ঢাকা,  বৃহস্পতিবার
০৮ অক্টোবর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

মৌসুম শেষ, তবু বাজারে আম: কাটিমনে কৃষকের নতুন বিপ্লব

প্রকাশিত: ১৭:৩২, ৭ অক্টোবর ২০২৬

মৌসুম শেষ, তবু বাজারে আম: কাটিমনে কৃষকের নতুন বিপ্লব

কাটিমন আম

ক্যালেন্ডারের হিসাবে বাংলাদেশে আমের মূল মৌসুম শেষ হয় সাধারণত আগস্টে। তবে সেপ্টেম্বর পেরিয়ে অক্টোবরেও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার বাজারে পাওয়া যাচ্ছে সোনালি রঙের কাটিমন আম। শুধু কাটিমন নয়, মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বাজারে মিলছে আশ্বিনা, লক্ষ্মণভোগ, ক্ষীরশাপাতি, বারি-১১ ও ব্যানানা জাতের আম।

দুই-তিন বছর আগেও অফ-সিজনে কাটিমন আমের দাম ছিল প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। তবে এ বছর দাম নেমে এসেছে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকায়। আমদানিকৃত বিভিন্ন রসালো ফলের তুলনায় এই দাম প্রায় অর্ধেক।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট বাজারে গিয়ে দেখা যায়, শত শত ভ্যানভর্তি আম নিয়ে বসেছেন কৃষক ও স্থানীয় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। শ্রমিকেরা ভ্যান থেকে আম নামিয়ে আড়তে নিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে বাছাই শেষে এসব আম পাঠানো হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

অসময়ে আমের চাহিদা থাকায় কৃষকদেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। বাজারের চিত্র দেখে মনে হতে পারে, যেন এখনো আমের মূল মৌসুম চলছে।

কানসাট বাজারের চায়ের দোকানি রফিকুল ইসলাম বলেন, কয়েক বছর আগেও এ সময়ে বাজারে কোনো আম বিক্রি হতে দেখা যেত না। এখন প্রতিদিন শত শত ভ্যান পাকা আম নিয়ে বাজারে আসে।

অফ-সিজনে বাড়ছে দাম

গত ১৯ সেপ্টেম্বর কানসাট বাজারে বারোমাসি কাটিমন আম বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ ৭ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকায়। ব্যানানা ম্যাঙ্গো বিক্রি হয়েছে ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা মণ দরে। আশ্বিনা বিক্রি হয়েছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা এবং বারি-১১ বিক্রি হয়েছে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা মণ দরে।

এর এক সপ্তাহ আগেও ক্ষীরশাপাতি আমের দাম ছিল প্রায় ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা মণ।

স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, মূল মৌসুমে এসব আমের দাম ছিল প্রতি মণ ১ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে। ফলে মৌসুমের বাইরে একই আম বিক্রি করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিন থেকে ১০ গুণ পর্যন্ত বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে।

ক্ষীরশাপাতি, ব্যানানা ও আশ্বিনা আমের মৌসুম শেষ হয়েছে আরও দুই থেকে আড়াই মাস আগে। তবে বিশেষ পরিচর্যা, গ্রাফটিং এবং গাছের মুকুল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব আমের ফলন এখনো পাওয়া যাচ্ছে।

শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নয়ন মিয়া বলেন, বর্তমানে কানসাট বাজারে প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০ টন কাটিমন আম বিক্রি হচ্ছে। এসব আমের গড় বাজারমূল্য ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা। এ পরিস্থিতি আরও প্রায় এক মাস থাকতে পারে। এরপর কাটিমনের সরবরাহ কমে আসবে। তবে বারোমাসি জাত হওয়ায় সারা বছরই বাজারে কাটিমন আম পাওয়া সম্ভব।

