পুলিশ
বাংলাদেশ পুলিশের পরিবহন সংকট কাটাতে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানায় বর্তমানে গড়ে দুটি করেও গাড়ি নেই। তার ওপর বিদ্যমান গাড়ির বড় একটি অংশ পুরোনো হওয়ায় নিয়মিত টহল, অপরাধ তদন্ত ও জরুরি সেবা কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে পুলিশকে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, গাড়ি কেনার জন্য দুটি পৃথক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৮২৯টি সাধারণ বা অপারেশনাল যানবাহন কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি ৯২ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ১ হাজার ১টি বিশেষায়িত যানবাহন কেনার জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ২ হাজার ২৮০ কোটি ১৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা।
পরিকল্পনা বিভাগের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প দুটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পুলিশ। এর পুরো ব্যয় বহন করবে সরকার।
পুরোনো গাড়িতে ব্যাহত পুলিশের কার্যক্রম
পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের থানাগুলোতে পুলিশের ব্যবহারের জন্য মাত্র ১ হাজার ২৩৭টি গাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে ৬৪ শতাংশ গাড়ির বয়স ১০ বছরের বেশি। পুরোনো এসব গাড়ির কারণে নিয়মিত টহল, অপরাধ তদন্ত ও জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের ১ হাজার ৭৪টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পরিবহন সংকট আরও তীব্র হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িগুলোর মধ্যে ৪৫৫টি সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
গত ৩০ মার্চ জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় অনেক গাড়ি পুড়ে যাওয়া কিংবা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় পুলিশের টহল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পুলিশের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির পরিবর্তে নতুন যানবাহন সরবরাহে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে প্রস্তাবিত প্রকল্প দুটির লক্ষ্য শুধু ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি প্রতিস্থাপন নয়। এর মাধ্যমে পুলিশের সামগ্রিক পরিবহন সংকট দূর করার পাশাপাশি বিশেষায়িত অভিযান পরিচালনার সক্ষমতাও বাড়াতে চায় সরকার।
প্রতিটি থানায় প্রয়োজন চার-পাঁচটি গাড়ি
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি থানার অধীনে সাধারণত একাধিক ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড থাকে। এসব এলাকায় একই সময়ে টহল ও আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি থানায় অন্তত চার থেকে পাঁচটি পিকআপ বা টহল গাড়ি প্রয়োজন। জনবহুল ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় প্রয়োজন হতে পারে আরও বেশি যানবাহন।
কিন্তু অনেক থানায় মাত্র একটি বা দুটি গাড়ি থাকায় একটি দল অভিযানে বের হলে অন্য এলাকায় পর্যাপ্ত টহল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পুলিশি সহায়তা পৌঁছানোও বাধাগ্রস্ত হয়।
দ্য ডেইলি স্টারকে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) কামারুম মুনিরা বলেন, মূলত পরিবহন সংকট দূর করা এবং পুলিশের কার্যক্রমকে গতিশীল করার উদ্দেশ্যেই গাড়ি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বাহিনীর যানবাহনের প্রয়োজনীয়তা পুনর্মূল্যায়ন করে প্রয়োজনে আরও গাড়ির জন্য আবেদন করা হতে পারে বলেও জানান তিনি।
বিশেষায়িত গাড়িতে গুরুত্ব
সাধারণ যানবাহনের পাশাপাশি সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ তদন্ত ও দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষায়িত গাড়ি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পে রায়ট কার, অল-টেরেইন ভেহিকেল, মোবাইল কমান্ড সেন্টার ও ক্রাইম সিন ভ্যানের মতো যানবাহন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, রায়ট কার জনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশের দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াবে। যেসব দুর্গম এলাকায় সাধারণ টহল গাড়ি চলাচল করতে পারে না, সেখানে অভিযান পরিচালনায় কাজে আসবে অল-টেরেইন ভেহিকেল।
মোবাইল কমান্ড সেন্টারগুলো অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণকক্ষ হিসেবে কাজ করবে। এসব যানবাহনের মাধ্যমে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে অভিযান পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন দলের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, ক্রাইম সিন ভ্যান অপরাধের পরপরই ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ এবং তদন্তের কাজে সহায়তা করবে। এতে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।
এ ছাড়া নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় টহল, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা ও উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য জলযানের প্রয়োজনীয়তার কথাও প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচন কিংবা বড় ধরনের কোনো আয়োজনের সময় দেশজুড়ে একযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ মোতায়েন করতে হয়। এসব পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত যানবাহনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও প্রকল্প প্রস্তাবনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
গাড়ি মেরামত ও চালকদের প্রশিক্ষণ
অপারেশনাল যানবাহন প্রকল্পে শুধু গাড়ি কেনাই নয়, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং চালকদের দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। গাড়ি মেরামতের সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনার জন্য এ প্রকল্পে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৬৫০ জন হালকা যানবাহনচালক এবং ৩০০ জন ভারী যানবাহনচালককে ড্রাইভিং ও মেকানিক্যাল প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি আরও ৫০ জনকে পৃথকভাবে মেকানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
বিশেষায়িত যানবাহন প্রকল্পের অধীনেও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ প্রকল্পে ৯১০ জন কর্মীকে ড্রাইভিং ও মেকানিক্যাল প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি আরও ৫০ জনকে মেকানিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
দেশের ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানার বাইরে বাংলাদেশ পুলিশের ২৪টি রেলওয়ে থানা এবং ৭৩টি হাইওয়ে থানাও রয়েছে। ফলে যানবাহনের প্রয়োজন নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ইউনিটের কার্যক্রম ও দায়িত্বের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে পর্যালোচনা
গত ১৫ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি প্রস্তাবিত প্রকল্প দুটি পর্যালোচনা করে। কমিটি প্রকল্পগুলোর ব্যয় যথাযথভাবে নির্ধারণ, সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ এবং কেনা গাড়িগুলোর পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে।
এ ছাড়া বর্তমানে পুলিশের কাছে থাকা সচল, মেরামতযোগ্য ও ব্যবহারের অনুপযোগী গাড়িগুলোর বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে কমিটি। পুলিশের অনুমোদিত যানবাহনের তালিকায় প্রয়োজনীয় সমন্বয় আনার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
পর্যালোচনা শেষে প্রকল্প দুটি একনেকের অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে পুলিশের পরিবহন সংকট কমবে, টহল ও অভিযান পরিচালনায় গতি আসবে এবং জরুরি প্রয়োজনে জনগণকে দ্রুত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে গাড়ি কেনার পাশাপাশি সঠিক ব্যয় ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং যানবাহনের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।



.png)
.png)