ত্বক কলো হয়ে যাওয়া
ত্বকের রং পরিবর্তন অনেক সময় স্বাভাবিক কারণেও হতে পারে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ত্বক অস্বাভাবিকভাবে কালো বা গাঢ় হয়ে যাওয়া শরীরের ভেতরে থাকা জটিল কোনো রোগের প্রাথমিক সংকেত হতে পারে। বিশেষ করে ত্বকের পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্বলতা, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, মাথা ঘোরা, মাসিকের সমস্যা কিংবা রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
অ্যাডিসন রোগ
ত্বক অস্বাভাবিকভাবে কালো হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে অ্যাডিসন রোগ বা অ্যাড্রেনাল ইনসাফিসিয়েন্সি। কিডনির ওপর অবস্থিত অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি থেকে কর্টিসলসহ শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হরমোন তৈরি হয়। এই গ্রন্থি পর্যাপ্ত কর্টিসল উৎপাদন করতে না পারলে অ্যাডিসন রোগের বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
এ রোগে ত্বকের রং ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে হাতের তালুর ভাঁজ, আঙুলের গাঁট, কনুই ও হাঁটু, পুরোনো ক্ষত বা দাগের স্থান, ঠোঁট, মুখের ভেতর ও মাড়িতে কালচে ভাব বেশি দেখা যেতে পারে।
এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, ক্ষুধামান্দ্য, ওজন কমে যাওয়া, বমি বা পেটের সমস্যা, দাঁড়ালে মাথা ঘোরা এবং নিম্ন রক্তচাপের মতো উপসর্গও থাকতে পারে।
কর্টিসল কমে গেলে শরীর বেশি পরিমাণে এসিটিএইচ হরমোন তৈরি করতে পারে। এর প্রভাবে মেলানিনের উৎপাদন বেড়ে গিয়ে ত্বকের রং আরও গাঢ় হয়ে যেতে পারে।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও অ্যাকানথোসিস নাইগ্রিকানস
ঘাড়, বগল, কুঁচকি কিংবা শরীরের অন্যান্য ভাঁজে ত্বক কালচে, মোটা ও মখমলের মতো হয়ে গেলে তাকে অ্যাকানথোসিস নাইগ্রিকানস বলা হয়। এতে পুরো শরীরের রং কালো হয়ে যায় না; বরং নির্দিষ্ট জায়গায় ত্বকের এমন পরিবর্তন দেখা যায়।
এর অন্যতম প্রধান কারণ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। এ অবস্থায় শরীরে ইনসুলিন থাকলেও তা ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে শরীর অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করে এবং এর প্রভাবে ত্বকের কোষের বৃদ্ধি ও রঞ্জনে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, প্রি-ডায়াবেটিস, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএসে এ ধরনের ত্বকের পরিবর্তন বেশি দেখা যেতে পারে। কিছু অন্যান্য হরমোনজনিত সমস্যাতেও এটি হতে পারে।
বিশেষ করে অল্প বয়সে ঘাড় হঠাৎ কালো হতে শুরু করলে শুধু প্রসাধনী ব্যবহার না করে রক্তে শর্করা ও বিপাকীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
পিসিওএসে কি ঘাড় কালো হয়?
প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে পিসিওএস একটি পরিচিত হরমোন ও বিপাকীয় সমস্যা। এ রোগে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকতে পারে। ফলে ঘাড়, বগল ও শরীরের বিভিন্ন ভাঁজে অ্যাকানথোসিস নাইগ্রিকানস দেখা দিতে পারে।
তবে ঘাড় কালো হলেই পিসিওএস হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। অনিয়মিত মাসিক, অতিরিক্ত লোম গজানো, ব্রণ, ওজন বৃদ্ধি এবং অন্যান্য উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা উচিত।
কুশিং সিনড্রোম
শরীরে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত কর্টিসল থাকলে কুশিং সিনড্রোম হতে পারে। এ রোগে মুখ গোল হয়ে যাওয়া, পেটের দিকে অতিরিক্ত চর্বি জমা, হাত-পা তুলনামূলক সরু হয়ে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, পেশির দুর্বলতা এবং ত্বকে বেগুনি বা লালচে দাগের মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে অতিরিক্ত এসিটিএইচের সঙ্গে সম্পর্কিত কুশিং সিনড্রোমে ত্বকের রংও গাঢ় হতে পারে। আবার দীর্ঘদিন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করলেও শরীরে গুরুত্বপূর্ণ হরমোনগত পরিবর্তন ঘটতে পারে।
থাইরয়েড ও অন্যান্য রোগ
কিছু থাইরয়েড রোগসহ বিভিন্ন হরমোন ও বিপাকীয় সমস্যায় ত্বকের রং, আর্দ্রতা ও গঠনে পরিবর্তন আসতে পারে। এ ছাড়া ভিটামিনের ঘাটতি, দীর্ঘস্থায়ী লিভার বা কিডনি রোগ, কিছু ওষুধ এবং অন্যান্য অসুস্থতার কারণেও ত্বক গাঢ় হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
ত্বকের রং পরিবর্তনের সঙ্গে নিচের যেকোনো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
- অস্বাভাবিক দুর্বলতা
- দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
- ক্ষুধামান্দ্য বা বারবার বমি
- নিম্ন রক্তচাপ বা দাঁড়ালে মাথা ঘোরা
- ঘাড় বা বগল হঠাৎ বেশি কালো ও মোটা হয়ে যাওয়া
- অতিরিক্ত তৃষ্ণা বা বারবার প্রস্রাব
- মাসিক অনিয়মিত হওয়া
- অতিরিক্ত লোম গজানো বা ব্রণ
- দীর্ঘদিন স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধ ব্যবহার
- মুখের ভেতর বা পুরোনো ক্ষতের স্থানে অস্বাভাবিক কালচে রং
চিকিৎসা কী?
ত্বকের রং পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর কারণ নির্ণয় করা। শুধু ত্বক ফর্সা করার ক্রিম ব্যবহার করে সমস্যার মূল কারণ দূর করা সম্ভব নয়।
অ্যাডিসন রোগ হলে প্রয়োজন অনুযায়ী হরমোন প্রতিস্থাপন চিকিৎসা দেওয়া হয়। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকলে ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিস থাকলে যথাযথ চিকিৎসা নিতে হয়। পিসিওএস বা অন্যান্য হরমোনজনিত সমস্যা থাকলে রোগের কারণ ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা প্রয়োজন।
ত্বকের রঙের পরিবর্তন তাই সবসময় শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়। কখনো কখনো এটি শরীরের ভেতরে চলতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরিবর্তনের সংকেত হতে পারে। তাই অস্বাভাবিক বা নতুন ধরনের ত্বকের পরিবর্তন দেখা দিলে, বিশেষ করে এর সঙ্গে অন্য উপসর্গ থাকলে, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।



.png)
.png)