নওগাঁর সাপাহার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, বর্তমানে সাপাহার বাজারে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ মণ আম বিক্রি হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এবং বাংলাদেশ ম্যাঙ্গো প্রোডিউসার্স মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, আমের মূল মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার আম বিক্রি হয়। তবে মৌসুমের বাইরে গত কয়েক বছর ধরে বছরে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার কাটিমন আম বিক্রি হচ্ছে।

তাঁর আশা, চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অফ-সিজনের আমের বাজার ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। প্রতি বছর মূল মৌসুমের বাইরে আমের উৎপাদন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ করে বাড়ছে বলেও জানান তিনি।

কাটিমন আমে বদলে যাচ্ছে বাগানের চিত্র

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক হেক্টরেরও কম জমিতে কাটিমন আমের চাষ হতো। মাত্র এক দশকের ব্যবধানে ২০২৫-২৬ মৌসুমে এই চার জেলায় কাটিমনের আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৫৭ হেক্টরে। এর মধ্যে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই ৪ হাজার ৪৬২ হেক্টর জমিতে কাটিমন চাষ হয়েছে।

বাংলাদেশে কাটিমন আমের যাত্রা শুরু হয় ২০১৪ সালে বছরব্যাপী ফল উৎপাদন ও পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে। ওই সময় হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে প্রায় দুই হাজার কাটিমন গাছের চারা সারা দেশে বিতরণ করা হয়।

প্রকল্পটির তৎকালীন পরিচালক মেহেদী মাসুদ জানান, কাটিমন থাইল্যান্ডের একটি বারোমাসি জাত। শিবগঞ্জে গিয়ে কৃষকদের সারা বছর গাছে আম ফলানোর পদ্ধতি শেখানো হয়েছিল। তখন অনেকে এই জাত নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও পরে কৃষকদের হাত ধরে কাটিমন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

তাঁর মতে, কাটিমন সম্প্রসারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন কৃষকেরাই। বর্তমানে তাঁরা টপ ওয়ার্কিং বা গ্রাফটিংয়ের মাধ্যমে একটি গাছে আগের তুলনায় অনেক বেশি সায়ন লাগাচ্ছেন। কোনো কোনো গাছে ৫০০ থেকে এক হাজার পর্যন্ত সায়ন ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে একই জমিতে সারা বছর আম উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পুরোনো গাছেও কাটিমনের সায়ন

শিবগঞ্জের বিভিন্ন আমবাগানে দেখা গেছে, একই গাছে একাধিক জাতের আমের ফলন হচ্ছে। কোনো গাছে কাটিমন, আবার কোনো গাছে ব্যানানা ম্যাঙ্গো, আশ্বিনা বা লক্ষ্মণভোগ আম রয়েছে।

কৃষকেরা পুরোনো গুটি, ফজলি, আশ্বিনা ও লক্ষ্মণভোগের গাছেও গ্রাফটিং করে কাটিমনের সায়ন লাগাচ্ছেন।

কানসাট বাজারের কৃষক হাসান আলী ১২ বিঘা জমিতে আম চাষ করেছেন। তাঁর বাগানের প্রায় অর্ধেক গাছেই এখন কাটিমন আম দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ফজলি, আশ্বিনা ও গুটি আমে আগের মতো লাভ হচ্ছে না। তাই এসব গাছে কাটিমনের সায়ন লাগিয়েছেন। এতে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে এবং কৃষকেরাও লাভবান হচ্ছেন।

শিবগঞ্জের মোবারকপুর এলাকার কৃষক মো. আব্দুর রাকিব বলেন, ক্ষীরশাপাতির গাছে কাটিমনের সায়ন লাগিয়ে বিশেষ পরিচর্যা করলে মাতৃগাছ ও কলম করা শাখায় একই সময়ে মুকুল আসে। এতে একই গাছ থেকে দুই জাতের আম পাওয়া যায় এবং লাভও বাড়ে।

