চা
অনেকের কাছে এক কাপ গরম চা ছাড়া রাতের খাবার যেন অসম্পূর্ণ। প্রতিদিনের অভ্যাসের অংশ হিসেবেই অনেকে খাবার শেষ করেই চায়ের কাপে চুমুক দেন। তবে রাতের খাবারের ঠিক পরেই চা পান করা সবসময় আদর্শ অভ্যাস নাও হতে পারে।
চা হজম প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয় কিংবা খাবার পাকস্থলীতে জমিয়ে রাখে—এমন ধারণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই। বরং মূল উদ্বেগের জায়গা হলো, চা নির্দিষ্ট কিছু পুষ্টি উপাদানের শোষণে প্রভাব ফেলতে পারে কি না। বিশেষ করে খাবারে উদ্ভিদজাত আয়রনের পরিমাণ বেশি থাকলে খাবারের পরপরই চা পান না করে কিছুটা সময় অপেক্ষা করা উপকারী হতে পারে।
খাবারের পরপর চা কেন সমস্যা হতে পারে?
রাতের খাবারের পর চা পান করা নিজে থেকে বিপজ্জনক নয়। বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করে আপনি কী ধরনের খাবার খাচ্ছেন তার ওপর।
চা, বিশেষ করে কালো চায়ে ট্যানিনসহ কিছু পলিফেনল থাকে। এগুলো খাবারে থাকা নন-হিম আয়রনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শরীরে এর শোষণ কমাতে পারে। নন-হিম আয়রন মূলত ডাল, মসুর, পালং শাক, শিমসহ বিভিন্ন উদ্ভিদজাত খাবারে পাওয়া যায়।
ফলে এসব খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চা পান করলে শরীর খাবার থেকে পাওয়া আয়রনের একটি অংশ কম শোষণ করতে পারে।
সময়ের ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ কেন?
খাবার খাওয়ার পর আয়রন মূলত ক্ষুদ্রান্ত্রের ওপরের অংশে শোষিত হয়। এ সময়ের কাছাকাছি চা পান করলে চায়ের পলিফেনল বা ট্যানিন আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে চা পান করলে নন-হিম আয়রনের শোষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। এই প্রভাব চায়ের ধরন, ঘনত্ব এবং খাবারে থাকা আয়রনের ধরনসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
২০২৩ সালে Korean Journal of Family Medicine-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায়ও কফি ও গ্রিন টি গ্রহণ এবং শরীরে আয়রনের মজুদের সূচক ফেরিটিনের মাত্রার মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসে। তবে এ ধরনের পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করে না; খাদ্যাভ্যাস ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সবার ক্ষেত্রে কি একই প্রভাব পড়ে?
না। মাংস, মাছ ও পোলট্রিতে থাকা হিম আয়রন শরীরে তুলনামূলকভাবে ভিন্নভাবে শোষিত হয় এবং চায়ের পলিফেনলের প্রভাবে নন-হিম আয়রনের তুলনায় কম প্রভাবিত হয়।
তাই মাংসভিত্তিক রাতের খাবারের পর চা পান করা এবং ডাল-সবজিভিত্তিক খাবারের পর চা পান করার ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে।
তবে যাদের আয়রনের ঘাটতি রয়েছে বা আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তাল্পতার ঝুঁকি বেশি—যেমন কিছু নিরামিষভোজী ও ভেগান ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং অতিরিক্ত মাসিক রক্তক্ষরণ হয় এমন নারীদের—খাবারের সঙ্গে চা পান করার বিষয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ঘুমেও প্রভাব ফেলতে পারে চা
আয়রন শোষণের পাশাপাশি রাতের খাবারের পর চা পান করার আরেকটি বিষয় হলো ক্যাফেইন। কালো ও গ্রিন—দুই ধরনের চাতেই ক্যাফেইন থাকে, যদিও পরিমাণ চায়ের ধরন ও ঘনত্বের ওপর নির্ভর করে।
ঘুমানোর কাছাকাছি সময়ে চা পান করলে ক্যাফেইন-সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ঘুমাতে দেরি হতে পারে কিংবা ঘুমের মান খারাপ হতে পারে। তাই যাদের রাতে ঘুমের সমস্যা হয়, তাদের ক্ষেত্রে রাতের খাবারের পর চা পানের সময়টিও বিবেচনায় রাখা উচিত।
কতক্ষণ অপেক্ষা করে চা খাবেন?
রাতের খাবারের পর চা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সহজ একটি অভ্যাস হতে পারে—খাবারের পর অন্তত এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে চা পান করা। বিশেষ করে খাবারে যদি ডাল, শাকসবজি বা অন্যান্য উদ্ভিদজাত আয়রনের উৎস বেশি থাকে, অথবা আপনার আয়রনের ঘাটতির ঝুঁকি থাকে, তাহলে এই ব্যবধান রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার যেমন লেবু, টমেটো, কাঁচামরিচ বা বিভিন্ন সাইট্রাস ফল রাখা যেতে পারে। ভিটামিন সি নন-হিম আয়রনের শোষণ বাড়াতে সহায়তা করে।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, শুধু রাতের খাবারের পর এক কাপ চা পান করলেই কারও শরীরে আয়রনের ঘাটতি হবে—এমনটা বলা যায় না। একজন মানুষের আয়রনের অবস্থা নির্ভর করে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, আয়রন গ্রহণের পরিমাণ, শরীরে আয়রনের মজুত এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণের ওপর।
তাই চা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বদলে খাবারের সঙ্গে চা না খেয়ে কিছুটা সময় বিরতি রাখাই হতে পারে সহজ সমাধান। বিশেষ করে উদ্ভিদভিত্তিক বা নিরামিষ খাবারের ক্ষেত্রে রাতের খাবারের অন্তত এক ঘণ্টা পর চা পান করার অভ্যাস আয়রন শোষণের জন্য তুলনামূলকভাবে সহায়ক হতে পারে।



.png)
.png)