
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে চোখে ঝাপসা দেখা অনেকেই স্বাভাবিক বলে মনে করেন। কিন্তু চোখে ঝাপসা দেখা মোটেও স্বাভাবিক নয়। চোখে ঝাপসা দেখার অনেক কারণ আছে। ঝাপসা দৃষ্টি হলো আপনার দৃষ্টিশক্তির বিকৃতি বা তীক্ষ্ণতা হ্রাস।
এক বা উভয় চোখেই ঝাপসা দৃষ্টি বার্ধক্যজনিত কারণে অথবা নতুন চশমার প্রয়োজনের কারণে হতে পারে। এটাও মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে হঠাৎ ঝাপসা দৃষ্টি অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণও হতে পারে।
শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার কারণে চোখে ঝাপসা দেখতে পারেন। তবে গুরুতর শারীরিক সমস্যা আছে কি না, সেই বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। তবে হঠাৎ উভয় চোখে ঝাপসা দেখা স্ট্রোক বা টিআইএ (ক্ষণস্থায়ী ইস্কেমিক আক্রমণ), রেটিনা বিচ্ছিন্নতা (যার চিকিৎসা করা যেতে পারে) রেটিনা বিচ্ছিন্ন অস্ত্রোপচার) অথবা চিকিৎসাগত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
এক চোখে ঝাপসা দেখা বিভিন্ন কারণ নির্দেশ করতে পারে। এই কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিসরাঙ্ক ত্রুটি থেকে শুরু করে স্ট্রোক, শুষ্ক চোখের সিন্ড্রোম, ম্যাকুলার ডিজেনারেশন এবং গ্লুকোমার মতো আরও গুরুতর অবস্থা। যদি ঝাপসা দেখা অব্যাহত থাকে বা আরও খারাপ হয়, তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসা সহায়তা নেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঝাপসা দেখার সাধারণ কারণগুলো কী কী?
ঝাপসা দেখা একটি খুবই সাধারণ লক্ষণ যার অনেক সম্ভাব্য কারণ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রতিসরাঙ্ক ত্রুটি, চোখের চাপ, মাথা ঘোরা এবং রেটিনা বিচ্ছিন্নতা। হেলথলাইনের তথ্য অনুযায়ী জেনে নেয়া যাক চোকে ঝাপসা দেখার নানা কারণ।
শুষ্ক চোখ
চোখ শুকিয়ে গেলে ঘুম থেকে ওঠার পরে ঝাপসা দেখতে পারেন। চোখের পানি চোখকে লুব্রিকেট করে, পুষ্টি জোগায় এবং সুরক্ষিত করে। ঘুমের সময়ও চোখে ক্রমাগত অশ্রু তৈরি হতে থাকে।তবে, কখনও কখনও চোখের পৃষ্ঠ শুকিয়ে যেতে পারে, যার ফলে সকালে ঝাপসা দেখতে পারেন। ঘুম থেকে ওঠার পর কয়েকবার পলক ফেললে আপনার কর্নিয়া আর্দ্র হতে পারে এবং ঝাপসা ভাব দূর হতে পারে।
চোখের অ্যালার্জি
অ্যালার্জির কারণে চোখ চুলকানি, ফোলাভাব এবং অধিকমাত্রায় পানি জমে থাকতে পারে। সেইসাথে চোখ শুকিয়েও যেতে পারে। ফলে ঘুম থেকে ওঠার পর ঝাপসা দৃষ্টি হতে পারে। চোখে অ্যালার্জি থাকলে ধুলাবালি থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে হবে।
মাথাব্যথার সাথে ঝাপসা দৃষ্টি
ঝাপসা দৃষ্টি এবং মাথাব্যথা বিভিন্ন কারণে হতে পারে যেমন চোখের চাপ, মাইগ্রেন, গ্লুকোমা এমনকি স্ট্রোক। যদি আপনার মাথাব্যথার সাথে সাথে এক বা উভয় চোখে হঠাৎ ঝাপসা দৃষ্টি দেখা দেয়, তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসা সহায়তা নিন।
ঝাপসা দৃষ্টিশক্তির সাথে বমি বমি ভাব
বমি বমি ভাবের সাথে ঝাপসা দৃষ্টির সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মাইগ্রেন, স্ট্রোক, ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস, রক্তে শর্করার পরিমাণ কম, গ্লুকোমার মতো চোখের রোগ এমনকি কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়া।
মুখ নিচু করে ঘুমানো
