উত্তরা যেন নয়াদিল্লি, চীনা নাগরিকদের লাইভ ভিডিওতে বাংলাদেশ নিয়ে মিথ্যাচার
একদল বিদেশি নাগরিক রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ভিডিও করছেন। প্রত্যেকের হাতে দুটি করে মুঠোফোন। একটিতে চলছে সরাসরি সম্প্রচার (লাইভ), অন্যটিতে লেখা দেখে দেখে কথা বলছেন তাঁরা। তাঁদের কর্মকাণ্ড দেখে প্রথমে মনে হতে পারে, তাঁরা সাংবাদিক কিংবা গুগল স্ট্রিট ভিউয়ের জন্য কাজ করছেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁরা পণ্যের প্রচারণার কথা বলে মাসের পর মাস এভাবে লাইভ ভিডিও করে চলেছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে তাঁদের এই কার্যক্রম। কখনো কখনো মানুষের বাড়িঘরের ভেতরেও ঢুকে ভিডিও ধারণ করেন। এতে বিব্রত ও বিরক্ত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
রাজধানীর উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর ও টেকপাড়া এলাকায় গেলেই দেখা মিলবে চীনা নাগরিকদের এমন কর্মকাণ্ডের। ঠিক কতজন চীনা নাগরিক এভাবে ভিডিও ধারণ করছেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দেড় শতাধিক চীনা নাগরিক নিয়মিত এলাকার অলিগলিতে ঘুরে ভিডিও করছেন। এসব ভিডিও কোথায় প্রকাশ করা হচ্ছে, তাতে কী বলা হচ্ছে, সে সম্পর্কে কিছুই জানেন না স্থানীয় লোকজন। তাঁদের কার্যক্রম নিয়ে থানা-পুলিশেরও তেমন কোনো নজরদারি নেই।
শুরুর দিকে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল থাকলেও দিনের পর দিন একইভাবে ভিডিও ধারণ করায় এখন বাড়ছে বিরক্তি। বিশেষ করে আবাসিক এলাকায় ঢুকে অনুমতি ছাড়াই ভিডিও করার ঘটনায় ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা।
উত্তরার টেকপাড়া এলাকার বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন, ‘দু–এক দিনের ব্যাপার হলে হয়, কিন্তু এরা (চীনা নাগরিক) মাসের পর মাস এমন ভিডিও করে। আমরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই তারা ভিডিও করা শুরু করে। ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও দেখি তারা ভিডিও করছে। কিন্তু ভিডিওগুলো কী করে, আমরা জানি না।’
উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় চীনা নাগরিকদের এমন কর্মকাণ্ড স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি নতুন আসা মানুষেরও নজর কাড়ে। অনেকেই জানতে চান, কেন তাঁরা দিনের পর দিন এভাবে ভিডিও করছেন। এলাকাটিতে বিশেষ কোনো পর্যটন আকর্ষণ বা দর্শনীয় স্থান না থাকলেও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, দোকানপাট ও ঘরবাড়ি কেন তাঁদের ভিডিওর বিষয় হয়ে উঠেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় ভিডিও করলেও সবচেয়ে বেশি দেখা যায় টেকপাড়ায়। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি খালের পাড়ে এই এলাকার অবস্থান। উত্তরার অন্যান্য এলাকার তুলনায় এটি কিছুটা অনুন্নত। এখানে নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় এলাকার পরিবেশও বেশ অপরিচ্ছন্ন। চীনা নাগরিকেরা ভিডিও ধারণের জন্য মূলত এমন এলাকাকেই বেছে নিয়েছেন।
গত ২৭ অক্টোবর ও ৩ নভেম্বর উত্তরার এসব এলাকায় গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি ১৭ জন চীনা নাগরিকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছে প্রথম আলো। তাঁদের ভিডিও ধারণের উদ্দেশ্য ও ভিডিও প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা হয়। তবে অধিকাংশ চীনা নাগরিক কথা বলতে চাননি। যাঁরা সামান্য আগ্রহ দেখিয়েছেন, তাঁরা শুধু নিজেদের নাম ও দেশের নাম জানিয়ে চলে গেছেন। কয়েকজন ইংরেজি জানেন না বলে কথা এড়িয়ে যান। গুগল ট্রান্সলেটরের সাহায্যে কথা বলার চেষ্টা করলেও তাঁরা রাজি হননি।
