ঢাকা,  বৃহস্পতিবার
১৫ অক্টোবর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শত শত কোটি ইউরোর গোপন লেনদেন, অর্থ গেছে সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধে

প্রকাশিত: ১৪:৪৩, ৩০ আগস্ট ২০২৬

হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শত শত কোটি ইউরোর গোপন লেনদেন, অর্থ গেছে সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধে

হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শত শত কোটি ইউরোর গোপন লেনদেন,

হোয়াটসঅ্যাপের একটি গ্রুপ চ্যাট ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে শত শত কোটি ইউরো নগদ অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে। কোনো ধরনের নথিপত্র বা ইলেকট্রনিক রেকর্ড ছাড়াই সংঘবদ্ধ অপরাধ ও উগ্রবাদে এসব অর্থ ব্যবহারের তথ্য পেয়েছে ইউরোপের কয়েকটি সম্প্রচারমাধ্যমের যৌথ অনুসন্ধান।

তদন্তে দেখা গেছে, ‘Traders of Greater Europe’ নামে ৫৩২ সদস্যের ওই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বিভিন্ন দেশের সীমান্ত পেরিয়ে নগদ অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হতো। এসব লেনদেনের মধ্যে যুক্তরাজ্যের লন্ডন ও বার্মিংহামের মতো শহরেও অর্থ পাঠানোর নির্দেশনা ছিল।

একটি ঘটনায় বেলজিয়ামের ব্রাসেলস থেকে পাঠানো অর্থ সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট (আইএস) গোষ্ঠীর সদস্যদের কাছে পৌঁছেছিল।

European Broadcasting Union (EBU)-এর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নেটওয়ার্ক, যার সদস্য বিবিসিও, আরও জানতে পেরেছে যে একই ধরনের নগদ অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা মানবপাচার ও মাদক পাচারেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

৮২ হাজারের বেশি বার্তা

‘Traders of Greater Europe’ গ্রুপে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮২ হাজারের বেশি বার্তা আদান-প্রদান করা হয়।

বেলজিয়ামের তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট ভিনসেন্ট গুয়েরা প্রথম গ্রুপটির অস্তিত্বের সন্ধান পান। জটিল মামলায় বিচারের আগে প্রমাণ পরীক্ষা করে মামলা এগিয়ে নেওয়া হবে কি না সে বিষয়ে সুপারিশ করেন তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট।

গুয়েরার ভাষায়, লেনদেনের সংখ্যা ছিল ‘অবিশ্বাস্য’ এবং এই নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি ছিল ‘পুরো পৃথিবীজুড়ে’।

তিনি বলেন, শুরুতে মামলাটি ছিল সন্ত্রাসে অর্থায়নের তদন্ত। কিন্তু পরে এটি এত বিপুল পরিমাণ লেনদেনের সন্ধান দেয় যে সন্ত্রাসে অর্থায়নের বিষয়টি পুরো ব্যবস্থার তুলনায় ‘সমুদ্রের এক ফোঁটা’র মতো হয়ে যায়।

তদন্তে পাওয়া হোয়াটসঅ্যাপ বার্তাগুলো আরবি ভাষায় লেখা ছিল। এসব বার্তার মাধ্যমে প্রাচীন ‘হাওয়ালা’ পদ্ধতি ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো।

বার্তাগুলোতে লন্ডন, বার্মিংহাম ও লিভারপুলের মতো যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ অর্থের চাহিদার কথাও ছিল। যেমন—লন্ডনে ৬০ হাজার পাউন্ড, বার্মিংহামে ১৫ হাজার ১৫০ পাউন্ড এবং লিভারপুলে ২ লাখ পাউন্ড পাঠানোর অনুরোধ পাওয়া যায়। এর জবাবে গ্রুপের সদস্যরা ‘পাঠানো হয়েছে’ বা ‘উপলব্ধ আছে’ ধরনের উত্তর দিতেন।

কীভাবে কাজ করে হাওয়ালা পদ্ধতি?

