সীসার বিষে নষ্ট হচ্ছে শিশুদের মেধা, ঢাকার বস্তিতে আক্রান্ত ৯৮ শতাংশ
রইছ উদ্দিন আগে কাজ করতেন আমিনবাজারের একটি ইটভাটায়। ২০২৪ সালের জুনে মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকার একটি ব্যাটারি মেরামত ও রিসাইক্লিং কারখানায় শ্রমিক হিসেবে যোগ দেন তিনি। অস্থায়ী ওই কারখানার কাছেই খুপরি ঘর ভাড়া নিয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতে শুরু করেন। কিন্তু নতুন কারখানায় কাজ শুরুর পরই যেন অন্ধকার নেমে আসে তাঁর পরিবারে।
কারখানাটি বাইরে থেকে বোঝার উপায় ছিল না কী ধরনের কাজ সেখানে হতো। চারদিকে ছিল টিনের বেড়া ও কিছু গাছপালা। কিন্তু কাজ শুরুর পর সেখান থেকে বের হতে থাকে ঘন কালো ধোঁয়া। কোনো ধরনের সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই সেখানে সীসা-অ্যাসিডযুক্ত ব্যাটারি রিসাইক্লিং করা হতো।
মিরপুর ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের সামনে কথা হয় রইছ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, বিষাক্ত ধোঁয়া দ্রুত আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ত। ভবন, টিনের চাল, দেয়াল ও গাছপালা কালচে হয়ে যেত। শিশুরা যেখানে খেলত, শ্রমিকেরা যেখানে বসত—সেসব জায়গাও কালো হয়ে যেত।
তবে এর ভয়াবহ কারণ বুঝতে রইছ উদ্দিনের প্রায় ছয় মাস লেগে যায়। ততদিনে অসুস্থ হয়ে পড়ে তাঁর সাত বছরের ছেলে আদিব ও চার বছরের মেয়ে জাহানারা।
দুই শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পর রক্ত পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় তাদের শরীরে সীসার মারাত্মক উপস্থিতি ধরা পড়ে। চিকিৎসকেরা জানান, খোলা চুলায় ব্যাটারি থেকে সীসা গলানোর ফলে তৈরি বিষাক্ত ধোঁয়া ও দূষিত পরিবেশই এর অন্যতম কারণ।
রইছ উদ্দিন বলেন, মেধাবী ও চটপটে দেখে অনেক কষ্টে আদিবকে স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। কিন্তু এখন সে অনেক কিছুই মনে রাখতে পারে না। আর জাহানারার দুধের দাঁত ওঠার আগেই মাড়ি ক্ষয়ে গিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে। চিকিৎসকেরা জানান, মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ ও দাঁত ক্ষয়ে যাওয়ার পেছনে সীসার বিষক্রিয়ার ভূমিকা রয়েছে।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার কিনে দেওয়ার সামর্থ্যও তাঁর নেই বলে আক্ষেপ করেন রইছ উদ্দিন।
আদিবের ভাষায়, ‘জায়গাটা খুব খারাপ ছিল। কালো ধোঁয়া বের হতো, শ্বাস নিতে কষ্ট হতো। পড়াশোনায় মন বসে না, ক্লাসে যেতেও ইচ্ছে করে না। সবকিছু ভুলে যাই।’
জনস্বাস্থ্য সংকটের নাম সীসা
শুধু আদিব বা জাহানারা নয়, বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে সীসার বিষক্রিয়া বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। স্বাদহীন, গন্ধহীন এবং খালি চোখে অদৃশ্য এই ভারী ধাতু শরীরে জমে মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ শৈশবেই মস্তিষ্ক ও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো বিকশিত হয়। এই সময়ে দীর্ঘদিন অল্প মাত্রায় সীসার সংস্পর্শেও স্নায়ুবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কমে যেতে পারে স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা ও আইকিউ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, রক্তে সীসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। সংস্থাটির মতে, রক্তে সীসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ঢাকার বস্তিতে ৯৮ শতাংশ শিশুর শরীরে সীসা
রাজধানীর বস্তি এলাকার শিশুদের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ২ থেকে ৪ বছর বয়সী ৫০০ শিশুর ওপর গবেষণা চালায়।
গবেষণায় দেখা যায়, ৯৮ শতাংশ শিশুর শরীরেই সীসার উপস্থিতি রয়েছে। এসব শিশুর রক্তে সীসার গড় মাত্রা ছিল প্রতি ডেসিলিটারে ৬৭ মাইক্রোগ্রাম।
দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এ ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১১ হাজারের বেশি শিশু এবং দুই হাজারের বেশি গর্ভবতী নারীর রক্ত পরীক্ষা করা হয়। দেশে এটিই সীসা ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে প্রথম বড় পরিসরের জরিপ।
সার্ভের ফলাফলে দেখা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে প্রায় চারজনের, অর্থাৎ ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ শিশুর রক্তে উচ্চমাত্রার সীসা রয়েছে। একইভাবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ গর্ভবতী নারীর রক্তেও অতিরিক্ত সীসা পাওয়া গেছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঢাকায়। ঢাকা বিভাগে ৬৫ দশমিক ২ শতাংশ শিশুর রক্তে উচ্চমাত্রার সীসা পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ২২ দশমিক ৮ শতাংশ গর্ভবতী নারীর রক্তেও সীসার উপস্থিতি মিলেছে।
এরপর রয়েছে সিলেট, যেখানে ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু; চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ; ময়মনসিংহে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ; বরিশালে ২৯ শতাংশ; রংপুরে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ; খুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং রাজশাহীতে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু সীসার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত।
বছরে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি আইকিউ পয়েন্ট
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থা পিওর আর্থের অর্থায়নে অর্থনীতিবিদ বিয়র্ন লারসেনের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সীসা দূষণের কারণে বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে প্রতি বছর আনুমানিক দুই কোটি আইকিউ পয়েন্ট নষ্ট হচ্ছে। জীবনের প্রথম পাঁচ বছরেই প্রতিটি শিশু গড়ে ৬ দশমিক ৯ আইকিউ পয়েন্ট হারাচ্ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
এর প্রভাব পড়ছে শিশুদের স্নায়ুবিক বিকাশ, বুদ্ধিমত্তা, স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতার ওপর। শৈশবে আইকিউ কমে যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে শিক্ষার সুযোগ, দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা এবং আজীবন উপার্জনের সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
গবেষণাটিতে আরও বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে সীসা দূষণজনিত স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শৈশবে সীসার সংস্পর্শে এসে বুদ্ধিমত্তা কমে যাওয়ার কারণে কর্মজীবনে উৎপাদনশীলতা হারানোর বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
গর্ভস্থ শিশুর জন্যও বড় ঝুঁকি
সীসার বিষক্রিয়া শুধু জন্মের পর শিশুদের জন্য নয়, গর্ভাবস্থাতেও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। মায়ের রক্তে অতিরিক্ত সীসা থাকলে তা প্লাসেন্টা ভেদ করে ভ্রূণের শরীরে পৌঁছাতে পারে।
এর ফলে গর্ভপাত, গর্ভেই শিশুর মৃত্যু কিংবা নির্ধারিত সময়ের আগে অপরিণত সন্তান জন্মের মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ইউনিসেফের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. প্রিসিলা ওবিল বলেন, সীসা সরাসরি বিকাশমান মস্তিষ্কে আঘাত করে এবং শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আক্রান্ত শিশুরা শ্রেণিকক্ষে পিছিয়ে পড়তে পারে, নতুন পাঠ বুঝতে সমস্যা হতে পারে এবং আগের দিনের পড়া ভুলে যেতে পারে। এমনকি মা-বাবার দেওয়া সহজ নির্দেশ মনে রাখা বা তা অনুসরণ করার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
যেসব উৎস থেকে ছড়াচ্ছে সীসা
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানা সীসা দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। ব্যবহৃত ব্যাটারি ভাঙা ও গলানোর সময় সীসা বাতাস, মাটি ও আশপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
