ঢাকা,  বৃহস্পতিবার
১৫ অক্টোবর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে যুদ্ধে পাঠানো হয়, নিহত ২০

প্রকাশিত: ১৬:৪৬, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে যুদ্ধে পাঠানো হয়, নিহত ২০

চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে যুদ্ধে পাঠানো হয়

চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়ার কথা বলে তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে তাঁদের পাঠানো হয় সেনাবাহিনীর কাছে। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের নামানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে। সেখানে ড্রোন হামলায় অন্তত ২০ বাংলাদেশির মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।

বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান। এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও পরে তাঁদের রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হয়।

মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে নেওয়া ব্যক্তিদের কেউই যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত ছিলেন না। তাঁদের যুদ্ধসংক্রান্ত শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ কিংবা কৌশলগত প্রস্তুতি ছিল না। এত অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে কেন তাঁদের যুদ্ধে পাঠানো হলো, তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে এসআরবি জানতে পেরেছে, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে তাঁদের একধরনের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

এসআরবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা যেটা বুঝতে পেরেছি, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তকরণের জন্য একধরনের শিকার হিসেবে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। যখন প্রতিপক্ষ তাদের ওপর ড্রোন হামলা করে, তখন ওই দেশটি শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করে।’

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রের তিনটি অংশ—প্রথম ভাগ, মধ্যভাগ ও শেষভাগে—বাংলাদেশিদের মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে এসআরবি।

জীবিত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরেছেন। তাঁদের একজন রাজন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় তাঁর কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। এরপর বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছান।

বাকি আটজনের মধ্যে দুজন মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্য ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন বলে জানিয়েছে এসআরবি।

মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, এই মানব পাচারের সঙ্গে বাংলাদেশি চক্রের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি ও কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারী জড়িত ছিলেন বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও অভিযান চলছে। চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

এসআরবির এই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাঁরা জানতে পেরেছেন, বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের একইভাবে রাশিয়ার যুদ্ধে যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুরের বাসিন্দারাও রয়েছেন।

তিনি বলেন, ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাঁদের কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলেন। এখন স্বজনের মৃত্যুর খবর পেলেও পরিবারের অনেকেই মরদেহ দেখতে বা দেশে ফিরিয়ে আনতে পারছেন না।

বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পাশাপাশি যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও চাকরির প্রস্তাবের সত্যতা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন এসআরবির এই কর্মকর্তা।

Advertisement
Advertisement

আরো পড়ুন