হাওয়ালা হলো বিশ্বজুড়ে অর্থ স্থানান্তরের একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা। এতে বিশ্বস্ত অর্থদালালদের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অর্থ এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠানো হয়, কিন্তু সাধারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মতো ইলেকট্রনিক রেকর্ড বা নগদ অর্থের সরাসরি পরিবহনের প্রয়োজন হয় না।

এই ব্যবস্থায় বিভিন্ন স্থানে থাকা দুই অর্থদালাল, যাদের ‘হাওয়ালাদার’ বলা হয়, নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করেন।

একজন হাওয়ালাদার প্রেরকের কাছ থেকে নগদ অর্থ নেন এবং অন্য স্থানে থাকা সহযোগী হাওয়ালাদার কমিশন বাদ দিয়ে একই পরিমাণ অর্থ গ্রহীতার হাতে পৌঁছে দেন। পরে দুই হাওয়ালাদার নিজেদের মধ্যে লেনদেনের হিসাব মিটিয়ে নেন।

অভিবাসী শ্রমিকদের পরিবারের কাছে অর্থ পাঠানোর মতো বৈধ কাজেও হাওয়ালা পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে যেসব দেশে ব্যাংকিং সুবিধা সীমিত, সেখানে এই ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত।

তবে অপরাধীরাও এই পদ্ধতির সুযোগ নিতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের প্রচলিত SWIFT ব্যবস্থার বাইরে হাওয়ালার মাধ্যমে লেনদেন করা সম্ভব। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় বা অস্বাভাবিক লেনদেন সাধারণত নজরদারির আওতায় আসে এবং সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট করার বাধ্যবাধকতা থাকে।

‘Traders of Greater Europe’ গ্রুপটি মূলত ৫ হাজার ইউরোর বেশি লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত হতো। তবে অনেক ক্ষেত্রে লেনদেনের পরিমাণ ছিল আরও বেশি।

তবে গ্রুপের সব সদস্যই যে অপরাধমূলক অর্থের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ দেশে হাওয়ালা অবৈধ। তবে যুক্তরাজ্যে রাজস্ব ও শুল্ক কর্তৃপক্ষ HMRC-তে নিবন্ধিত দালালদের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা আইনসঙ্গত।

এক ফোনেই মিলল বিশাল নেটওয়ার্কের তথ্য

২০২৪ সালে বেলজিয়ামের একটি আদালতের মামলায় ছয়জন অর্থপাচারকারী দোষী সাব্যস্ত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন ব্রাসেলসের নেটওয়ার্কপ্রধান আবু আদম এবং তাঁর সহযোগী আবু আহমেদ।

ওই মামলায় পাওয়া হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার তথ্য পরবর্তীতে EBU-এর হাতে আসে।

বেলজিয়ামের পুলিশ তদন্তে জানতে পারে, অভিযুক্তরা ইসলামিক স্টেটের কাছে অর্থ পাঠিয়েছিলেন। ওই অর্থের উদ্দেশ্য ছিল সিরিয়ায় আটক শিবিরে থাকা আইএস সদস্যদের স্ত্রীদের সেখান থেকে পালাতে সহায়তা করা।

আবু আদমকে গ্রেপ্তারের সময় তাঁর মোবাইল ফোনে ‘Traders of Greater Europe’ গ্রুপটি পাওয়া যায়।

গুয়েরা বলেন, এত বড় একটি গোপন নেটওয়ার্কের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের সন্ধান পাওয়া ছিল যেন ‘জ্যাকপট পাওয়া’র মতো।

তাঁর ফোনে ৫ ইউরোর নোটের ৬ হাজার ছবি পাওয়া যায়, যেখানে প্রতিটি নোটের সিরিয়াল নম্বর দেখা যাচ্ছিল। এ ছাড়া ৬ হাজার পরিচয়পত্রের ছবিও ছিল।

হাওয়ালা লেনদেনে এসব তথ্য অনেক সময় স্বতন্ত্র শনাক্তকারী কোড হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নোট ও পরিচয়পত্রের সংখ্যার ভিত্তিতে গুয়েরার ধারণা, আবু আদম অন্তত ১২ হাজার লেনদেন পরিচালনা করেছিলেন।

গুয়েরা বলেন, “এটি কোনো অপেশাদার কাজ নয়; এটি পেশাদার পর্যায়ের এবং আমরা যতটা ধারণা করেছিলাম, তার চেয়েও অনেক বড়। তারা কোনো সরকারি নজরদারি ছাড়াই ব্যাংকারের মতো কাজ করছে।”

মাদক, মানবপাচার ও যৌন ব্যবসায়ও ব্যবহার

EBU-এর তদন্তে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে হাওয়ালা ব্যবস্থার ব্যবহারকারী আরও কয়েকটি চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে।

ইউরোপের হাওয়ালা নেটওয়ার্কে অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন এক সাবেক অর্থপাচারকারীকে তদন্তে ‘ফ্র্যাঙ্ক’ নামে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তিনি EBU-কে জানান, তিনি কয়েক শ কোটি ইউরোর সমপরিমাণ লেনদেনে জড়িত ছিলেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রটারডামের বাইরে একটি ছোট শহরের একটি অফিসে প্রথম তিনি হাওয়ালা ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হন। সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ-ছয়জন বার্তাবাহক এসে অর্থ নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা, ওই সময় অন্তত ১০ লাখ ইউরোর লেনদেন হয়েছিল।

