৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি সফটওয়্যার, ব্যবহারকারীর সাড়া সামান্য
তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার সহজ করতে ১০ বছরে ১২টি সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি উপকরণ তৈরি করেছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। এতে এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। ছবি থেকে লেখা সংগ্রহ, অডিও থেকে লেখা তৈরি, বানান ও ব্যাকরণ সংশোধন এবং অনুবাদের মতো সেবা রয়েছে এসব সফটওয়্যারে। তবে এত অর্থ ও সময় ব্যয়ের পরও অধিকাংশ সেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। কোনো কোনো সেবার ব্যবহারও খুবই সীমিত।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ‘কাগজডটএআই’ নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন করেন। এর অন্যতম সেবা ওসিআর, যার মাধ্যমে ছবি বা নথি থেকে লেখা সংগ্রহ করে ওয়ার্ড ফাইলে রূপান্তর করা যায়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে বাংলা ভাষাকে উন্মুক্ত ও সমৃদ্ধ করতে চান তাঁরা।
তবে বাস্তবে এ সেবার ব্যবহার সীমিত। অথচ স্মার্টফোনে থাকা গুগল লেন্সসহ বিভিন্ন বিনা মূল্যের অ্যাপের মাধ্যমেও সহজেই একই কাজ করা যায়। এসব প্রযুক্তি কাগজডটএআই চালুর অনেক আগে থেকেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
শুধু ওসিআর নয়, অডিও থেকে লেখা তৈরি, বানান ও ব্যাকরণ সংশোধন এবং অনুবাদের মতো ১২টি সফটওয়্যার তৈরি করতে আইসিটি বিভাগ ব্যয় করেছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয় ২০১৬ সালে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ১৫৮ কোটি টাকা। তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে সর্বশেষ গত আগস্টে তা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নতুন সরকারের দায়িত্ব ছিল আগের সরকারের নেওয়া আইসিটি প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দেওয়া এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা। কিন্তু এই প্রকল্পের মেয়াদ আবারও বাড়ানো হয়েছে।
প্রকল্পটি সম্পর্কে জানতে চাইলে আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু টুল তৈরি হলেও সব কটির কাজ যে অর্থবহ হয়েছে, তা বলা যাবে না। মানুষের কাছে সেবাগুলো যেভাবে পৌঁছানোর কথা ছিল, সেভাবে পৌঁছায়নি। এগুলোকে একটি প্ল্যাটফর্মে এনে আরও ব্যবহারবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সচিব আরও জানান, আইসিটি খাতের চলমান প্রকল্পগুলো বন্ধ করা হয়নি। বরং কোন প্রকল্প চালু রাখা প্রয়োজন এবং কোনটির কতটুকু যৌক্তিকতা রয়েছে, তা যাচাই করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ১০ থেকে ১২টি প্রকল্পের পরিধি পুনর্মূল্যায়ন করে অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পটির ব্যয় কমানো হয়নি।
ব্যয় ৮০ কোটি, ব্যবহার কতটা
প্রকল্পের আওতায় ১৬টি সফটওয়্যার, টুল ও প্রযুক্তি উপকরণ তৈরির পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, ১০ বছরে ১২টির কাজ শেষ হয়েছে। তবে সব কটির সেবা সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি চালু বা সহজলভ্য হয়নি।
প্রকল্পের ওয়েবসাইট বাংলাডটগভডটবিডিতে বাংলা ভাষাভিত্তিক বিভিন্ন সফটওয়্যার ও সেবা রাখা হয়েছে। সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য দিতে রয়েছে ‘জিজ্ঞাসা’ নামের এআই সহকারী। এ ছাড়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্ক্রিন রিডার, ইশারাভাষা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, ব্রেইল কনভার্টার, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার তথ্যভান্ডার, বাংলা ফন্ট ও কিবোর্ড তৈরির কাজও হয়েছে।
প্রকল্প সূত্রের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সফটওয়্যার উন্নয়ন, হোস্টিং ও সংরক্ষণে খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ ব্যয় হয়েছে অফিস সাজসজ্জা, সভা-সেমিনার, প্রচার ও পরিচালন কার্যক্রমে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, এসব প্রযুক্তি তৈরিতে কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং প্রকৃত ব্যয় কত, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রকল্পের বিভিন্ন সেবার ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্যেও দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার এআই চ্যাটবট ‘জিজ্ঞাসা’র পরীক্ষামূলক সংস্করণে দিনে গড়ে ১১০টি অনুরোধ আসে। ফন্ট রূপান্তরের সেবায় ৩৫ দিনে ফাইল রূপান্তর হয়েছে মাত্র ২৭৫টি। বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবায় দিনে গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ অনুরোধ আসে। আর কাগজডটএআইয়ের ওসিআর সেবায় দৈনিক অনুরোধের সংখ্যা প্রায় ৫০।
