মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে আবারও বেড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঝুঁকি বাড়ায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বেলা ১১টার দিকে অয়েল প্রাইস ডটকমের তথ্যানুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ০৬ ডলার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ৩০ ডলারে উঠেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ১ দশমিক ৫১ ডলার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৯ দশমিক ৭৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে বুধবার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) কৌশলগত মজুত থেকে দ্রুত তেল ছাড়ার কার্যক্রমে গতি আনার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও দামে চাপ তৈরি হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ডিজেল সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। ঘোষণার পর বুধবার তেলের দাম কিছুটা কমেছিল।
তবে এক দিনের ব্যবধানেই বাজারে আবার সরবরাহ–ঝুঁকি সামনে এসেছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত অষ্টম মাসে প্রবেশ করার পর অক্টোবর মাসে এই পথে জাহাজে হামলার ঘটনাও বেড়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজে হামলা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো তেল রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করলেও হামলার আশঙ্কায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে জাহাজ, পণ্য ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ হামলায় কাতারের উত্তরে একটি তেলবাহী জাহাজে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) বুধবার জানায়, ওই হামলায় প্রাণহানি ঘটেছে এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
এএনজেড ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ পণ্যবাজার কৌশলবিদ ড্যানিয়েল হাইনস বলেন, অতীতে এ ধরনের হামলার পর পারস্য উপসাগর থেকে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ার নজির রয়েছে। তবে এবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পাঠানোর বিকল্প পথ সীমিত থাকায় উৎপাদক দেশগুলো জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েই রপ্তানি চালিয়ে যেতে চাইছে।
আইইএর তেল ছাড়ার সিদ্ধান্তেও বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি ফেরেনি। হাইনসের মতে, আইইএর নতুন পরিকল্পনায় যে তেল ছাড়ার কথা বলা হচ্ছে, তা মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর সময় ঘোষিত ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার মূল পরিকল্পনারই অংশ হতে পারে। ফলে এটি কৌশলগত মজুত থেকে অতিরিক্ত নতুন তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে।
হাইনস আরও বলেন, কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার মাধ্যমে সাময়িকভাবে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হলেও এতে নতুন করে উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয় না।
এদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক ও ভোক্তা যুক্তরাষ্ট্রের মজুতের তথ্যও তেলের দাম বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। ২ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত ৩২ লাখ ব্যারেল কমে ৪২ কোটি ৪১ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকেরা এর আগে মজুত ১৭ লাখ ব্যারেল কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
ডিজেল ও জেট ফুয়েলসহ ডিস্টিলেট জ্বালানির মজুতও ৪২ হাজার ব্যারেল কমে ১০ কোটি ৫১ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। বছরের এই সময়ের পাঁচ বছরের গড় মজুতের তুলনায় এই পরিমাণও বেশ কম। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহঝুঁকির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কমে যাওয়া মজুতও বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।



.png)
.png)