তিনি বলেন, “পরে আমি জানতে পারি, বিষয়টি শুধু অর্থের নয়। এর সঙ্গে সন্ত্রাসে অর্থায়ন, মাদক পাচার, যৌন ব্যবসা এবং আরও নানা ধরনের অপরাধ জড়িত।”

ভিয়েনায় কাবাবের দোকান থেকেই চলত হাওয়ালা কার্যক্রম

অস্ট্রিয়াতেও বিভিন্ন মামলায় মানবপাচার ও সহিংসতার সঙ্গে হাওয়ালা ব্যবস্থার যোগসূত্র পাওয়া গেছে।

EBU নেটওয়ার্কের সদস্য অস্ট্রিয়ার সম্প্রচারমাধ্যম ORF-এর এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশটির পুলিশ ভিয়েনায় নিজেদের ভাষায় ‘সবচেয়ে বড় হাওয়ালা অফিস’ হিসেবে পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায়।

ব্যস্ত সড়কের পাশে একটি কাবাব রেস্তোরাঁ থেকে ওই কার্যক্রম পরিচালিত হতো। কর্তৃপক্ষের দাবি, মানবপাচারের অর্থ লেনদেনে এই প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহৃত হতো।

ওই কার্যক্রম পরিচালনাকারী দুই সিরীয় ভাইয়ের বিরুদ্ধে মানবপাচারের পাশাপাশি ৩ লাখ ৫০ হাজার ইউরো হারিয়ে ফেলার অভিযোগে এক কুরিয়ারকে নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগও আনা হয়। তারা গত বছর দোষী সাব্যস্ত হন এবং যথাক্রমে ১৮ ও ৮ বছরের কারাদণ্ড পান।

এ ছাড়া অস্ট্রিয়ার পুলিশ ও ইউরোপীয় পুলিশ সংস্থা ইউরোপোল সম্প্রতি হাওয়ালা ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থায়িত আরেকটি মানবপাচারকারী চক্রও ভেঙে দিয়েছে।

কর্মকর্তাদের দাবি, ওই চক্রটি ১৮ মাসে প্রায় ১ লাখ মানুষকে ইউরোপে পাচার করেছে।

অস্ট্রিয়ার Criminal Intelligence Service-এর মানবপাচার তদন্ত বিভাগের প্রধান জেরাল্ড টাটজার্ন ORF-কে বলেন, মানবপাচারের ক্ষেত্রে নির্যাতন একটি বাস্তবতা এবং সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করতেও এটি ব্যবহার করা হয়।

তিনি বলেন, নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে বলা হতো—আরও ১ হাজার বা কয়েক হাজার ইউরো না পাঠালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, অর্থাৎ তাদের ছেলে, ভাই বা বাবা নির্যাতনের শিকার হবেন।

টাটজার্ন জানান, নির্যাতন বন্ধ করার জন্য যে অর্থ দাবি করা হতো, তা হাওয়ালা ব্যবস্থার মাধ্যমেই পাঠানো হতো।

সংঘবদ্ধ অপরাধের ‘প্রধান অর্থপাচার চ্যানেল’

একাধিক অর্থপাচার তদন্তের নেতৃত্ব দেওয়া পুলিশ কমান্ডার ও ইউরোপোলের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা কুয়েন্টিন মাগ বলেন, সংঘবদ্ধ অপরাধের জন্য হাওয়ালা ব্যবস্থা হলো ‘প্রধান অর্থপাচার চ্যানেল’।

তিনি বলেন, অর্থ অভিবাসী পাচার, মানবপাচার, দালালি, পরিবারের কাউকে জন্মদিনের উপহার হিসেবে পাঠানো সঞ্চয় কিংবা ফ্রান্সে কর্মরত কোনো মালিয়ান নাগরিকের পরিবারের কাছে পাঠানো অর্থ—যেখান থেকেই আসুক না কেন, হাওয়ালাদারদের কাছে সেটি বড় বিষয় নয়। তারা শুধু নিজেদের নির্ধারিত কমিশন বা বিনিময় হার অনুযায়ী অর্থ লেনদেন করে।

তদন্তকারীদের মতে, হাওয়ালা ব্যবস্থার বৈধ ব্যবহার থাকলেও এর গোপনীয়তা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে লেনদেনের সুযোগ সংঘবদ্ধ অপরাধী ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলোর জন্য বড় সুবিধা তৈরি করেছে।

Advertisement
Advertisement