শ্রমিক অসন্তোষে পোশাকশিল্পে বড় ক্ষতির শঙ্কা, ঝুঁকিতে ক্রয়াদেশ ও কর্মসংস্থান
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির পরিমাণ শুধু উৎপাদন বন্ধ বা তাৎক্ষণিক রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজার হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে। যার প্রভাব পড়তে পারে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়বেন তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক।
গত ২৯ অক্টোবর থেকে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হয়। মাঝখানে এক দিন বিরতি থাকলেও মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জের বহু কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। কোথাও কোথাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার পোশাকশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তবে বোর্ড গঠনের পরও অসন্তোষ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৬৭৯ থেকে ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এসব কারখানায় কাজ করেন প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার থেকে ১৭ লাখ শ্রমিক। এর আগের দিন রোববার বন্ধ ছিল ৫২৯টি কারখানা, যেখানে কর্মরত প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক। মঙ্গলবার বেলা তিনটা পর্যন্ত বন্ধ কারখানার সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩০৬টিতে। এসব কারখানায় কাজ করেন সাত লাখের বেশি শ্রমিক।
শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে রপ্তানি কার্যক্রমেও। গত রোববার ও সোমবার দুই দিনে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৭ কোটি ডলারের রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সোমবার এক দিনেই ব্যাহত হয় প্রায় ৪ কোটি ডলারের রপ্তানি। আগের দিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরও ৩ কোটি ডলারের রপ্তানি কার্যক্রম।
উৎপাদন বন্ধ, বাড়ছে উদ্যোক্তাদের ব্যয়
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কারখানা বন্ধ থাকলেও পরিচালন ব্যয় বন্ধ থাকে না। শ্রমিকদের বেতন, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যন্ত্রপাতির পেছনে নিয়মিত ব্যয় বহন করতে হয়। উৎপাদন বন্ধ থাকলে এসব ব্যয় প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। পরে উৎপাদন ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত সময় কাজ করাতে হলে ওভারটাইম বাবদ ব্যয়ও বাড়ে।
অন্যদিকে, নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ সম্ভব না হলে ক্রেতার কাছে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হতে পারে। সমুদ্রপথের তুলনায় আকাশপথে পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেশি। এতে একই পণ্য রপ্তানি করেও উদ্যোক্তাদের মুনাফা কমে যেতে পারে, এমনকি লোকসানও হতে পারে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল ঢাকা পোস্টকে বলেন, এ পরিস্থিতিতে ক্ষতি মূলত দুই ধরনের। একটি আর্থিক, যা সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো হিসাব করতে পারবে। অন্যটি হলো আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও ক্রেতাদের আস্থার ক্ষতি, যা অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা কঠিন।
তিনি বলেন, রপ্তানিতে বিলম্বের কারণে ভবিষ্যতে যে ক্ষতি হতে পারে, তা তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয়। সামান্য বিলম্বেও অনেক সময় এয়ার শিপমেন্ট বাতিল হয়ে যায়। এখন পোশাকশিল্পের পিক সিজন চলছে। শীত মৌসুমের শেষ দিকের পণ্য রপ্তানির সময় হওয়ায় অনেক কারখানা পণ্য প্রস্তুত করেও সময়মতো জাহাজীকরণ করতে পারছে না। এতে মূল্যছাড় দেওয়া কিংবা ক্রয়াদেশ বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বিশ্ব অর্থনীতি এমনিতেই ধীরগতির। জ্বালানি ও গ্যাস সংকটসহ নানা সমস্যায় রয়েছে বিভিন্ন দেশ। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে সংকট তৈরি না করে ধৈর্য ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তাই সংশ্লিষ্ট সবার উচিত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে এগোনো।
অন্য দেশে চলে যেতে পারে ক্রয়াদেশ
শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের উদ্বেগও সামনে এসেছে। বাংলাদেশের একটি বড় সুইডিশ ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আগামী দুই মাসের জন্য ক্রয়াদেশ কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটি তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ থেকে পোশাক সংগ্রহ করছে।
ফ্যাব্রিকা নিট কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, পণ্য সরবরাহের সময় বাড়ানোর অনুরোধ করায় একজন ক্রেতা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কিছু ক্রয়াদেশ ভারত ও পাকিস্তানসহ অন্য দেশে চলে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এক দিনের উৎপাদন বন্ধ থাকলেও মোট রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ক্রেতারা সময়মতো পণ্য পাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন। দীর্ঘ মেয়াদে এতে তাঁদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজিএমইএর পরিচালক মো. হাসিব উদ্দিনের মতে, পোশাকশিল্প থেকে বছরে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় আসে। বছরে প্রায় ৩৪০ দিন কারখানা চালু থাকে। এক দিনের পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন বন্ধ থাকলে পরিচালন ও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি ডলার হতে পারে।
ঝুঁকিতে কর্মসংস্থান ও সহযোগী শিল্প
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কোনো দেশের সঙ্গে ব্যবসার ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন খরচ বিবেচনা করেন না। সময়মতো পণ্য সরবরাহ, কারখানার নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতাও তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বারবার উৎপাদন বন্ধ হলে ক্রেতারা বিকল্প দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন। একবার ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও তা ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।
এতে শুধু পোশাক কারখানা নয়, সুতা, কাপড়, বোতাম, জিপার, প্যাকেজিং ও পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট সহযোগী শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্রয়াদেশ কমে গেলে কারখানাগুলো উৎপাদন সক্ষমতা কমাতে পারে। এতে শ্রমিক ছাঁটাই, কর্মঘণ্টা হ্রাস কিংবা কারখানা বন্ধের ঝুঁকি তৈরি হবে। পাশাপাশি কমবে বৈদেশিক মুদ্রা আয়।
সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার ঢাকা পোস্টকে বলেন, অস্থিরতা চলতে থাকলে বিদেশি ক্রেতারা পোশাকের ক্রয়াদেশ অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন। বিশেষ করে ভারত এ ক্ষেত্রে সুবিধা পেতে পারে।
শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন শ্রমিকদেরও নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে কাজে ফিরে যাওয়া উচিত। ন্যায্য পাওনা আদায়ে আন্দোলনের প্রয়োজন থাকলেও বর্তমান আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদেরই ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের কারও প্ররোচনায় না পড়ার আহ্বান জানান তিনি।
সব মিলিয়ে, পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা শুধু মালিক বা শ্রমিকের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের রপ্তানি আয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং লাখো মানুষের জীবিকা। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও শিল্পের স্থিতিশীলতা—দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।



.png)
.png)