প্রথম আলো গত এক মাসে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্পের কয়েকটি টুল ব্যবহার করে দেখেছে। এতে বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবাটি ভালো ফল দিয়েছে। তবে অডিও থেকে লেখা তৈরির ক্ষেত্রে বড় ফাইল ব্যবহারে সমস্যা হয়েছে। অন্যদিকে এআই চ্যাটবট ‘জিজ্ঞাসা’ সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও জটিল প্রশ্নে কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে।
প্রকল্প কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বর্তমানে যে জিপিইউ সক্ষমতা রয়েছে, তা দিয়ে একসঙ্গে সীমিতসংখ্যক ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। জিপিইউ বা গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট হলো কম্পিউটারের বিশেষায়িত প্রসেসর, যা এআই মডেল চালানো ও বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহৃত হয়।
কর্মকর্তাদের দাবি, বিদ্যমান সক্ষমতায় একসঙ্গে পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। তবে চাহিদা বেড়ে গেলে ব্যবহারকারীদের অপেক্ষা করতে হয়। সাধারণ মানুষের জন্য সেবাগুলো ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত করতে অতিরিক্ত জিপিইউ ও অবকাঠামো প্রয়োজন।
এখানেই বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রায় ১৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রকল্পে তৈরি প্রযুক্তি যদি প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে সাধারণ মানুষের ব্যবহারোপযোগী না হয়, তাহলে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এগুলো সচল রাখার দায়িত্ব নেবে কে?
প্রকল্প পরিচালক মাহবুব করিম প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে প্রযুক্তি ও তথ্যভান্ডার বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী জিপিইউ কেনা ও সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
আগের প্রকল্পের অভিজ্ঞতা
অতীত অভিজ্ঞতাও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশন তৈরির জন্য ৩৩০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। ওই প্রকল্পের আওতায় তৈরি বেশির ভাগ গেম ও অ্যাপ কার্যকরভাবে কাজে আসেনি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, নিজেদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কাজ দেওয়ার উদ্দেশ্যে এসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পের মোট অর্থের ১৭ শতাংশের বেশি শেখ পরিবারের নামে সিনেমা ও গেম তৈরিতে ব্যয় হয়েছিল।
তবে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ভিন্ন বলে দাবি করছেন এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, এই প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু সফটওয়্যার তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাপ্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় আট হাজার কপিরাইটমুক্ত বই ডিজিটাল করা হয়েছে। বাংলা কথাকে লেখায় রূপান্তরের জন্য ১০ হাজার ঘণ্টা এবং লেখা থেকে কণ্ঠ তৈরির জন্য এক হাজার ঘণ্টার অডিও উপাত্ত তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার ১২ হাজার মিনিটের বেশি অডিও এবং ইশারাভাষার ৪২ হাজার ৮০০টি ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সফটওয়্যার তৈরি বা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের হিসাব দিয়ে এ ধরনের প্রকল্পের সাফল্য বিচার করা যায় না। প্রযুক্তিগুলো কতটা কার্যকর, সাধারণ মানুষ কতটা ব্যবহার করছে এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সেগুলো কত দিন সচল থাকবে, সেটিই মূল বিবেচ্য।
আইসিটি খাতে ১৯ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার নামে আইসিটি খাতে ২১টি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। আইসিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
প্রকল্পগুলো মূল্যায়নের জন্য ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কয়েকটি প্রকল্পে এমন কার্যক্রম রাখা হয়েছিল, যার সঙ্গে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের মিল নেই। আবার কিছু কাজ ছিল, যা আইসিটি বিভাগের আওতাভুক্ত নয়। অপ্রয়োজনীয় খাত বাদ দেওয়া হলে প্রায় ৬ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অ্যাপ তৈরি, ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ, আইসিটি অবকাঠামো, আইটি পার্ক ও ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপনের নামে নেওয়া এসব প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বড় অংশ ছিল তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলকের বিরুদ্ধে। তিনি বর্তমানে কারাগারে থাকলেও প্রকল্পগুলোর সঙ্গে যুক্ত অনেকের জবাবদিহি এখনো নিশ্চিত হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আইসিটি খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। অতীতের কর্মপদ্ধতি ও প্রকল্পের ফলাফল যাচাই না করে শুধু মেয়াদ বাড়িয়ে যাওয়ার অর্থ হলো পুরোনো কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া।



.png)
.png)