জামায়াত
সরাসরি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন, তবে বিভিন্নভাবে দলটিকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে থাকেন—এমন ব্যক্তিদের নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। নীতিগত বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও এই পরিষদের সদস্যদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জামায়াতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এ আলোচনা আরও গতি পায়। গত জুনে দলের সর্বশেষ মজলিশে শুরার বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে পরিষদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা, প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য কার্যক্রম সম্পর্কে প্রাথমিক আলোচনা করা হয়। তবে এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
দলীয় সূত্র বলছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও কিছু সময় নিয়ে আলোচনা করতে চায় জামায়াত। কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ও মজলিশে শুরার পরবর্তী বৈঠকে উপদেষ্টা পরিষদের কাঠামো ও নীতিগত বিষয়গুলো বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হতে পারে। এরপরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলেন, উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী শুরার বৈঠকে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পরবর্তী মজলিশে শুরার বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার দলের আমির শফিকুর রহমানের। তিনি বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে রাখলে শুরার বৈঠকে তা নিয়ে আলোচনা হবে। পরে শুরার সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত হলে দলের গঠনতন্ত্রে এ-সংক্রান্ত আলাদা ধারা বা উপধারা যুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে পরিষদটির সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করা হবে। পরবর্তী সময়ে গঠনতন্ত্রের মুদ্রিত সংস্করণেও নতুন বিধানটি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
জামায়াত নেতারা বলছেন, উপদেষ্টা পরিষদ গঠন এবং এ জন্য গঠনতন্ত্র সংশোধনের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করতে চায় না দলটি। পরিষদ গঠনের উদ্দেশ্য, সদস্য নির্বাচন, দায়িত্ব ও দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক—সবকিছু বিস্তারিত পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অনুমোদন মিললে পরিষদের সদস্যসংখ্যা, সদস্য বাছাইয়ের পদ্ধতি ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হবে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের একজন নেতা বলেন, উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিষয়ে দলটি তাড়াহুড়া করতে চায় না। এ কারণে বিষয়টি আপাতত অপেক্ষমাণ রয়েছে। পরবর্তী নির্বাহী পরিষদ ও মজলিশে শুরার বৈঠকে পরিষদের সম্ভাব্য কাঠামো এবং কারা এতে থাকতে পারেন, তা নিয়ে আলোচনা হবে। এরপর দলের আমির সার্বিক দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।
কারা থাকতে পারেন উপদেষ্টা পরিষদে
জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, রুকন বা শপথধারী কর্মী হওয়ার মধ্য দিয়ে দলটির রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হতে হয়। এরপর নির্দিষ্ট সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দায়িত্বশীল পদ ও নেতৃত্বে আসার সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ, দলের প্রতি সমর্থন থাকলেই সরাসরি সাংগঠনিক নেতৃত্বে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই।
জামায়াত নেতাদের ভাষ্য, এই সাংগঠনিক কাঠামোর কারণে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা দলটির রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও পরামর্শ দলীয় নীতিনির্ধারণে কাজে লাগানোর জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে তুলনামূলক বয়োজ্যেষ্ঠ ও নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের এ পরিষদে যুক্ত করার চিন্তা করছে দলটি। তাঁরা সরাসরি সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করবেন না; বরং বিভিন্ন নীতিগত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জামায়াতকে পরামর্শ দেবেন।
জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সাবেক আমলা, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, কূটনীতি বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং বিভিন্ন পেশার বিশেষজ্ঞদের এ পরিষদে রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি দলের শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্য থেকেও সদস্য নেওয়া হতে পারে। এমনকি অন্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্য থেকেও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য রাখার একটি প্রস্তাব রয়েছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের একজন নেতা বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা সাংগঠনিক পদ্ধতির কারণে জামায়াতে যুক্ত হতে পারেন না। তাঁদের উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। তাঁরা সংগঠন পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেবেন। ভবিষ্যতে জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রেও তাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
ওই নেতা আরও বলেন, জামায়াতের লক্ষ্য হলো সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগানো। দলের প্রয়োজনে যেকোনো পেশার মানুষকে এ পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
গঠনতন্ত্র সংশোধনের উদ্যোগ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো আরও কার্যকর করতে উদ্যোগ নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এর অংশ হিসেবে দলের গঠনতন্ত্রে বেশ কিছু সংশোধনী আনার প্রক্রিয়া চলছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ মজলিশে শুরার বৈঠকে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পাশাপাশি গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন ধারা সংশোধনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর মধ্যে রয়েছে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক ধারা পরিমার্জন করা।
জামায়াত সূত্র জানায়, নির্ধারিত সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশোধনীর প্রস্তাবগুলো প্রথমে সংশোধনী কমিটি, এরপর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ এবং সবশেষে মজলিশে শুরায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেলে সংশোধিত বিষয়গুলো দলের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।



.png)
.png)