শিকারি-সংগ্রাহকদের মতো ঘুমালেই কি ঘুম হবে আরও ভালো?
শিল্পোন্নত সমাজে গড়ে আমাদের ঘুমের পরিমাণ ও মানের কিছু দিক হয়তো ভালো হয়েছে। কিন্তু ঘুমের অন্যতম প্রধান ভিত্তি এখনো অনেকটাই উপেক্ষিত। সেটি হলো আমাদের সার্কাডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ি। এটি এমন একটি জৈবিক ঘড়ি, যা শরীরকে জানায় কখন জেগে থাকতে হবে আর কখন ঘুম ঘুম ভাব আসবে। এই দেহঘড়িকে সঠিকভাবে কাজ করাতে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত সংকেত বা ‘জাইটগেবার’-এর ধারাবাহিক প্রভাব প্রয়োজন।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ অ্যান্ড হিউম্যান ইভোলিউশন ল্যাবের পরিচালক এবং দ্য স্লিপলেস এপ: দ্য স্টোরি অব স্লিপ ইন হিউম্যান ইভোলিউশন বইয়ের লেখক ডেভিড স্যামসন বলেন, ‘আমরা এমন পরিবেশে বসবাস করছি, যা আমাদের এই প্রাচীন সময়-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক ছন্দ থেকে বিচ্যুত করছে।’
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘জাইটগেবার’ বা সময় নির্দেশক হলো আলো। এ কারণেই গবেষকেরা ঘুম থেকে ওঠার পর যত দ্রুত সম্ভব দিনের আলোতে থাকার পরামর্শ দেন। শিল্পোন্নত সমাজে বসবাসকারী মানুষের জন্য এটি শুধু দেহঘড়িকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে না, রাতে কৃত্রিম আলোর ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাবও কিছুটা কমাতে পারে। যদিও কৃত্রিম আলো নিয়ে আমাদের আগের ধারণার তুলনায় এর ক্ষতিকর প্রভাব হয়তো কিছুটা কম।
গবেষকেরা দেখেছেন, ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে অত্যন্ত উজ্জ্বল স্ক্রিন ব্যবহার করলে ঘুম আসতে প্রায় ১০ মিনিট দেরি হতে পারে। তবে দিনের বেলায় উজ্জ্বল আলোতে থাকলে এই প্রভাব আর দেখা যায়নি।
অবশ্য যেসব এলাকায় দিনের আলো কম, কিংবা যারা দিনের বেশির ভাগ সময় ঘরের ভেতরে কাজ করেন, তাদের জন্য এটি কঠিন হতে পারে। তারপরও অল্প সময়ের জন্য দিনের আলোতে থাকাও উপকারী হতে পারে। তাই পরেরবার ট্রেনে যাওয়ার বদলে কয়েক মিনিট হেঁটে যাওয়ার সুযোগ থাকলে, ঘরের ভেতরে না খেয়ে বাইরে দুপুরের খাবার খাওয়ার সুযোগ থাকলে, কিংবা জানালার পাশে বসে কাজ করার সুযোগ থাকলে সেটি কাজে লাগাতে পারেন।
তাপমাত্রার সঙ্গে দেহঘড়ির ছন্দ মিলিয়ে চলুন
ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন আরেকটি পরিবেশগত সংকেত হলো তাপমাত্রা। এমনকি উষ্ণ আবহাওয়ার এলাকাতেও সাধারণত রাতে তাপমাত্রা কমে এবং দিনের বেলায় আবার বাড়ে।
ঘুমবিষয়ক গবেষক জেরোম সিগেলের মতে, ঘুমের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার ভূমিকা বিশেষভাবে অবমূল্যায়িত। তিনি দেখেছেন, হাদজাদের মতো শিল্পায়নের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর মানুষ সাধারণত সূর্যাস্তের কয়েক ঘণ্টা পর ঘুমাতে যান এবং সূর্যোদয়ের আগেই জেগে ওঠেন। তাদের ঘুমের সময়সূচি আলোর পরিবর্তনের চেয়ে তাপমাত্রার ওঠানামার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়।
