ঢাকা,  শুক্রবার
৩০ অক্টোবর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

মার্কিন দূতাবাসে হামলার ছক, ইরানের কোন কোন অস্ত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র?

প্রকাশিত: ১১:৫৫, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

মার্কিন দূতাবাসে হামলার ছক, ইরানের কোন কোন অস্ত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র?

মার্কিন দূতাবাসে হামলার ছক, ইরানের কোন কোন অস্ত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র?

বছরের শুরুর দিকে ইরান যুদ্ধ যখন তুঙ্গে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে নিজেদের কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের সরিয়ে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসায় সম্প্রতি তাঁদের অনেকে নিজ নিজ দপ্তরে ফিরে কাজ গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু নতুন করে তাঁদের মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। সৌদি আরবসহ একাধিক দেশে মার্কিন দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনের জরুরি নন—এমন কর্মীদের সরিয়ে নিচ্ছে ওয়াশিংটন।

একজন মার্কিন কূটনীতিক সিএনএনকে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন দূতাবাস ও মিশনগুলোর বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘বিশৃঙ্খল’ বললেও কম বলা হবে।

আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএসএ) মুখপাত্র নিকি গেমারও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এ বছরের শুরুর দিকে পরিবারগুলো যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিল, এবারও তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। কেউ কেউ ফিরে এসে সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার পরপরই আবার চলে যাওয়ার নির্দেশ পেয়েছেন। এতে তাঁরা হতাশ, বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ।

গত ২১ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের জরুরি নয়—এমন কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দেয়। সৌদি আরবে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়াকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র উত্তেজনা।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি হামলা চললেও যুদ্ধের শুরুর দিকের মতো উত্তেজনা নেই। তারপরও কেন হঠাৎ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সৌদি আরবের পাশাপাশি জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লেবাননে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশন থেকেও কর্মী সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এএফপি ও সিএনএনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও বারবার সতর্ক করে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মার্কিন গোয়েন্দাদের গোপন সতর্কবার্তা

মার্কিন কর্মকর্তাদের এই তৎপরতার পেছনের কারণ সম্পর্কে ২৩ অক্টোবর ধারণা দেয় মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের একটি প্রতিবেদন। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটন দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরে একটি অগোপনীয় স্মারক পাঠিয়েছেন। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের ওপর ইরানের সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

অ্যাক্সিওসসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের হাতে ওই স্মারকের অনুলিপি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। স্মারকে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এমনকি প্রাণঘাতী হামলার কিছু পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, ২৩ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে স্মারকটি পাঠান জে ক্লেটন।

এদিকে নিউইয়র্ক টাইমস মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের প্রতি ইরানের হুমকি এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এমন উচ্চমাত্রার হুমকি আর দেখা যায়নি।

কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিভিন্ন দেশের মার্কিন দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনে কর্মীর সংখ্যা কমানো হচ্ছে।

ক্লেটনের এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে। জবাবে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, নতুন করে হামলা হলে এবার আগের চেয়েও শক্তিশালী পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।

পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ২১ মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৭৫০ জনের বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সক্রিয় ইরানি এজেন্ট?

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ না করা মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাষ্ট্রদূতসহ বিভিন্ন মার্কিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হামলার হুমকি পর্যালোচনা করেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এতে ইউরোপের কয়েকটি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুও চিহ্নিত হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কিছু গোয়েন্দা তথ্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ইরানি এজেন্টরা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

তবে এ স্মারক নিয়ে ওয়াশিংটন এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। নিউইয়র্ক টাইমসকে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, হুতিদের হামলার আশঙ্কার পাশাপাশি মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনার কারণেও বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনে কর্মী কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অবশ্য আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ও অন্যান্য দেশে হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা ইরানের সীমিত। অর্থাৎ, গোয়েন্দা তথ্য থাকলেও ইরানের সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সামর্থ্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইরানের সক্ষমতা যদি সত্যিই সীমিত হয়, তাহলে কেন এত সতর্কতা নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা, বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা এবং সমুদ্রপথে হামলার সামর্থ্য সম্পর্কে ধারণা নেওয়া প্রয়োজন।

ক্ষেপণাস্ত্রই ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি

ইরানের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি দেশটির বিশাল ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার সবচেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যময়। দেশটির হাতে রয়েছে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ—দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র।