গত ২৭ অক্টোবর বিকেলে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ভিডিও ধারণকারী এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখা যায়, রিতু আক্তার নামের এক বাংলাদেশি নারী তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন। তিনি জানান, চীনা নাগরিকদের গাইড হিসেবে কাজ করেন। কয়েক মাস ধরে এ কাজ করছেন তিনি। তাঁর মতো আরও কয়েকজন বাংলাদেশি নারী চীনা নাগরিকদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন।
চীনা নাগরিকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও ধারণ করে কোথায় প্রকাশ করেন, তা জানতে চাইলে রিতু আক্তার ফ্যাংইয়ো নামের এক চীনা নাগরিককে ডেকে আনেন। রিতু চীনা ভাষায় কথা বলে তাঁকে বোঝান যে এই প্রতিবেদক তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান। পরে ফ্যাংইয়োর মুঠোফোনে গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে কথোপকথন হয়।
ফ্যাংইয়ো প্রথম আলোকে জানান, পণ্যের প্রচারণার অংশ হিসেবে তাঁরা চীনা প্ল্যাটফর্ম উইচ্যাটে এসব লাইভ ভিডিও করেন। তবে কেন উত্তরার এই এলাকা বেছে নিয়েছেন এবং কেন প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও করেন, এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে চাননি তিনি। একপর্যায়ে রিতু আক্তারকে ধমক দিয়ে ডেকে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
রিতু আক্তার জানান, চীনা নাগরিকদের গাইড হিসেবে কাজ করে তিনি দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পান। চীনা নাগরিকেরা এসব ভিডিও উইচ্যাট, ডুয়িন (চীনা টিকটক)সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করে আয় করেন। তাঁর ভাষ্য, নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস এমন এলাকাগুলোর প্রতি চীনা নাগরিকদের আগ্রহ বেশি। এ কারণেই তাঁরা টেকপাড়ার মতো এলাকা বেছে নিয়েছেন।
ভিডিওতে বাংলাদেশকে দেখানো হচ্ছে ভারতের নয়াদিল্লি
চীনা নাগরিকেরা লাইভ ভিডিও করার সময় চীনা ভাষায় কথা বলেন। ফলে তাঁদের বক্তব্যের বিষয়বস্তু স্থানীয় মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় না। তবে ভিডিও দেখলে বোঝা যায়, তাঁরা আশপাশের পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাপন নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করছেন।
লাইভ ভিডিও ধারণের সময় কয়েকজন চীনা নাগরিকের বক্তব্য গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে অনুবাদ করে চীনা ভাষা জানা বাংলাদেশের চারজনের সাহায্যে যাচাই করা হয়। এতে দেখা যায়, উত্তরার বিভিন্ন এলাকা থেকে ভিডিও করলেও লাইভে নিজেদের অবস্থান ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি বলে দাবি করছেন তাঁরা। কেউ কেউ বাংলাদেশের মানুষকে দরিদ্র এবং নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বসবাসকারী হিসেবে উপস্থাপন করছেন। আবার কারও বক্তব্যে বাংলাদেশি পুরুষদের অর্থের অপব্যবহারের বিষয়টিও উঠে এসেছে। নারী চীনা নাগরিকদের কেউ কেউ নিজেদের ভারতের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলছেন, ভারতে বিয়ে হওয়ায় তাঁরা এখানে স্বামী-সংসার নিয়ে থাকেন।