মুখ নিচু করে ঘুমানোর ফলে ফ্লপি আইলিড সিনড্রোম (FES) হতে পারে। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে উপরের চোখের পাতা স্থিতিস্থাপকতা হারায়। এর ফলে সকালে ঝাপসা দেখতে পারেন। সেইসাথে চোখ ফেটে যাওয়া এবং জ্বালাপোড়া হতে পারে। FES যে কারোরই হতে পারে, তবে স্থূলকায় পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়।
ঘুমানোর আগে কিছু ওষুধ সেবন
অ্যান্টিহিস্টামিন, ঘুমের ওষুধ, ঠান্ডা লাগার ওষুধ এবং উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সেবনের ফলে চোখের পানি কমে যেতে পারে। এসব ওষুধ ঘুমানোর আগে সেবন করলে, সকালে ঝাপসা দৃষ্টি এবং শুষ্ক চোখ অনুভব করতে পারেন।
কন্ট্যাক্ট লেন্স পরে ঘুমানো
কন্ট্যাক্ট লেন্স পরে ঘুমানোর ফলে চোখে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যেতে পারে, যার ফলে চোখ শুষ্ক হয়ে যায় এবং ঘুম থেকে ওঠার পরে ঝাপসা দৃষ্টি দেখা দেয়। ঘুমানোর সময় কন্ট্যাক্ট লেন্স পরা উচিত নয়।
ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল পান করা
আপনি যদি ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল পান করে থাকেন তবে সকালে ঝাপসা দেখতে পারেন। অ্যালকোহল পানিশূন্যতার কারণ হয়, যা শুষ্ক চোখ এবং ঝাপসা দেখা দিতে পারে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন
সকালে ঘুম থেকে উঠে ঝাঁপসা দেখা স্ট্রোকের পূর্বলক্ষণ হতে পারে। সুতরাং যতদ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
চোখের স্ট্রোকে কী কী লক্ষণ দেখা দেয়?
চোখ লাল হয়ে ফুলে পানি পড়তে পারে।
রেটিনার উপর রক্তজালিকা ভেসে উঠতে পারে। কিছুক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধতেও দেখা যায়। চোখে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয়। ফলে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়।
সাদা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকলেও মনে হতে পারে তার গায়ে যেন ধূসর ধূলিকণা ঘুরে বেড়াচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘ফ্লোটার্স’ বলা হয়।
চোখে স্ট্রোক হলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে। কারও ক্ষেত্রে চোখের নির্দিষ্ট একটি অংশ ঝাপসা হয়ে যেতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে পুরো দৃষ্টিশক্তিই ঝাপসা হয়ে যায়। পরিস্থিতি জটিল হলে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিও থাকে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চোখে স্ট্রোক হলে তা রোগী বুঝতে পারেন না। কারণ চোখের মধ্যে বিশেষ কোনও কষ্ট বা যন্ত্রণা হয় না। তবে চোখের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
অনেক সময়ে রক্তনালি ছিঁড়ে গিয়ে রেটিনা উপর তা ছড়িয়ে পড়ে। তাই চোখ রক্তবর্ণ হয়ে যায়।
চোখের স্ট্রোক প্রতিরোধ করণীয়
চোখ ভালো রাখতে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ বাদাম ও বীজ খেতে হবে।
প্রতিদিনের ডায়েটে বিটা-ক্যারোটিন যুক্ত খাবার যেমন গাজর, পালং শাক, ব্রোকলি, মিষ্টি আলু, স্ট্রবেরি রাখতে পারে। চাইলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টও খেতে পারেন।
চোখে সরাসরি রোদ লাগাবেন না। রোদ থেকে চোখ দুটি বাঁচাতে রোদচশমা ব্যবহার করার পরামর্শও দেন বিশেষজ্ঞরা।
চোখকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে চোখকে বিশ্রাম দিন ও চোখের ব্যায়াম করুন।
বাজার থেকে ভাল মানের ‘আইমাস্ক’ কিনে মাখতে পারেন। না হলে দিনের শেষে চোখের উপর দুই টুকরো শসা রেখে দিন কিছুক্ষণ। দেখবেন প্রশান্তি মিলছে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টিভি নিউজ