ইরানের সবচেয়ে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় হামলা চালানো সম্ভব। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছানোর সক্ষমতা রয়েছে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ফাতেহ, জুলফাগর, কিয়াম-১ এবং শাহাব-১ ও শাহাব-২। এগুলোর পাল্লা প্রায় ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার। কাছাকাছি সামরিক স্থাপনা ও লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় এগুলো ব্যবহার করা হয়।

অন্যদিকে, মধ্যমপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে শাহাব-৩, এমাদ, গাদর-১, খোররামশাহর ও সেজিল। এ ছাড়া রয়েছে খাইবার শেকান ও হাজ কাসেমের মতো নতুন নকশার ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলোর পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার কিলোমিটার।

সেজিল ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষত্ব হলো, এটি কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করে। ফলে তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় দ্রুত উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করা যায়।

আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেজিলের পাল্লা প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার, এমাদের ১ হাজার ৭০০, গাদরের ২ হাজার, শাহাব-৩-এর ১ হাজার ৩০০ এবং খোররামশাহরের ২ হাজার কিলোমিটার।

তবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে হামলার চেষ্টার পর। গত ২০ মার্চ সেখানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ ওঠে ইরানের বিরুদ্ধে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের দাবি, ইরান ওই দ্বীপে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। এর একটি মাঝপথে ভেঙে পড়ে। অন্যটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে ইরান এ হামলার দায় অস্বীকার করেছে।

দিয়েগো গার্সিয়া ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে। দূরত্বটি ইরানের ঘোষিত ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লার প্রায় দ্বিগুণ। ফলে ওই হামলার চেষ্টা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকৃত সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ইউরোপও কি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায়?

ইরান এত দিন বলে এসেছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু ইসরায়েল বারবার দাবি করেছে, ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৪ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

এ দাবি সত্য হলে ইউরোপের বড় একটি অংশ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় চলে আসতে পারে। লন্ডন ও প্যারিসের মতো বড় শহরও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দিয়েগো গার্সিয়া লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পেরেছিল। এটি ইঙ্গিত দেয়, ইরান ঘোষিত সীমার চেয়ে বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, দিয়েগো গার্সিয়া লক্ষ্য করে খোররামশাহর ক্ষেপণাস্ত্রের একটি সংস্করণ ছোড়া হয়ে থাকতে পারে। এ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২ হাজার কিলোমিটারের বেশি। তবে হালকা ওয়ারহেড ব্যবহার করলে এর পাল্লা প্রায় দ্বিগুণ করা সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি বড় শক্তি ড্রোন

ইরানের সামরিক সক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ দেশটির ড্রোনভান্ডার। একমুখী হামলা, নজরদারি এবং বিভিন্ন সামরিক অভিযানে ব্যবহারের জন্য ইরানের হাতে রয়েছে নানা ধরনের ড্রোন।

ইরানের ড্রোন কর্মসূচির সূচনা ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়। প্রচলিত যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে ড্রোনকে অসম যুদ্ধকৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তোলে দেশটি।

ইরানের তিনটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রধানত সামরিক ড্রোন তৈরি করে। শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ তৈরি করে শাহেদ সিরিজের ড্রোন। ইরান এয়ারক্রাফট ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিজ বা হেসা তৈরি করে আবাবিল সিরিজ। আর কুদস এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ তৈরি করে মোহাজের সিরিজের ড্রোন।

ইরানের তৈরি অনেক ড্রোন দেশটির মিত্র ও সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর কাছেও পৌঁছেছে। শাহেদ-১৩৬ ড্রোন রাশিয়া গেরান-২ নামে ব্যবহার করে। হুতিরাও একই ধরনের ড্রোন ওয়াইদ-২ নামে ব্যবহার করে।

ইরানের একমুখী হামলার ড্রোনগুলো সাধারণত আগে থেকেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে পাঠানো হয়। বিস্ফোরক বহনকারী এসব ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পর ধ্বংস হয়ে যায়।

এসব ড্রোনের বড় সুবিধা হলো, এগুলো তুলনামূলক সস্তা এবং একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক পাঠানো সম্ভব। ফলে একের পর এক ড্রোন পাঠিয়ে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলা যায়।

ইরানের ড্রোনভান্ডারে শাহেদ-১০১, শাহেদ-১২৯, শাহেদ-১৪৯, শাহেদ-১৭১, আরাশ-২, আবাবিল ও মোহাজের সিরিজের বিভিন্ন ড্রোন রয়েছে। কিছু ড্রোন নজরদারিতে, কিছু সরাসরি হামলায় এবং কিছু উভয় ধরনের কাজে ব্যবহৃত হয়।

