মানসিক অবসাদ
বিষণ্ণতায় আক্রান্ত মানুষের কথা ভাবলে অনেকের চোখে ভেসে ওঠে এমন একজনের ছবি, যিনি বিছানা ছেড়ে উঠতে কষ্ট পাচ্ছেন, বারবার কাঁদছেন কিংবা বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন। দৈনন্দিন কাজ করার শক্তি বা আগ্রহও হয়তো তাঁর নেই।
কিন্তু বিষণ্ণতার লক্ষণ সব সময় এমন দৃশ্যমান হয় না। কেউ হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আড্ডায় মেতে থাকেন, কর্মক্ষেত্রে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, এমনকি ব্যস্ত সামাজিক জীবনও সামলান। অথচ এসবের আড়ালে তিনি ভেতরে ভেতরে তীব্র বিষণ্ণতা, শূন্যতা কিংবা হতাশার সঙ্গে লড়াই করতে পারেন।
বিষণ্ণতার এমন অভিজ্ঞতাকে সাধারণভাবে ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ বা ‘হাসির আড়ালে বিষণ্ণতা’ বলা হয়। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত কোনো মানসিক রোগের নাম নয়। তবে পরিভাষাটি এমন একটি বাস্তব অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরে, যেখানে একজন মানুষের বাহ্যিক আচরণ ও ভেতরের অনুভূতির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকে।
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য গবেষক ডা. অলিভিয়া রেমিসের ভাষ্য অনুযায়ী, বাইরে থেকে কাউকে সুখী মনে হলেও তিনি ভেতরে ভেতরে বিষণ্ণ ও হতাশ বোধ করতে পারেন। গত পাঁচ বছরে ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ শব্দবন্ধটির অনলাইন অনুসন্ধানও ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ৩২ কোটির বেশি মানুষ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত। দীর্ঘ সময় ধরে মন খারাপ থাকা, কোনো কাজে আগ্রহ ও আনন্দ হারিয়ে ফেলা এবং ঘুম, সম্পর্ক ও দৈনন্দিন কাজকর্মে নেতিবাচক প্রভাব পড়া এ সমস্যার উল্লেখযোগ্য লক্ষণ।
তবে বিষণ্ণতা সব মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রকাশ পায় না। কারও ক্ষেত্রে প্রচলিত লক্ষণের বাইরে বেশি ঘুমানো, বেশি খাওয়া কিংবা ভালো কিছু ঘটলে সাময়িকভাবে মেজাজ ভালো হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বিষণ্ণতার কারণে সৃষ্ট কষ্ট অন্যদের কাছ থেকে আড়াল করার প্রবণতাও কারও কারও মধ্যে থাকতে পারে। মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের আড়াল করার প্রবণতাকে ‘মাস্কিং’ বলা হয়।
মানুষ কেন বিষণ্ণতা লুকিয়ে রাখেন?
অনেকে বুঝতেই পারেন না যে তাঁরা বিষণ্ণতায় ভুগছেন। দীর্ঘদিনের মানসিক ক্লান্তি, হতাশা কিংবা আগ্রহ হারিয়ে ফেলাকে তাঁরা ব্যস্ত জীবনযাপনের স্বাভাবিক পরিণতি বলে মনে করতে পারেন।
ডা. রেমিসের মতে, কারও কারও মধ্যে নিজের প্রতি অতিরিক্ত প্রত্যাশা কাজ করে। বিশেষ করে পারফেকশনিস্ট ও অতিমাত্রায় দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করতে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। তাঁরা মনে করতে পারেন, সমস্যার কথা স্বীকার করলে নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
আবার অনেকে সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়, কর্মক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা কিংবা অন্যের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ানোর উদ্বেগ থেকে নিজেদের অনুভূতি গোপন করেন। পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক প্রত্যাশাও তাঁদের খোলামেলা কথা বলার পথে বাধা হয়ে উঠতে পারে।
ফলে বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে মানসিক চাপ বাড়তে থাকে।
বিষণ্ণতা আড়াল করার ঝুঁকি
বিষণ্ণতার কষ্ট লুকিয়ে রেখে স্বাভাবিক জীবনযাপনের চেষ্টা করলে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে দেরি হতে পারে। দীর্ঘদিন সমস্যাটি উপেক্ষা করা হলে উপসর্গ আরও তীব্র হতে পারে এবং দৈনন্দিন জীবন ও সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক বার্নি ডান বলেন, বিষণ্ণতা মানুষকে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ বোধ করাতে পারে। অথচ অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বজায় রাখা অনেকের জন্য সহায়ক হতে পারে।
মানসিক কষ্টের কথা বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া তাই গুরুত্বপূর্ণ। গুরুতর বিষণ্ণতার ক্ষেত্রে আত্মহানির ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এ কারণে লক্ষণগুলোকে অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তা নেওয়া জরুরি।
যে ৭টি লক্ষণ সহজে চোখ এড়িয়ে যেতে পারে
১. প্রিয় কাজেও আনন্দ খুঁজে না পাওয়া