এ ছাড়া খাবার ও মসলায় সীসার ভেজাল, সীসাযুক্ত রং, ধূলিকণা, মানহীন ধাতব ও অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র, সীসাযুক্ত খেলনা, অনিয়ন্ত্রিত ই-বর্জ্য এবং কিছু ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক মাছ চাষে ব্যবহৃত মানহীন ফিড থেকেও সীসার সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি রয়েছে।
সীসা মূলত নাক, মুখ ও ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে অতিরিক্ত সীসা থাকলে তা অনাগত শিশুর শরীরেও পৌঁছাতে পারে।
সীসার বিষে স্মৃতিশক্তি হারাচ্ছে শিশুরা
সীসার বিষক্রিয়ায় শিশুদের মানসিক বিকাশ থমকে যাওয়ার আরেকটি উদাহরণ পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার ১১ বছর বয়সী এক শিশু।
তার বাবা আতাউর রহমান জানান, মেয়ের বয়স যখন ৯ বছর, তখন তিনি লক্ষ্য করেন, আগের মতো চঞ্চল থাকলেও ধীরে ধীরে মেয়েটি ভুলো মনের হয়ে যাচ্ছে। একপর্যায়ে আত্মীয়স্বজনের নামও ভুলে যেতে শুরু করে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করানোর পরও পড়াশোনায় তার মন বসছিল না।
প্রথমে মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া হয়। পরে আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক নিউরোলজি বিভাগে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষার পরামর্শ দেন।
পরীক্ষায় শিশুটির রক্তে সীসার মাত্রা পাওয়া যায় প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম। চিকিৎসকদের পরামর্শে পরে তারা বাসা পরিবর্তন করে পল্টনে চলে যান। তবে বাসা বদলালেও মেয়েটির বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে জানান বাবা।
প্রাপ্তবয়স্করাও ঝুঁকিতে
সীসার বিষক্রিয়ার প্রভাব শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চলে বসবাসকারী ২৬ বছর বয়সী এক যুবকের শরীরে প্রায় ৬৫ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার সীসা পাওয়া যায় বলে আইসিডিডিআর,বি জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের মাত্রা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গুরুতর অবস্থায় রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ‘চিলেশন থেরাপি’র মতো চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
প্রয়োজন কঠোর নজরদারি
সীসা দূষণ মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে রং ও জ্বালানি তেলে সীসার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়; সীসার উৎসগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
আইসিডিডিআর,বির এনভায়রনমেন্টাল ইন্টারভেনশনস ইউনিটের প্রকল্প সমন্বয়কারী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশকে সীসা দূষণমুক্ত করতে ধারাবাহিক ও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। কঠোর আইন প্রয়োগ ও তদারকির মাধ্যমে সীসার অপব্যবহার বন্ধের কোনো বিকল্প নেই।
ইউনিসেফ সীসা দূষণকে বাংলাদেশের জন্য মারাত্মক পরিবেশগত স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সীসা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ। তবে এই দূষণ প্রতিরোধযোগ্য। তাই ব্যাটারি রিসাইক্লিং, রং, খাবার ও মসলা, খেলনা, ই-বর্জ্যসহ সীসার সম্ভাব্য উৎসগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
কারণ সীসার বিষক্রিয়ার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় এমন একটি সময়ে, যখন একটি শিশুর মস্তিষ্ক গড়ে ওঠে, সে শেখে, স্মৃতি তৈরি করে এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। সেই সময়টুকু যদি সীসার বিষে নষ্ট হয়ে যায়, তার ক্ষতি শুধু একটি পরিবারের নয়—দীর্ঘমেয়াদে পুরো সমাজ ও দেশের জন্যই বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।



.png)
.png)