ইরানের নিরাপত্তাপ্রধানের সঙ্গে পুতিনের বৈঠক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হওয়ার মধ্যে মস্কোতে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ির সঙ্গে বৈঠক করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির একটি চিঠিও পুতিনের কাছে হস্তান্তর করেন রেজায়ি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠক শেষে রেজায়ি বলেন, পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসন’ বন্ধে রাশিয়ার সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পুতিনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।’
এ ছাড়া রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়া থেকে ইরান পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়টিও রয়েছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব রেজায়ি জানান, সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যত দ্রুত সম্ভব পুতিনের কাছে বার্তাটি পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। প্রায় এক মাস আগে তাঁর মস্কো সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে ওই অঞ্চলের সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিনের আলোচনার কারণে সফর পিছিয়ে যায়।
তবে খামেনির চিঠিতে কী বার্তা ছিল, সে বিষয়ে কিছু জানাননি রেজায়ি।
এর আগে বুধবার এক লিখিত বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতি স্বীকারের সামান্যতম প্রবণতাও থাকা উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, ইরানকে আরও শক্তিশালী হয়ে এমন অবস্থানে পৌঁছাতে হবে, যেখানে দেশটির সক্ষমতা হবে ‘চূড়ান্ত প্রতিরোধের’ নিশ্চয়তা।
যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সাত শর্ত
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নতুন করে হামলা শুরুর আশঙ্কার মধ্যে ইরানের যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে কাতার। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার পুতিনের সঙ্গে রেজায়ির বৈঠক হয়।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অনেকেই এ যুদ্ধকে মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী করছেন।
যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে কৌশলগত হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ অবস্থান, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং দেশটির পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে পুনরায় আলোচনা শুরু করা।
বৃহস্পতিবার রেজায়ি বলেন, ওয়াশিংটন ইরানের সাতটি দাবি পূরণ না করা পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করবে না তেহরান।
তিনি বলেন, ‘কূটনীতির বিষয়ে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাতটি শর্ত জানিয়েছি। তারা আমাদের সাতটি শর্ত বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত আমরা হরমুজ প্রণালি খুলব না, আলোচনাতেও বসব না।’
রেজায়ি জানান, যুদ্ধ বন্ধে সহযোগিতা করতে রাশিয়া প্রস্তুত বলে পুতিন আবারও আশ্বস্ত করেছেন। এর আগে গত মাসে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনালাপে পুতিন বলেছিলেন, যুদ্ধ বন্ধে সহায়তার জন্য রাশিয়া তার সাধ্যমতো সবকিছু করবে। রুশ সংবাদ সংস্থাগুলো এ তথ্য জানিয়েছিল।
রাশিয়া-ইরান গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের আলোচনা
ক্রেমলিনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রাশিয়া থেকে ইরানে গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান রেজায়ি। তাঁর ভাষ্য, এই পাইপলাইন নির্মিত হলে ইরানের গ্যাসসংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে রাশিয়ার গ্যাস বিক্রির সুযোগও তৈরি হবে।
রেজায়ি আরও জানান, অক্টোবরের শেষ দিকে তেহরানে ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের বিষয়েও পুতিনকে অবহিত করেছেন তিনি। রুশ প্রেসিডেন্ট ওই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
রেজায়ি বলেন, ‘আমাদের চীনা বন্ধুদের মতো আমরাও মনে করি, এ অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য আঞ্চলিক ব্যবস্থাপনা থাকা উচিত। নিরাপত্তার বিষয়ে বাইরের দেশগুলোর হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।’
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস জানিয়েছে, মস্কোর সিনেট প্রাসাদে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। তবে বৈঠক নিয়ে ক্রেমলিন তাৎক্ষণিকভাবে নিজস্ব কোনো বিবৃতি প্রকাশ করেনি।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কুয়েত, সৌদি আরব, ওমান, কাতার, তুরস্ক ও জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এসব আলোচনায় আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গুরুত্ব পেয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা রাশিয়া ও ইরান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশ বাণিজ্য, সামরিক সহযোগিতা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে।
ওই বছরের অক্টোবর থেকে চুক্তিটি কার্যকর হয়। তবে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার চুক্তির মতো এতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহায়তার কোনো ধারা নেই।
এদিকে গত শনিবার ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া জানান, রাশিয়ার কাছ থেকে এসইউ-৩৫ যুদ্ধবিমান কিনেছে ইরান। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এসব বিমান পাওয়ার আশা করছে তেহরান।
ইরানের সংবাদমাধ্যম তাবনাককে তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগেই যুদ্ধবিমানগুলো সরবরাহ করার কথা ছিল। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও পাইলটদের প্রশিক্ষণও সম্পন্ন হয়েছে।



.png)
.png)