গত ১ নভেম্বর উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের খালপাড়ে দাঁড়িয়ে টেকপাড়ার দৃশ্য দেখিয়ে লাইভ করছিলেন মিয়ানমিয়ান নামের এক চীনা নারী। নিজেকে চীনের সিচুয়ান প্রদেশের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দেন তিনি। লাইভে তাঁকে বলতে শোনা যায়, এটি ভারতের নয়াদিল্লি। এখানকার মানুষের ঘরবাড়ি খুবই নোংরা। টিনের ঘরে একটি ফ্যান পর্যন্ত নেই। এলাকাটি অনুন্নত, অপরিচ্ছন্ন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খারাপ। এ সময় তিনি সেখানকার মানুষের শৌচাগার ব্যবহারের ধরন নিয়েও বর্ণনা করেন।
টেকপাড়ায় একটি ছোট সেতুর দুই পাশে রয়েছে কয়েকটি চায়ের দোকান। এসব দোকানে ভিডিও ধারণ করছিলেন ওয়াং ওয়েই নামের আরেক চীনা নাগরিক। লাইভে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘এই যে তাঁরা চা পান করছেন, জানেন কি এটা কিসের চা? এটা হলো গোমূত্রের চা। তাঁরা গোমূত্রের চা খান।’ অন্য একটি দোকানের সামনে গিয়ে তিনি দাবি করেন, সেখানকার চা নদীর নোংরা পানি দিয়ে তৈরি করা হয়। এরপর এলাকার মানুষের জীবনযাপনকে ‘নোংরা’ বলে বর্ণনা করেন।
অবশ্য সব চীনা নাগরিকের বক্তব্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। লি ইয়াং নামের একজনকে উত্তরার বিভিন্ন ভবনে লাগানো শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) দেখিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করতে শোনা যায়। তিনি বলেন, এখানকার মানুষও এসি ব্যবহার করেন। অধিকাংশ এসি চীনের তৈরি। চীনা পণ্যের দাম কম হওয়ায় এখানকার মানুষ সেগুলো ব্যবহার করেন। এ সময় কোন ব্র্যান্ডের এসি, তা শনাক্ত করতে পারলে পুরস্কার দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
অনুমতি ছাড়াই ঘরে ঢুকে ভিডিও, বিব্রত বাসিন্দারা
উত্তরার বিভিন্ন অলিগলিতে মাসের পর মাস ধরে এভাবে ভিডিও করছেন চীনা নাগরিকেরা। একই এলাকায় একই দিনে একাধিকবার ভিডিও ধারণের ঘটনাও ঘটে। শুধু রাস্তাঘাট বা দোকানপাট নয়, আবাসিক এলাকাতেও ঢুকে ভিডিও করেন তাঁরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভিডিও করতে করতে মাঝেমধ্যে অনুমতি ছাড়াই মানুষের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েন কেউ কেউ।
স্থানীয় বাসিন্দা রোজিনা খাতুন বলেন, ‘তাঁরা মাঝেমধ্যে ঘরের মধ্যে ঢুকে ভিডিও শুরু করেন। বাসার মধ্যে সব সময় তো জামাকাপড় ঠিকঠাক থাকে না। হঠাৎ করে বাসায় ঢুকে ভিডিও করা শুরু করলে কেমন লাগে বলেন।’
আরেক বাসিন্দা পাপিয়া বেগম বলেন, ‘ভিডিও করতে করতে বাথরুমেও ঢুকে পড়ে অনেকে। তাদের কিছু বললেও বোঝে না। হাসে আর স্যরি বলে চলে যায়। সারা দিনই তাদের এমন টালবাহানা চলতে থাকে। কেউ কোনো ব্যবস্থাও নেয় না। তাদের কিছু বললে চলে যায়, আবার আসে।’
চীনা নাগরিকদের এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তি থাকলেও তাঁদের কার্যক্রম সম্পর্কে কার্যকর নজরদারি নেই পুলিশের। থানা-পুলিশের ভাষ্য, উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় চীনা নাগরিকদের এভাবে ভিডিও করতে দেখা যায়। তবে তাঁরা কেন ভিডিও করেন বা সেগুলো কোথায় প্রকাশ করেন, সে বিষয়ে পুলিশের কাছে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। বিষয়টি জানার চেষ্টা করলেও ভাষাগত জটিলতা এবং চীনা নাগরিকদের অনাগ্রহের কারণে তা সম্ভব হয় না।
উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ খালিদ মনসুর বলেন, ‘তারা কেন ভিডিও করে, সেটা আসলে আমি জানি না। ভিডিওগুলো কোথায় পাবলিশ করে, সেটাও জানি না। তবে তারা যে ভিডিও করে, সেটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছি। এটা নিয়ে কাজ চলছে।’



.png)
.png)