থামছে না মবের নামে হত্যা, ২০ মাসে প্রাণ গেল ৪৭৯ জনের
দেশে থামছে না গণপিটুনি বা মব সহিংসতায় হত্যার ঘটনা। চলতি সেপ্টেম্বরেও খুলনায় এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এবং কক্সবাজারে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে মব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫৪ জন। আর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত দুই বছরে নিহত হয়েছেন ৪৭৯ জন।
একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হলেও বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মব সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনায় করা কোনো মামলারই বিচার এখনো শেষ হয়নি। অধিকাংশ মামলায় অভিযোগপত্র জমা পড়েনি। যেসব মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বিচারও এগোচ্ছে ধীরগতিতে।
আইনজ্ঞদের মতে, মব সহিংসতার মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর এবং অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। এতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।
সেপ্টেম্বরেও দুই হত্যাকাণ্ড
গত ১৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের মহেশখালীতে চোর সন্দেহে মোহাম্মদ ফয়সাল (২৭) নামের এক যুবককে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার ভিডিওতে কয়েকজন যুবক ও কিশোরকে তাঁকে মারধর করতে দেখা যায়।
এর তিন দিন পর, ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনা নগরে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও বহিরাগত ব্যক্তি তাঁকে মারধর করেন।
দুটি ঘটনায় পৃথক মামলা হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের পর মব সহিংসতা ও বিচারহীনতার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচারেও অগ্রগতি নেই
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল হোসেন নামের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা এক যুবককে আটকে রাখা হয়। তাঁকে ভাত খাওয়ানোর পর পিটিয়ে হত্যা করা হয়। দেশজুড়ে আলোচিত ওই ঘটনায় দুটি মামলা হয়।
তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। অভিযুক্তদের মধ্যে মাত্র দুজন কারাগারে রয়েছেন এবং নয়জন জামিনে আছেন। বাকি ১৭ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও তাঁদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার বিচারকাজ শুরু হয়নি।
একই দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা শামীম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় দুটি মামলা হলেও দুই বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি পিবিআই।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে চোর সন্দেহে রিহান মাহিন নামের এক কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা এবং আরও দুজনকে আহত করার ঘটনায় গত বছরের ২২ আগস্ট মামলা হয়। নিহতের মায়ের করা ওই মামলার অভিযোগপত্রও এখনো জমা পড়েনি।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে (২৭) কারখানা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পরে তাঁর মরদেহ বিবস্ত্র করে গাছে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়া হয়। পরদিন এ ঘটনায় মামলা করা হয়। মামলায় ২৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা নেওয়ার পরামর্শ
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, মব সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়া যেতে পারে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের ঘটনা কমবে বলে মনে করেন তিনি। তবে বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রকাশিত হতাহতের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মশিউর রহমান সবুজের মতে, বিচার বিলম্বিত হওয়ার কারণে অনেকেই আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন। মব সহিংসতার সংস্কৃতি বন্ধ করা না গেলে আইনের শাসন ব্যাহত হবে। তাই অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে ঢাকা, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে মব সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনায় হাইকোর্টে রিট করেছিলেন আসকের আইনজীবী মো. শাহিনুজ্জামান। রিটে এসব ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং মব সহিংসতা বন্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাওয়া হয়। শুনানি হলেও এ বিষয়ে কোনো আদেশ দেননি হাইকোর্ট।
শাহিনুজ্জামান বলেন, বিচারহীনতা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেই চলেছে। এসব ঘটনা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।



.png)
.png)