরী বলেন,
‘একটি কিডনি থাকলে খেলা যাবে না, এমন কোনো কথা নেই। তবে যেহেতু কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে লাইফ থ্রেট আসতে পারে, এসব ক্ষেত্রে সাধারণত খেলাধুলা থেকে দূরে থাকতেই বলা হয়।’
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিরল নজির
ফাহিম মুনতাসির নিজের শারীরিক অবস্থার কথা না জানায় স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটও খেলেছেন। তাঁর মতো জন্মগতভাবে একটি কিডনি নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন—এমন আর কোনো ক্রিকেটারের উদাহরণ পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, জন্মগতভাবে একটি কিডনি নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা ক্রিকেটার হিসেবে ফাহিম মুনতাসিরের ঘটনা বিরল।
তবে পরে অসুস্থতা বা চোটের কারণে কিডনি হারিয়েছেন, কিংবা কিডনি দান করেছেন—এমন ক্রিকেটারের উদাহরণ রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটার ক্যামেরন গ্রিনও কিডনির সমস্যায় ভুগছেন। তবে তাঁর ক্ষেত্রে জন্মগতভাবে কিডনির কার্যক্ষমতা কম। তাঁর কিডনির কার্যক্ষমতা প্রায় ৬০ শতাংশ বলে জানা যায়। এ কারণে অস্ট্রেলিয়া দলের চিকিৎসক ও টিম ম্যানেজমেন্ট তাঁর খাদ্যাভ্যাস, পানীয়, চিকিৎসা এবং খেলার পরিবেশ নিয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে।
সতীর্থদের কাছেও ধরা পড়েনি কোনো সমস্যা
ফাহিমের সঙ্গে বয়সভিত্তিক ও ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলা সতীর্থরা এখন অবাক হচ্ছেন। কারণ, দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনে তাঁকে কখনো শারীরিকভাবে সমস্যায় পড়তে দেখেননি তাঁরা।
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার বলেন,
‘খেলোয়াড়ি জীবনে আমরা কখনো বুঝতে পারিনি, ওর একটা কিডনি নেই! আমরা বুঝব কী, সুমিত নিজেই তো জানত না! ও অত্যন্ত ফিট খেলোয়াড় ছিল, খুব ভালো অফ স্পিনার ছিল।’
জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার হান্নান সরকারও ফাহিমকে খুব ফিট ক্রিকেটার হিসেবে মনে করেন। তিনি বলেন,
‘আমার মনে পড়ে না সুমিত ভাই কখনো ফিটনেসের কারণে বা কোনো ইনজুরির কারণে দল থেকে বাদ পড়েছেন। উনি স্পিনার ছিলেন, কিন্তু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কোনো সমস্যা ছাড়াই অনেক লম্বা স্পেলে বোলিং করতেন। কখনো মনে হয়নি তাঁর কোনো সমস্যা আছে।’
ফাহিম নিজেও খেলোয়াড়ি জীবনে কোনো শারীরিক সমস্যা অনুভব করেননি। তাঁর ধারণা, জন্মগতভাবে একটি কিডনি থাকায় সেটি হয়তো স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কার্যক্ষম ছিল।
এখন ডায়ালাইসিস চলছে
ক্রিকেট খেলার সময় কোনো সমস্যা না হলেও চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিনের কঠোর শারীরিক পরিশ্রম তাঁর একমাত্র কিডনির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে থাকতে পারে। বর্তমানে সেই কিডনিটিও গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে কিডনির সমস্যা বেশি ভোগাতে শুরু করে ফাহিমকে। ৩০ জানুয়ারি থেকে তাঁর ডায়ালাইসিস শুরু হয়। বর্তমানে সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস করাতে হচ্ছে তাঁকে।
চিকিৎসকেরা এখন কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। ভারত বা পাকিস্তানে কিডনি প্রতিস্থাপনে আনুমানিক ৫০ লাখ টাকা খরচ হতে পারে বলে জানা গেছে।
এ অবস্থায় ফাহিমকে আর্থিকভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব।
ভবিষ্যৎ ক্রিকেটারদের জন্য ফাহিমের পরামর্শ
নিজের দীর্ঘ ক্রিকেটজীবন এবং বর্তমান বাস্তবতার অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ ক্রিকেটারদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন ফাহিম মুনতাসির।
তিনি বলেন,
‘খেলোয়াড়দের জন্য পেনশনের মতো ব্যবস্থা থাকা উচিত, যেন পরে অন্তত নিজের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে না হয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রিকেটারদের কথা ভেবেই কথাটা বললাম।’
একসময় জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামা ফাহিম মুনতাসিরের জীবনের গল্প তাই শুধু একটি বিরল শারীরিক অবস্থার গল্প নয়; এটি একজন ক্রিকেটারের অজান্তে প্রতিকূলতা পেরিয়ে দীর্ঘদিন খেলাধুলার সঙ্গে পথচলারও এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়।



.png)
.png)