ভূগর্ভে লুকানো ক্ষেপণাস্ত্রের শহর

যুদ্ধের ক্ষেত্রে শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বা পাল্লাই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং কত দিন ধরে হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, সেটিও বড় বিবেচ্য বিষয়।

ইরান কয়েক বছর ধরে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, গোপন ঘাঁটি ও সুরক্ষিত উৎক্ষেপণকেন্দ্রে গড়ে তুলেছে। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে অন্তত পাঁচটি ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ রয়েছে। এর মধ্যে কেরমানশাহ ও সেমনানের নাম উল্লেখযোগ্য।

এসব ভূগর্ভস্থ স্থাপনার কারণে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা একযোগে ধ্বংস করা কঠিন। শুধু ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ নয়, উৎপাদন ও উৎক্ষেপণের অবকাঠামোর কিছু অংশও ভূগর্ভে গড়ে তুলেছে দেশটি।

২০২০ সালে ইরান প্রথমবারের মতো ভূগর্ভস্থ স্থাপনা থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথা জানিয়েছিল।

এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা পরিবর্তন, নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি এবং হালকা উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে পাল্লা বাড়ানোর চেষ্টা করছে ইরান।

২০২৩ সালে নিজেদের তৈরি প্রথম হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচনের ঘোষণা দেয় তেহরান। ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা আইআরএনএর দাবি অনুযায়ী, এ ক্ষেপণাস্ত্রের গতি শব্দের চেয়ে অন্তত পাঁচ গুণ বেশি হতে পারে। তবে এর প্রকৃত কার্যকারিতা ও সক্ষমতা নিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সীমিত।

উপসাগরের যোগাযোগব্যবস্থাও হতে পারে লক্ষ্যবস্তু

ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার পরিকল্পনা শুধু সামরিক স্থাপনা বা ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে উপসাগরের তলদেশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেব্‌লও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, নতুন করে হামলা হলে উপসাগরের তলদেশে থাকা যোগাযোগ কেব্‌লগুলোতে আঘাত হানার বিস্তারিত পরিকল্পনা করেছে তেহরান।

তাঁদের একজনের ভাষ্য, হামলার পর যাতে দ্রুত এসব কেব্‌ল মেরামত করা না যায়, সেই ব্যবস্থাও করার চেষ্টা করা হবে। এতে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন যোগাযোগব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটতে পারে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) রাজনৈতিক বিভাগের উপপ্রধান ইয়াদউল্লাহ জাভানি বলেছেন, ইরানের অবকাঠামোয় হামলা হলে হরমুজ প্রণালির নিচে থাকা সাতটি বড় ইন্টারনেট কেব্‌ল লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।

ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি, দেশটি আবার আক্রান্ত হলে পাল্টা হামলার কোনো সীমারেখা থাকবে না। যোগাযোগ কেব্‌ল থেকে শুরু করে সামরিক ঘাঁটি—সবকিছুই লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরেও বাড়ছে ঝুঁকি

ইরানের হাতে সমুদ্রপথে চাপ তৈরিরও নানা উপায় রয়েছে। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি বিশ্বে তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। ফলে এ অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ-মাইন, ড্রোন এবং দ্রুতগতির নৌযান ব্যবহার করে ইরান মার্কিন সামরিক বাহিনী ও বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা শুরু করলে পাল্টা জবাবে তারা আরও আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করবে।

বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেছেন, এবার ইরান শুধু পাল্টা হামলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাঁর দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মান, পাল্লা ও শক্তি আগের তুলনায় বেড়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গত ২৬ অক্টোবর মিসিসিপিতে এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি দাবি করেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলো ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তাঁর আরও দাবি, এসব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শহরেও হামলা চালানো সম্ভব।

কেন এত সতর্ক যুক্তরাষ্ট্র?

ইরানের হাতে বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, নানা ধরনের ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে ভূগর্ভস্থ সামরিক ঘাঁটি, সমুদ্রপথে চাপ তৈরির সক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার হুমকি।

ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করেছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সেনা, সামরিক ঘাঁটি, কূটনৈতিক স্থাপনা, কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আওতায় রয়েছেন।

একই সঙ্গে ইউরোপের কিছু অংশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছানোর সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো নেই।

সব মিলিয়ে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না—এমন আশঙ্কা থেকেই কূটনৈতিক মিশনগুলোতে কর্মী কমাচ্ছে ওয়াশিংটন। ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে গোয়েন্দা সতর্কবার্তা এবং আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাই এখন মার্কিন প্রশাসনের উদ্বেগের কেন্দ্রে।

Advertisement
Advertisement

আরো পড়ুন