দড়িচক বিল এলাকার কৃষক হাশেম আলী জানান, ব্যানানা আমের গাছে মূল মৌসুমে প্রথম যে ফুল আসে, সেটি ভেঙে দেন তাঁরা। এরপর বিশেষ পরিচর্যা করলে প্রায় দুই মাস পর আবার ফুল আসে। এভাবেই অফ-সিজনে ব্যানানা আম পাওয়া যাচ্ছে।

সব জাতের আমে এই পদ্ধতি কার্যকর নয়

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শরফ উদ্দিন বলেন, আম চাষিদের মধ্যে এখন অফ-সিজনে আম উৎপাদনের আগ্রহ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তাঁরা মুকুল ভাঙছেন, বাড়তি পরিচর্যা করছেন এবং ফুল আসার আগে বিভিন্ন ধরনের হরমোন প্রয়োগ করছেন। এর ফলে কিছু ক্ষেত্রে সফলতাও পাওয়া যাচ্ছে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সবাই একই পদ্ধতি অনুসরণ করে সফল হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। অনেক সময় মৌসুমে গাছের মুকুল ভেঙে দিলে পরে সেই গাছে আর ফুল নাও আসতে পারে। জেনেটিক্যালি দেরিতে ফলন দেওয়া জাতের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সফল হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি।

আসছে আরও নাবি জাত

কৃষিবিদ ও গবেষকদের মতে, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে বাজারে আরও কয়েকটি লেট ভ্যারাইটি বা নাবি জাতের আম আসতে পারে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র দুটি জাত নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে বারি আম-১৯ অবমুক্তির পর্যায়ে রয়েছে। এটি বারি আম-৩ ও বারি আম-৪ থেকে উদ্ভাবিত একটি হাইব্রিড জাত।

মো. শরফ উদ্দিন জানান, বারি আম-১৯ দেখতে আকর্ষণীয়, খেতে মিষ্টি এবং এর বোঁটা শক্ত। ফলে ঝড়-বৃষ্টিতে ক্ষতির আশঙ্কাও তুলনামূলক কম। সাধারণত জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই আম বাজারে পাওয়া যেতে পারে।

আরেকটি সম্ভাবনাময় জাতকে ভবিষ্যতে বারি আম-২০ হিসেবে অবমুক্ত করা হতে পারে। আম্রপালি ও ল্যাংড়া জাতের সংকরায়ণে পাওয়া এই আম দেখতে ও খেতে অনেকটা ল্যাংড়ার মতো। আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এর বাজারজাত করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।

আগামী এক বছরের মধ্যে বারি আম-১৯ ও বারি আম-২০ অবমুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া বারোমাসি আরও কিছু জাতের সন্ধান পাওয়া গেছে। বিভিন্ন উদ্যোক্তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে সেগুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। সফল হলে ভবিষ্যতে এসব জাতও বাজারে আসতে পারে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারও দুটি নাবি জাত নিয়ে কাজ করছে। ভারতে কাননভোগ ও লেট আম্রপালি নামে পরিচিত জাত দুটির চারা নিয়ে পরীক্ষা চলছে।

হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক মো. খালেদুর রহমান বলেন, কৃষকেরা লাভের আশায় নাবি জাতের আমের দিকে ঝুঁকছেন। হর্টিকালচার সেন্টার আগামী দুই থেকে তিন বছর এসব গাছ পর্যবেক্ষণ করবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে জাতগুলো খাপ খেলে ভবিষ্যতে তা বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা হবে।

সব মিলিয়ে, একসময় শুধু নির্দিষ্ট কয়েক মাসের ফল হিসেবে পরিচিত আম এখন কৃষকদের নতুন প্রযুক্তি ও চাষপদ্ধতির কারণে মৌসুমের বাইরেও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে কাটিমনের বিস্তার শুধু ভোক্তাদের সারা বছর আম খাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে না, কৃষকদের জন্যও তৈরি করছে বাড়তি আয়ের নতুন সম্ভাবনা।

 

Advertisement
Advertisement