ব্যাংক খাতে অলস অর্থের পাহাড়, তবু তারল্যসংকটে কিছু ব্যাংক
ব্যাংকিং খাতে ঋণপ্রবাহ ক্রমেই সরকারমুখী হয়ে পড়ছে। ফলে প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছে না বেসরকারি খাত, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিল্প ও ব্যবসার বিকাশ। অন্যদিকে, ব্যাংক খাতের একাংশ যখন তীব্র তারল্যসংকটে ভুগছে, তখন পুরো খাতে জমছে বিপুল পরিমাণ অলস অর্থ। খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম এবং ব্যাংকের ওপর আস্থার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ব্যাংক খাতের এই সংকটের অন্যতম কারণ। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু ঋণ ব্যবস্থাপনার সংস্কার নয়, রাষ্ট্র ও অর্থনীতিতে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণও কমাতে হবে।
রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) আয়োজনে ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ব্যাংক খাতের পুনর্গঠন’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের শেষ দিনের প্রথম অধিবেশনে এসব বিষয় উঠে আসে। গতকাল বৃহস্পতিবারের অধিবেশনে ব্যাংক খাতের সংকট, সুশাসনের ঘাটতি ও ঋণপ্রবাহের দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করেন আমন্ত্রিত বক্তারা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা। আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব।
আস্থার সংকটে ব্যাংক খাত
ব্যাংকিং খাতের ঋণপ্রবাহ ক্রমেই সরকারমুখী হয়ে পড়ছে বলে মন্তব্য করেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কমে যাওয়ায় শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে এ পরিস্থিতি অর্থনীতিতে ঋণের চাপ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
ব্যাংক ও শিল্পকারখানার বেসরকারীকরণ নিয়ে আলোচনা হলেও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, ব্যাংক খাতের সংস্কার শুধু আর্থিক নীতিমালার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে। নানা অনিয়মের কারণে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। বাজারব্যবস্থার নিয়ম পুরোপুরি অনুসরণ করা হলে অনেক দুর্বল ব্যাংক এত দিন টিকে থাকতে পারত না। বরং বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সেগুলো চালু রাখা হয়েছে। এসব উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
অল্পসংখ্যক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ধনীর স্বার্থে রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়ার প্রবণতাকে ব্যাংক খাতের বর্তমান দুরবস্থার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি শোষণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের পরিবর্তে সুবিধা ভোগ করেছে প্রভাবশালী গোষ্ঠী। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করেই এসব গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, কয়েকটি ব্যাংক এখনো তুলনামূলক ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এসব ব্যাংকের অভিজ্ঞতা থেকে অন্য ব্যাংকগুলোর শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে ব্যাংক খাতের মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে হলে রাষ্ট্রের চরিত্র এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে। অল্প কয়েকজনের স্বার্থের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অলস অর্থের পাহাড়, তবু তারল্যসংকট
মূল প্রবন্ধে ব্যাংক খাতের এক বিপরীতমুখী চিত্র তুলে ধরেন অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা। তিনি বলেন, কিছু দুর্বল ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক তীব্র তারল্যসংকটে রয়েছে। অথচ পুরো ব্যাংকিং খাতে অলস বা অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
তাঁর উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে অলস তারল্যের পরিমাণ ৪ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ, একদিকে কিছু ব্যাংক গ্রাহকের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থের সংকটে রয়েছে, অন্যদিকে পুরো ব্যাংক খাতের বিপুল অর্থ ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ হচ্ছে না।
অস্বাভাবিক হারে খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেন বরকত-এ-খোদা। এগুলো হলো রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল সুশাসন, নমনীয় নীতিমালা এবং বারবার ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া, আর বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি।
অর্থ পাচার ও অনিয়মে বিপর্যস্ত ব্যাংক খাত
ব্যাংক খাতের সংকটের পেছনে অর্থ পাচার, জাল ঋণ ও বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, ভুয়া ঋণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আড়াই থেকে ৩ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বরকত-এ-খোদা বলেন, ব্যাংকের একাংশের পরিচালক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা যথাযথ জামানত ছাড়াই বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছেন। রাজনৈতিক ব্যক্তি, ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের একাংশের যোগসাজশে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় উঠে আসে, ব্যাংক খাতের সংকট কেবল তারল্য বা খেলাপি ঋণের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং আর্থিক খাতে জবাবদিহির অভাব। ফলে টেকসই সংস্কারের জন্য ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ঋণ বিতরণ ও রাষ্ট্রীয় সুবিধা বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।



.png)
.png)