ঢাকা,  বুধবার
০৪ নভেম্বর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবি, দায় কি ট্রাম্পের?

প্রকাশিত: ১৪:১০, ৪ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৪:১২, ৪ নভেম্বর ২০২৬

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবি, দায় কি ট্রাম্পের?

ডোনাল্ড ট্রাম্প

তিন দিনে চারটি নির্বাচনী সমাবেশ। যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। উদ্দেশ্য, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে ভোটারদের মাঠে নামানো। কিন্তু শেষ সমাবেশে ঘনিষ্ঠ এক সহযোগীকে এমন একটি প্রশ্ন করেন, যা বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁকে ভাবিয়ে তুলছিল—রিপাবলিকান পার্টির অবস্থা এতটা খারাপ হলো কীভাবে?

সময়টা ছিল অক্টোবরের মাঝামাঝি। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। এরই মধ্যে দেশজুড়ে কয়েক ডজন আসনে রিপাবলিকানদের জনসমর্থন দ্রুত কমছিল। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো প্রায় নিশ্চিত হয়ে উঠেছিল। এমনকি সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাসব্যাপী রাজনৈতিক উদ্ধার অভিযানে নামেন ট্রাম্প। অথচ মাত্র দুই বছর আগেও এসব কট্টর রিপাবলিকান-সমর্থিত আসনে সহজেই জয় পেয়েছিলেন তিনি।

ব্যক্তিগত ওই কথোপকথন সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি জানান, প্রচুর ভ্রমণের ধকলের মধ্যেও ট্রাম্প বারবার একই প্রশ্ন করছিলেন—পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাল কীভাবে? তাঁর এই বিলম্বিত উপলব্ধি রিপাবলিকান পার্টির সংকটের গভীরতাই তুলে ধরে। অথচ তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও দলীয় নেতারা কয়েক মাস ধরেই পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছিলেন।

শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে রিপাবলিকানরা। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারায় দলটি। এমনকি দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল ঘাঁটি হিসেবেও পরিচিত বেশ কয়েকটি এলাকায় বড় ব্যবধানে জয় পায় ডেমোক্র্যাটরা। এর ফলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্ষমতার শেষ দুই বছর তাঁকে ডেমোক্র্যাটদের তদন্ত, বিরোধিতা ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।

ট্রাম্পের এক ডজনের বেশি সহযোগী, উপদেষ্টা, দলীয় কর্মকর্তা ও নির্বাচনী প্রচারকর্মীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জানা গেছে, গত এক বছরে বেশ কয়েকটি কৌশলগত ভুল এবং প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত রিপাবলিকানদের পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। অতিরিক্ত আশাবাদী নির্বাচনী পরিকল্পনা, বারবার অবস্থান পরিবর্তন এবং দুর্বল প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার মতো বিষয়গুলো দলটির সংকট বাড়িয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁদের অনেকেরই মূল্যায়ন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে দলটি নিজেদের আলাদা করতে পারেনি।

যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতিতে জনপ্রিয়তায় ধস

রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের অন্যতম বড় কারণ হয়ে ওঠে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ। কোনো সুস্পষ্ট সমাপ্তির কৌশল ছাড়াই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে এ সংঘাতে জড়িয়ে ফেলেন। যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রেও পেট্রল ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ আরও তীব্র হয়।

প্রথমদিকে ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা যুদ্ধের প্রভাব খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেন। তাঁদের দাবি ছিল, যুদ্ধ প্রায় জিতে গেছে এবং চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে। কিন্তু বাস্তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়। মার্কিন সেনাসদস্যদের প্রাণহানি এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা মনে করেন, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে কয়েক মাস ধরে তৈরি করা পরিকল্পনাকে কার্যত অকার্যকর করে দেয়। তাঁর আশঙ্কা ছিল, তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারে পৌঁছালে এর রাজনৈতিক প্রভাব সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালন ৪ ডলার ছাড়িয়ে যায়। মুদি পণ্যের দামও বাড়তে থাকে। অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন ট্রাম্প। ফলে ভোটারদের মধ্যে তাঁর প্রতি অসন্তোষ বাড়তে থাকে।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গেও যুদ্ধের সিদ্ধান্তের বিরোধ তৈরি হয়। তিনি এতদিন নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি সংঘাত থেকে দূরে রাখবেন এবং দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করবেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধ সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।

নির্বাচনী কৌশলে ভুল, বিভক্ত রিপাবলিকানরা

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সাফল্য নিয়ে শুরুতে যথেষ্ট আশাবাদী ছিলেন দলীয় নেতারা। ট্রাম্পের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা মাগা ভোটার জোট এবং তাঁর প্রশাসনের বড় করছাড় ও সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত প্যাকেজকে নির্বাচনী সাফল্যের ভিত্তি হিসেবে দেখেছিলেন তাঁরা। পাশাপাশি কংগ্রেসের আসনসীমানা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগের মাধ্যমে রিপাবলিকানদের অনুকূলে আসন বাড়ানোর পরিকল্পনাও ছিল।

