তাহসিফ
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে তাঁর শেষ সময়ের চলাফেরা শনাক্তের চেষ্টা করছে নৌ পুলিশ। এ জন্য অন্তত আটটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরার বাসা থেকে টঙ্গীর মাজারবস্তি পর্যন্ত তাঁর যাতায়াতের পথ এবং ওই সময়ে কারা তাঁর সঙ্গে ছিলেন, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। গত সপ্তাহে তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন বলেন, উত্তরার বাসা থেকে টঙ্গীর মাজারবস্তি পর্যন্ত তাহসিফের চলাচলের পথ শনাক্তের পাশাপাশি ওই সময়ে কারা তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন বা তাঁকে সঙ্গ দিয়েছেন, তা জানতে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে মাজারবস্তিতে প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থানকালে কী ঘটেছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
এ ঘটনায় তাহসিফের ‘জুনিয়র বন্ধু’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ এবং ওই রাতে তাঁদের সঙ্গে থাকা আরেক বন্ধু জেরিকা তাসনিম দিশাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তদন্ত কর্মকর্তা ফিরোজ উদ্দিন জানান, গ্রেপ্তার দুজনের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই রাতে একটি বারে তাঁরা কী করেছিলেন, কী খেয়েছিলেন এবং পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নিয়েছিলেন, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে উত্তরার সেক্টর ১৮-এর বাসা থেকে মোটরসাইকেলে বের হন তাহসিফ। এ সময় আলাদা মোটরসাইকেলে তাঁর সঙ্গে ছিলেন দীপ।
সন্ধ্যা ৬টা ৩২ মিনিট থেকে রাত সোয়া ১০টার মধ্যে তাঁদের উত্তরার একটি মোটরসাইকেলের গ্যারেজ ও একটি রেস্তোরাঁয় দেখা যায়। রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তাঁরা উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের একটি বারে প্রবেশ করেন। সেখানে পরে যোগ দেন দিশা। রাত ১১টা ৫২ মিনিটে তিনজন একসঙ্গে বার থেকে বের হন।
ফুটেজে দেখা যায়, প্রথমে দিশাকে রিকশায় তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন তাঁরা। পরে তাহসিফ তাঁকে নিজের মোটরসাইকেলে নিয়ে যান। মধ্যরাতের কিছু পর দীপ ও তাহসিফ টঙ্গীর মাজারবস্তিতে প্রবেশ করেন।
রাত ২টার দিকে দীপকে একা মোটরসাইকেল চালিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। তবে তাহসিফের মোটরসাইকেল নিয়ে অন্য কাউকে বের হতে দেখা গেছে—এমন কোনো ফুটেজ এখনো পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত ২৯ অক্টোবর রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরদিন গভীর রাতে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এরপর দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে আদালত তাঁকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠান।
তদন্তকারীরা জানান, ওই রাতের ঘটনা সম্পর্কে দীপ একাধিকবার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। প্রথমে তিনি দাবি করেন, তাহসিফকে তাঁর বাসার কাছাকাছি নামিয়ে দিয়ে চলে যান। পরে আরেক বক্তব্যে বলেন, ইউনিফর্ম পরা কয়েকজন ব্যক্তি ধাওয়া করায় তিনি পালিয়ে যান। এ সময় তাহসিফ নদীর দিকে দৌড়ে গিয়ে পানিতে ঝাঁপ দেন বলে দাবি করেন দীপ।
গত রোববার ভোরে ঢাকার কাফরুল এলাকার বাসা থেকে দিশাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে দীপের বক্তব্য মিলিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। দুজনকে মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদেরও পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। সুরতহাল প্রতিবেদনে তাঁর শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর পকেট থেকে একটি আইফোন ও এক প্যাকেট সিগারেট উদ্ধার করা হয়।
তদন্তকারীরা এখন ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন। এসব প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তাঁরা।



.png)
.png)