ঢাকা,  মঙ্গলবার
২০ অক্টোবর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ আখলাঘি, যুক্তরাষ্ট্রকে দিলেন হুঁশিয়ারি

প্রকাশিত: ১৫:২৮, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ আখলাঘি, যুক্তরাষ্ট্রকে দিলেন হুঁশিয়ারি

ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ আখলাঘি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কার মধ্যেই ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন সামরিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মেহরদাদ আখলাঘি কেতাবচি। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ইঞ্জিন ও মহাকাশ প্রযুক্তিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ৬৮ বছর বয়সী এই বিশেষজ্ঞের ওপর এখন যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ইরানের সামরিক শিল্প পুনর্গঠন এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর বড় দায়িত্ব। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

গতকাল রোববার ইরানের পার্লামেন্ট আখলাঘিকে নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন দেয়। ভোটাভুটিতে তাঁর মনোনয়নের পক্ষে ২৩৭ জন আইনপ্রণেতা ভোট দেন। বিপক্ষে ভোট দেন ১৫ জন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা শুরু করার পর থেকে দেশটির পার্লামেন্টের অধিবেশন অনলাইনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহসহ দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এরপর থেকে মজিদ ইবনে-রেজা ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এখন তিনি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞতা

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আখলাঘির বিশেষ দক্ষতা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট ইঞ্জিন, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে। এর আগে তিনি শাহিদ বাঘেরি ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপ, অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন ও ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব সংস্থা এবং আখলাঘির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ ছাড়া তিনি জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকাতেও রয়েছেন।

ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম তাসনিমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে ইরানের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্র উন্নয়ন প্রকল্পে সরাসরি যুক্ত ছিলেন আখলাঘি। দেশটির সেজিল ও জুলফিকার সিরিজের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আলমাস ক্ষেপণাস্ত্র ও ইয়াসিন গাইডেড বোমার মতো নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্রের উন্নয়নেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

এ ছাড়া সেমনানের ইমাম খোমেনি স্পেস সেন্টারে মহাকাশযান ও গবেষণার কাজে ব্যবহৃত রকেটের অবকাঠামো উন্নয়নেও কাজ করেছেন তিনি। ফলে ক্ষেপণাস্ত্র থেকে শুরু করে মহাকাশ প্রযুক্তি—ইরানের সামরিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সামরিক শিল্পের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেই সক্ষমতা পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে আখলাঘির ৪২ বছরের বেশি সময় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাগুলো আগেই দেশের শীর্ষ সামরিক কর্তৃপক্ষ, প্রেসিডেন্ট এবং পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিটির অনুমোদন পেয়েছে।

পার্লামেন্টে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কোনো দেশের ওপর আগ্রাসনকারী প্রথম পক্ষ হবে না। তবে যেকোনো আক্রমণের বিরুদ্ধে দেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষায় শেষনিশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করবে।’

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা

ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালাই-নিক চলতি মাসের শুরুতে জানিয়েছিলেন, আখলাঘিকে মনোনীত করার মধ্য দিয়ে কৌশলগত অস্ত্রের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির গুণগত মান এবং উৎপাদনের পরিমাণ—দুই ক্ষেত্রেই উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র বারবার দাবি করে আসছে, তারা ইরানের সামরিক উৎপাদন সক্ষমতার বেশির ভাগ ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে তেহরানের বক্তব্য, মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমার নাগালের বাইরে থেকেও দেশটির পর্যাপ্ত আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা রয়েছে। যুদ্ধ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এসব সক্ষমতা আরও উন্নত করার কথাও বলছে ইরান।

নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সামনে তাই দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক উৎপাদনব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতের হামলা মোকাবিলায় আরও কার্যকর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।

‘একটি বোমা ফেললেও ফিরতে হবে কফিন নিয়ে’

প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন আখলাঘি। ইরানের পারমাণবিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বোমা, ‘মাদার অব অল বোম্বস’, ব্যবহারের হুমকির জবাবে তিনি বলেন, ইরান প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে এবং নিজেদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

আখলাঘি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এখন চিন্তা করতে হবে, কীভাবে তিনি এই অঞ্চল থেকে তাঁর বাহিনীকে নিরাপদে ফিরিয়ে নেবেন। তাঁর ভাষায়, ‘তিনি যদি এখানে একটি বোমাও ফেলেন, তবে তাঁর কতজন সেনাকে কফিনে করে ফেরত নিতে হবে, তা তিনি নিজেই দেখতে পাবেন।’

আখলাঘির এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির মুখে ইরান নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার এবং পাল্টা আঘাত হানার প্রস্তুতি ধরে রাখতে চায়।

সামরিক শিল্প পুনর্গঠনই অগ্রাধিকার

দায়িত্ব নেওয়ার পর যুদ্ধ চলাকালে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইরানের সামরিক চাহিদা নিয়ে আইআরজিসির প্রধান জেনারেল আহমেদ ওয়াহিদিসহ শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আখলাঘি।

তাঁর ঘোষিত অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে সামরিক শিল্পের দ্রুত বিকাশ, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দিতে চান তিনি।

সব মিলিয়ে, ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নিয়োগ কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় দেশটির সক্ষমতা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়লে আখলাঘির পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ইরানের সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতির ওপর।

Advertisement
Advertisement