নানা পাটেকার
বলিউডের প্রবীণ অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নানা পাটেকার আর নেই। বৃহস্পতিবার ভোরে ভারতের গোয়ায় নিজের বাসভবনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট সিপিআর দিয়েও তাঁকে বাঁচাতে পারেননি।
প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে নানা পাটেকার হিন্দি ও মারাঠি সিনেমায় নিজের স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলী ও শক্তিশালী সংলাপ উপস্থাপনের মাধ্যমে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন। ‘গমন’ দিয়ে ১৯৭৮ সালে চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নি সাক্ষী’, ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘ওয়েলকাম’, ‘নটসম্রাট’সহ বহু সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং পদ্মশ্রীসহ একাধিক সম্মানও পেয়েছেন তিনি।
তবে তাঁর এই সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। মাত্র ১৩ বছর বয়সে কাজ শুরু করেছিলেন নানা পাটেকার। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় মুম্বাইয়ের চুনাভাট্টিতে গিয়ে সিনেমার পোস্টার আঁকতেন। স্কুল শেষে প্রায় আট কিলোমিটার হেঁটে কর্মস্থলে যেতেন তিনি। মাসে তাঁর আয় ছিল মাত্র ৩৫ রুপি। অনেক সময় দিনে একবার খাবার জুটত।
এক সাক্ষাৎকারে নানা পাটেকার জানিয়েছিলেন, বাবার সম্পত্তি হারানোর পর তাঁদের পরিবারের আর্থিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি হয়। সেই সময়ের ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা ও অভাব তাঁর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রে সাফল্য পাওয়ার পরও শৈশবের সেই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনযাপনে ছাপ রেখে যায়।
৩৫ রুপি থেকে কোটি টাকার পারিশ্রমিক
অভিনয়জীবনের শুরুতে সামান্য আয় করলেও ধীরে ধীরে নানা পাটেকারের ক্যারিয়ার ও পারিশ্রমিক দুটিই বাড়তে থাকে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনের শেষ দিকে একটি সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তিনি প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নিতেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন উপস্থিতি ও ব্র্যান্ড-সম্পর্কিত কাজ থেকেও আয় করতেন তিনি। একাধিক প্রতিবেদনে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৬০ থেকে ৮০ কোটি রুপি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বিপুল অর্থ উপার্জন করলেও বিলাসী জীবনযাপনের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল না। দীর্ঘদিন মুম্বাইয়ের আন্ধেরিতে প্রায় ৭৫০ বর্গফুটের একটি এক বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন তিনি। কয়েক দশক আগে প্রায় ১ দশমিক ১ লাখ রুপিতে কেনা সেই ফ্ল্যাটটির বর্তমান মূল্য প্রায় ৩ কোটি রুপি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোয়াতেও তাঁর একটি বাড়ি ছিল। এ ছাড়া পুনের খাদকওয়াসলার কাছে প্রায় ২৭ একরের একটি খামারবাড়ি ছিল তাঁর। সেখানে গম ও ধানের মতো বিভিন্ন ফসল চাষ করা হতো।
বিলাসিতার চেয়ে সাধারণ জীবন
বলিউডের অনেক তারকার মতো নানা পাটেকারের গাড়ির সংগ্রহও ছিল না খুব বড়। তাঁর গাড়ির তালিকায় ছিল মাহিন্দ্রা জিপ সিজে৪, মাহিন্দ্রা স্করপিও এবং অডি কিউ৭।
বিলাসবহুল গাড়ি কেনার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন বেশ অনাগ্রহী। জানা যায়, একবার দেড় কোটি রুপি দামের একটি বিলাসবহুল গাড়ি কেনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি। বরং সেই অর্থ কৃষকদের সহায়তায় ব্যয় করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
নানা পাটেকারের জীবন তাই শুধু একজন অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয়; এটি দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে নিজের প্রতিভা ও পরিশ্রমে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার গল্প। মাত্র ৩৫ রুপি মাসিক আয় থেকে কোটি রুপির পারিশ্রমিক—দীর্ঘ এই যাত্রায় অর্থ ও খ্যাতি পেলেও শৈশবের অভাব-অনটনের স্মৃতি তিনি কখনো ভুলে যাননি।
বৃহস্পতিবার তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।



.png)
.png)