আধুনিক সমাজে আমরা অনেকেই এমন ঘরে থাকি, যেখানে দিন-রাত প্রায় একই তাপমাত্রা বজায় থাকে। এর কিছুটা প্রভাব পেতে ঘুমানোর আগে ঘরের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমিয়ে দিতে পারেন। চাইলে এমন স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট ব্যবহার করতে পারেন, যা রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। অথবা জানালা খুলে রাখতে পারেন।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ—সারা বছর আলো ও তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটে এবং শিকারি-সংগ্রাহক সমাজের মানুষের ঘুমও এর সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। শুধু ঘুমানোর সময় নয়, ঘুমের সময়কালও বদলায়। দিন যখন দীর্ঘ ও উষ্ণ থাকে, তখন তারা তুলনামূলক কম ঘুমান; আর দিন ছোট ও ঠান্ডা হলে বেশি ঘুমান।
এসব সমাজের অনেক মানুষ প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠেন। এটিও আমাদের সার্কাডিয়ান রিদমকে পুনরায় স্বাভাবিক ছন্দে আনতে সহায়তা করতে পারে। তবে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে ঘুমের ধরন কিছুটা বদলালে তা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুমানোর আগে শুধু কাজ থেকে লগ-আউট নয়, নিজেকেও ধীরে ধীরে শান্ত করুন
শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে সন্ধ্যা নামলেই মানুষ সঙ্গে সঙ্গে ঘুমাতে চলে যায় না। গবেষকেরা জানিয়েছেন, তারা তখন কাজের সঙ্গে সম্পর্কহীন ও আরামদায়ক বিভিন্ন কাজে সময় কাটান। যেমন আগুনের চারপাশে বসা, গল্প বলা কিংবা একে অপরের সঙ্গে দেখা করা।
নেভাদা বিশ্ববিদ্যালয়, লাস ভেগাসের নৃবিজ্ঞানী অ্যালিসা ক্রিটেনডেন গত দুই দশক ধরে প্রতিবছর তানজানিয়ার হাদজা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সূর্য ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের সবকিছু শান্ত হতে শুরু করে।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের বেলায় তাদের অধিকাংশ কাজ ও কথাবার্তা ঘোরে বাস্তব ও প্রয়োজনীয় বিষয়কে কেন্দ্র করে—কাজের পরিকল্পনা, সন্তানদের দেখাশোনা, খাবার সংগ্রহ ইত্যাদি। কিন্তু রাত নামলে এসব কাজ শেষ হয়ে যায়।
ক্রিটেনডেনের মতে, সন্ধ্যার সময়টি দিনের ব্যস্ত ও কাজকেন্দ্রিক সময়ের তুলনায় ‘আমূল ভিন্ন’ হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটিও শরীর ও মস্তিষ্ককে ঘুমের সময় হয়ে আসার একটি সংকেত দেয়।
এ কারণেই সম্ভব হলে ঘুমানোর ঠিক আগে অফিসের ই-মেইল দেখা, বিল পরিশোধ করা কিংবা কাজের নানা বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকার অভ্যাস বাদ দেওয়া ভালো। কর্মক্ষেত্রের কর্মকর্তাদেরও কর্মীদের কাছ থেকে ঘুমানোর আগমুহূর্তে কাজের প্রত্যাশা না করাই উচিত।
তবে আশপাশের মানুষের সঙ্গে সময় কাটান
শিকারি-সংগ্রাহক সমাজের মানুষের সন্ধ্যার কার্যক্রম শুধু কাজবিহীনই নয়, বরং এগুলোর বড় একটি অংশ সামাজিক ও সামষ্টিক। ক্রিটেনডেনের মতে, এটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন ও সহযোগিতার অনুভূতি তৈরি করে। তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘নাইটটাইম কো-অপারেটিভ নিস’।
এসব সমাজে অনেক মানুষ একই ঘরে বা একই জায়গায় অন্যদের সঙ্গে ঘুমান। শুধু জীবনসঙ্গী নয়, সন্তান, এমনকি কখনো বন্ধু বা প্রতিবেশীরাও তাদের সঙ্গে ঘুমান। ফলে ঘুমের সময়ও পারস্পরিক সংযোগের এই অনুভূতি বজায় থাকে।
শিল্পোন্নত সমাজেও কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, একা ঘুমানোর তুলনায় অন্য কারও সঙ্গে ঘুমালে মানুষ অনেক সময় মনে করেন যে তারা ভালো ঘুমিয়েছেন।