দলীয় নেতাদের পরিকল্পনা ছিল, অর্থনৈতিক সাফল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ এবং ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় সামনে রেখে প্রচার চালানো হবে। কিন্তু যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির কারণে সেই বার্তা গুরুত্ব হারায়।

একপর্যায়ে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ও তাঁদের উপদেষ্টারা ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব তৈরির বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। কেউ তাঁর শুল্কনীতির সমালোচনা করেন, কেউবা যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে অধিকাংশ নেতা প্রকাশ্যে ট্রাম্পের বিরোধিতা করতে চাননি। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, এতে মাগা সমর্থকদের সমর্থন হারাতে পারেন। আবার ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অসন্তোষের শিকার হওয়ার ভয়ও ছিল তাঁদের।

দলটির সংকট আরও বাড়ে সিনেট নির্বাচনে ট্রাম্পের পছন্দের কয়েকজন প্রার্থীর দুর্বল অবস্থানের কারণে। টেক্সাস, নর্থ ক্যারোলাইনা ও সাউথ ক্যারোলাইনায় প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে দলের ভেতরেই প্রশ্ন ওঠে। কয়েকটি ঐতিহ্যগতভাবে নিরাপদ আসনেও রিপাবলিকান প্রার্থীরা প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল অবস্থানে পড়ে যান।

প্রচারের শেষ মুহূর্তে মরিয়া ট্রাম্প

নির্বাচনের আগে অভ্যন্তরীণ জনমত জরিপে রিপাবলিকানদের পিছিয়ে থাকার তথ্য পেয়ে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ট্রাম্প। পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্বাচনের শেষ মাসে দেশজুড়ে প্রচার সমাবেশের বিশেষ সূচি তৈরি করেন তাঁর দল। প্রায় প্রতিদিনই ভিন্ন ভিন্ন শহরে গিয়ে সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মিশিগানের এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ভোটারদের এমনভাবে ভাবতে হবে যেন তিনিই ব্যালটে রয়েছেন। কারণ, তাঁর নাম ব্যালটে না থাকলে অনেক সমর্থক ভোট দিতে আসেন না।

তবে ট্রাম্পের এসব সমাবেশে কখনো অসংলগ্ন বক্তব্য, কখনো অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্যও সামনে আসে। ওহাইওতে একাধিক সফরে রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেডের শারীরিক গঠন নিয়ে বারবার মন্তব্য করেন তিনি। অন্যদিকে, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগকেও একপর্যায়ে ‘প্রতারণা’ বলে উড়িয়ে দেন।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা মনে করেছিলেন, তাঁর সমাবেশগুলো নিষ্ক্রিয় রিপাবলিকান ভোটারদের আবারও উৎসাহিত করবে। কিন্তু যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে মানুষের অসন্তোষ দূর করতে এসব প্রচার কার্যকর হয়নি।

নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের প্রচার কৌশল নিয়েও মতবিরোধ ছিল। দলের একাংশ স্থানীয় ইস্যুতে প্রচার সীমাবদ্ধ রেখে ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনায় গুরুত্ব দিতে চেয়েছিল। অন্য অংশের ধারণা ছিল, নির্বাচনী প্রচারকে ট্রাম্পকেন্দ্রিক করেই সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে আনতে হবে। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প নিজেই প্রচারের নিয়ন্ত্রণ নেন।

নির্বাচনের আগের শেষ ভাষণেও ট্রাম্পের বক্তব্যে নির্বাচনী ইস্যুর চেয়ে ওয়াশিংটনের নির্মাণ প্রকল্প, লিংকন মেমোরিয়ালের জলাধার সংস্কার ও বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজের প্রসঙ্গ বেশি গুরুত্ব পায়। রিপাবলিকান নেতাদের কাছে এটি ছিল বিস্ময়কর। তাঁদের মতে, নির্বাচনী বিপর্যয়ের পেছনে এসব বক্তব্য একমাত্র কারণ না হলেও দলটি যে ভোটারদের প্রকৃত উদ্বেগ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, তা স্পষ্ট।

সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্বল প্রার্থী নির্বাচন এবং নির্বাচনী কৌশলের ভুল—সবকিছু মিলিয়েই রিপাবলিকানদের বিপর্যয় ঘটে। তবে দলটির ভেতরে অনেকেরই ধারণা, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক অবস্থানই শেষ পর্যন্ত এই পরাজয়ের সবচেয়ে বড় অনুঘটক হয়ে উঠেছে।

Advertisement
Advertisement

আরো পড়ুন