প্রীতম–শেহতাজের বিচ্ছেদ: যে গল্পের শুরু ‘জাদুকর’-এর শুটিংয়ে
‘আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চলো’—২০১৭ সালে প্রীতম হাসানের গাওয়া ‘জাদুকর’ গানের মিউজিক ভিডিওতে বলা এই সংলাপ যেন শুধু পর্দার গল্প ছিল না। ওই গানের শুটিংয়েই প্রীতম হাসানের সঙ্গে শেহতাজ মনিরা হাশেমের পরিচয়। এরপর পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। প্রায় পাঁচ বছরের সম্পর্কের পর ২০২২ সালের অক্টোবরে বিয়ের মাধ্যমে একসঙ্গে পথচলা শুরু করেন তাঁরা।
বিয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রীতম–শেহতাজকে দেখে মনে হতো, তাঁদের সংসার বেশ ভালোই চলছে। কখনো ঘোরাঘুরি, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, আবার কখনো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একসঙ্গে উপস্থিতি—দুজনের ছবি নিয়মিতই দেখা যেত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তাই তাঁদের বিচ্ছেদের খবর প্রকাশ্যে আসার পর অনেকের কাছেই বিষয়টি ছিল অপ্রত্যাশিত।
কীভাবে এতটা পথ একসঙ্গে পেরিয়ে এসে আলাদা হয়ে গেলেন তাঁরা—এ প্রশ্নই এখন ঘুরছে তাঁদের ভক্তদের মধ্যে।
গত রোববার রাতে প্রীতম ও শেহতাজ দুজনেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলাদা পোস্ট দিয়ে জানিয়েছেন, তাঁরা আর বৈবাহিক সম্পর্কে নেই। তবে তাঁদের প্রকাশ্য বক্তব্যের বাইরে কাছের মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল আরও আগে। এর সঙ্গে প্রীতমের সংগীত ক্যারিয়ারে আসা বড় পরিবর্তনেরও যোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঘনিষ্ঠজনেরা।
‘জাদুকর’ থেকে প্রেম
২০১৭ সালে ‘জাদুকর’ গানের মিউজিক ভিডিওর শুটিংয়ে প্রীতম ও শেহতাজের পরিচয়। কাজ করতে করতে তাঁদের যোগাযোগ বাড়ে। একসময় বন্ধুত্ব ও ভালো লাগা রূপ নেয় প্রেমে।
পরে প্রীতম নিজেই জানিয়েছিলেন, ‘জাদুকর’-এর শুটিংয়ের পরই শেহতাজকে বিয়ের কথা বলেছিলেন তিনি।
দীর্ঘ সম্পর্কের পর ২০২২ সালের ২৯ অক্টোবর শ্রীমঙ্গলের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে বিয়ে করেন তাঁরা। পাহাড় ও চা-বাগানে ঘেরা সেই আয়োজনে দুই পরিবারের সদস্য এবং ঘনিষ্ঠজনেরা উপস্থিত ছিলেন। নিজের বিয়ের পোশাকের নকশাও নিজেই করেছিলেন শেহতাজ।
বিয়ের ছবি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়। ২০২৩ সালে নিজেদের নতুন বাসায় ওঠেন প্রীতম–শেহতাজ। সংসারের পাশাপাশি দুজনের পেশাগত কাজও চলছিল।
‘তুফান’-এর পর বদলে যায় প্রীতমের ব্যস্ততা
প্রীতমের সংগীতজীবনে ‘তুফান’ সিনেমাটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। নিজের মতো করে গান করা এবং কোক স্টুডিও বাংলার কাজের পাশাপাশি ‘তুফান’-এর গান ও অভিনয় তাঁকে আরও বড় পরিসরের দর্শকের কাছে পরিচিত করে তোলে।
এর আগে তাঁর নিজস্ব সংগীতের আলাদা শ্রোতাশ্রেণি থাকলেও ‘তুফান’-এর পর তাঁর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে। বাড়তে থাকে স্টেজ শোর সংখ্যা, দেশ-বিদেশে যাতায়াত এবং সম্মানীও।
এরপর ‘বরবাদ’ সিনেমার ‘চাঁদমামা’ ও ‘দ্বিধা’ এবং ‘প্রিন্স’ সিনেমার ‘জ্বালা জ্বালা’র মতো গান তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। একের পর এক গান, স্টেজ শো এবং দেশ-বিদেশে ব্যস্ততার কারণে দ্রুত বদলে যেতে থাকে প্রীতমের জীবনযাত্রা।
২০২৪ সালের শেষ দিকে দূরত্ব
ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের শেষের দিকে প্রীতম–শেহতাজের সম্পর্কের টানাপোড়েন স্পষ্ট হতে শুরু করে। দুজনের একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে আসে। একই সময়ে প্রীতমের কাজের ব্যস্ততা যেমন বাড়ছিল, তেমনি তাঁর আচরণেও পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন কাছের মানুষদের কেউ কেউ।
ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, প্রীতমের আচরণের এই পরিবর্তন শেহতাজের জন্য সহজভাবে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে তাঁদের মধ্যে আগের মতো বোঝাপড়া ধীরে ধীরে কমতে থাকে। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া বা আড্ডার সময়ও দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁদের ঘনিষ্ঠজনেরা। এমনকি বন্ধুদের উপস্থিতিতে একাধিকবার অস্বস্তিকর পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল বলে তাঁদের দাবি।
এরপর দুজনের দূরত্ব আরও বাড়তে থাকে।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা
তবে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার পরও বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন প্রীতম ও শেহতাজ—এমনটাই জানিয়েছেন তাঁদের ঘনিষ্ঠজনেরা। তাঁদের বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকেই আশা করেছিলেন, সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টা সফল হয়নি।
সম্পর্কে দূরত্ব বাড়লেও বাইরে থেকে বিষয়টি বোঝার সুযোগ ছিল খুব কম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের ঘোরাঘুরির ছবি ছিল, বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও পাশাপাশি দেখা গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতেও জেফার রহমান ও রাফসান সাবাবের বিয়ের অনুষ্ঠানে একসঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁরা।
ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা তাঁদের ছবি এবং ব্যক্তিগত জীবনের বাস্তবতা যেন তখন দুই ভিন্ন গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
শেহতাজের নতুন করে ফেরার প্রস্তুতি
বিয়ের আগে গান ও অভিনয়ে ব্যস্ত থাকলেও বিয়ের পর এই দুই মাধ্যম থেকেই অনেকটা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন শেহতাজ। অন্যদিকে প্রীতম ক্রমেই সংগীতকেন্দ্রিক ব্যস্ততায় ডুবে যান।
বিচ্ছেদের ঘোষণা দেওয়ার প্রায় দুই মাস আগে শেহতাজ কানাডায় যান। সেখানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটান। দেশে ফেরার পরই তাঁদের বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসে।
গত রোববার রাতে নিজেদের ফেসবুক পোস্টে আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা জানান প্রীতম ও শেহতাজ। দুজনের বক্তব্যেই ছিল পরস্পরের প্রতি সম্মান ও শুভকামনা। পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে বাড়তি আলোচনা না করে তাঁদের ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করার অনুরোধও জানিয়েছেন তাঁরা।
প্রায় এক দশকের পরিচয়, প্রেম, বিয়ে ও সংসারের পর এখন দুজনই নিজেদের মতো করে নতুন অধ্যায় শুরু করতে চান। ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তের পর দুজনই অনেকটা স্বস্তিতে আছেন।
শেহতাজ আবার অভিনয় ও গানে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। অন্যদিকে প্রীতমও নতুন গান ও সংগীতের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
একসময় ‘জাদুকর’-এর শুটিংয়ে যে সম্পর্কের শুরু হয়েছিল, প্রায় এক দশক পর সেই সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটল। সামনে এখন দুজনের পথ আলাদা—তবে দুজনেরই প্রত্যাশা, নতুন অধ্যায়টি কাটুক পারস্পরিক সম্মান ও শুভকামনায়।



.png)
.png)