আগে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, ব্যায়াম করা কিংবা প্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতেন। কিন্তু এখন সেসব কাজ একঘেয়ে বা বিরক্তিকর মনে হচ্ছে। ব্যস্ততার কারণে এমন পরিবর্তনকে সাময়িক ক্লান্তি বলে মনে হলেও দীর্ঘদিন ধরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা বিষণ্ণতার একটি সম্ভাব্য লক্ষণ।
২. হাত-পা অস্বাভাবিক ভারী লাগা
কখনো কখনো হাত-পা ভারী লাগতে পারে এবং স্বাভাবিক চলাফেরাও কষ্টকর মনে হতে পারে। অ্যাটিপিক্যাল ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে এ ধরনের শারীরিক অনুভূতি দেখা যেতে পারে। তবে হাত-পা ভারী লাগার পেছনে অন্যান্য শারীরিক কারণও থাকতে পারে। তাই শুধু এই লক্ষণ দেখে বিষণ্ণতা নির্ণয় করা যায় না।
৩. বারবার সামাজিক পরিকল্পনা বাতিল করা
বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করতে ইচ্ছা হতে পারে। বাইরে হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করলেও একপর্যায়ে মানসিক ক্লান্তি বেড়ে যায়। তখন অন্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে একা থাকতে ইচ্ছা করতে পারে।
৪. বেশি ঘুমিয়েও ক্লান্তি না কমা
পর্যাপ্ত ঘুমের পরও ক্লান্তি কাটছে না, বরং স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমানোর প্রয়োজন হচ্ছে—এমন অভিজ্ঞতা কারও কারও বিষণ্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। দিনের কাজ সামলে নিলেও সন্ধ্যার দিকে মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
৫. সমালোচনা বা প্রত্যাখ্যানে অতিরিক্ত কষ্ট পাওয়া
কর্মক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাধারণ কোনো মন্তব্য কিংবা বন্ধুর পরিকল্পনা বাতিল করার ঘটনা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কষ্ট দিতে পারে। সমালোচনা ও প্রত্যাখ্যানের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা কিছু মানুষের মধ্যে দেখা যায়। তবে এই বৈশিষ্ট্য একা বিষণ্ণতার প্রমাণ নয়; অন্যান্য মানসিক অবস্থার সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
৬. সব সময় হাসিখুশি থাকা বা অন্যদের সাহায্যে ব্যস্ত থাকা
বিষণ্ণতায় আক্রান্ত সবাই যে নিজেকে গুটিয়ে নেন, তা নয়। কেউ কেউ আড্ডার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠেন, কাজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখেন কিংবা অন্যদের সাহায্য করতে সব সময় প্রস্তুত থাকেন। তাঁদের ব্যস্ততা ও হাসিখুশি আচরণের আড়ালে নিজের কষ্ট লুকিয়ে থাকতে পারে।
৭. নিজের সম্পর্কে ক্রমাগত নেতিবাচক চিন্তা
বাইরে থেকে আত্মবিশ্বাসী মনে হলেও ভেতরে ভেতরে কেউ নিজেকে নিয়ে অতিরিক্ত সমালোচনা করতে পারেন। নিজেকে ব্যর্থ, মূল্যহীন বা অন্যদের তুলনায় অযোগ্য মনে হওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা তৈরি হওয়া সতর্কসংকেত হতে পারে। এসব চিন্তা দীর্ঘস্থায়ী হলে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ থেকে বেরিয়ে আসতে কী করবেন?
‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ শব্দবন্ধটি মানুষের অভিজ্ঞতা বুঝতে সাহায্য করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিষণ্ণতার জটিলতাকে অতিরিক্ত সরল করে দেখানোর ঝুঁকিও তৈরি করে। হাসিমুখে থাকা মানেই কেউ সুখী, আবার সব সময় হাসিখুশি থাকা মানেই বিষণ্ণতা লুকিয়ে রাখা—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বার্নি ডানের পরামর্শ, নিজের অনুভূতি বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। একবারে সব কথা বলার প্রয়োজন নেই। ধীরে ধীরে নিজের মানসিক অবস্থার কথা জানালে অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে এবং একাকিত্ব কমতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে বিষণ্ণতা, আগ্রহ হারিয়ে ফেলা কিংবা দৈনন্দিন কাজে অসুবিধা দেখা দিলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী মনোচিকিৎসা, প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ওষুধ এবং সামাজিক সহায়তা কার্যকর হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানসিক কষ্টকে দুর্বলতা ভেবে লুকিয়ে না রাখা। বাইরে থেকে একজন মানুষ যতই সফল বা হাসিখুশি মনে হোন না কেন, তাঁর ভেতরের অনুভূতিও গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য। নিজের কষ্ট স্বীকার করা এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়া সুস্থতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।



.png)
.png)