কয়েক দশকের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একাকিত্ব অনুভব করেন, তাদের ঘুমের মানও সাধারণত খারাপ হয়। তাই সামাজিক বন্ধন ও পারস্পরিক সংযোগ শুধু মানসিকভাবে ভালো থাকার জন্য নয়, ভালো ঘুমের জন্যও উপকারী হতে পারে।
অবশ্য যারা একা থাকেন কিংবা ছোট পরিবারে বসবাস করেন, তাদের জন্য শিকারি-সংগ্রাহক সমাজের মতো সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা কঠিন। তারপরও সন্ধ্যার সময় অন্যদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর অভ্যাস করা যেতে পারে। যেমন দলগত যোগব্যায়ামের ক্লাসে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়া কিংবা কাছের কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলা—এসবও ভালো ঘুমে সহায়ক হতে পারে।
নিখুঁত ঘুমের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি বাদ দিন
গবেষকেরা বারবার আমাকে একই কথা বলেছেন—গড়ে শিকারি-সংগ্রাহক এবং অন্যান্য শিল্পায়ন-বহির্ভূত সমাজের মানুষ আমাদের তুলনায় কম ঘুমান এবং রাতে বেশি বার জেগে ওঠেন।
ক্রিটেনডেনের ভাষায়, শিল্পোন্নত দেশের মানুষ টানা আট ঘণ্টা ঘুমানোর যে লক্ষ্য স্থির করেন, শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে সেটি অনেকটাই ‘অবাস্তব কল্পনা’। ঘুম নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ তৈরি করার কারণে এই লক্ষ্য উল্টো আমাদের ঘুম আরও খারাপ করে দিতে পারে।
বর্তমান সমাজে সুস্থতার প্রায় প্রতিটি বিষয়কে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিমাপ করার প্রবণতা বাড়ছে। ঘুমও এর বাইরে নয়। ফলে আমাদের অনেকেরই এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা উপকারী হতে পারে যে প্রতিটি রাতের ঘুম হুবহু একই রকম হতে হবে। ভালোভাবে কাজ করার জন্য প্রতিরাতের ঘুম একই রকম হওয়াও জরুরি নয়।
বিবর্তনীয় নৃবিজ্ঞানী গান্ধী ইয়েটিশ বলেন, ‘প্রতিটি রাতে আপনার ঘুম একই রকম হবে—এমন প্রত্যাশা করবেন না। আপনি তো টানা দুই দিন একই খাবার খান না। তাহলে কেন আশা করবেন, টানা দুই দিন আপনার ঘুমও ঠিক একই রকম হবে?’
হাদজা, তসিমানে, সানসহ বিভিন্ন শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর ঘুম নিয়ে গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ইয়েটিশের মতে, সমস্যার একটি অংশ হলো—প্রতিদিন আমাদের কাছ থেকে একই মাত্রার সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতা প্রত্যাশা করা হয়। তাই আমরাও প্রতিরাতে একই মাত্রার নিখুঁত ঘুম পাওয়ার প্রত্যাশা করি।
কিন্তু সম্ভবত অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে এই মানসিকতাটিই আমাদের পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
এমন দিন আসবেই, যেদিন আমাদের শক্তি, মনোযোগ বা চিন্তার স্বচ্ছতা কিছুটা বেশি কিংবা কম থাকবে। কখনো কখনো এটি ঘুমের সমস্যা বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রা কিংবা অতিরিক্ত ক্লান্তিকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
তবে কিছুটা ওঠানামা মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কারণ আমরা যন্ত্র নই, আমরা মানুষ। আর এই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়াই হয়তো আরও ভালো ঘুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হতে পারে।



.png)
.png)