ঢাকা,  বুধবার
১৪ অক্টোবর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

দুই অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তহবিল সংগ্রহ ও উসকানির অভিযোগ, রয়েছে গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ

প্রকাশিত: ১০:১৩, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১০:২০, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

দুই অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তহবিল সংগ্রহ ও উসকানির অভিযোগ, রয়েছে গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের পর তাঁদের বিরুদ্ধে দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ, উসকানিমূলক প্রচার এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ এনেছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন তাঁরা। এসব তৎপরতার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পাল (৪৭) ও লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরা (৪৩)। রোববার দিবাগত রাতে রাজধানীর পল্লবী ও বনানী ডিওএইচএস এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

অভিযান-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য, মামলার এজাহার ও আদালতে দেওয়া রিমান্ড আবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী প্রচার, অর্থায়ন, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং সংগঠিত তৎপরতার অভিযোগ আনা হয়েছে।

সোমবার বিকেলে তাঁদের আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলম তাঁদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন। তাঁদের দাবি, তাঁরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে তৎপরতা চালাচ্ছিলেন এবং দেশি-বিদেশি কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন, যাঁদের পুলিশ ‘গুপ্তচর’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁদের গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় করা মামলায় তাঁদের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১০১ জনকে আসামি করা হয়েছে।

দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ঘিরে তদন্ত

ডিবির সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, গ্রেপ্তার দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাপোর্টার্স আলফা নম্বর # ১’ এবং ‘বিবিএম ট্রান্সপারেন্সি’ নামের দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

পুলিশের অভিযোগ, এসব গ্রুপের মাধ্যমে দেবাশীষ ও গুলশান আরা সরকারবিরোধী তৎপরতার জন্য তহবিল সংগ্রহ করতেন। পাশাপাশি সহিংসতায় উসকানি দিতে পারে—এমন ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হতো।

এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ইউনিটি কেয়ার’ ও ‘পাবলিক পার্লামেন্ট’ নামের দুটি প্ল্যাটফর্মের কথাও তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছিল। পুলিশের অভিযোগ, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন এবং সংগঠিত তৎপরতা পরিচালনার উদ্দেশ্যে এসব যোগাযোগ ব্যবহার করা হচ্ছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো জানা যায়নি।

ফেসবুক পেজে প্রচারের অভিযোগ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানোর অভিযোগও দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, ‘কালআজকাল.কম’ নামের একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতায় উসকানি দেওয়ার মতো কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা হচ্ছিল।

এ ছাড়া কাজী গুলশান আরার নামে থাকা একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা উল্লেখ করে সেখান থেকেও রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।

পুলিশের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গ্রেপ্তার দুই কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা সরকার এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক ও কুৎসামূলক প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। তাঁদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তির যোগাযোগ থাকার অভিযোগও করা হয়েছে।

২০১৮ সালে গণভবনে যাওয়ার প্রসঙ্গ

দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তার অতীত রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রসঙ্গে রিমান্ড আবেদনে ২০১৮ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ করেছে পুলিশ। আবেদনে বলা হয়, ওই বছরের ২৭ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচনের আগে দেড় শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি একাত্মতা ও আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন কাজী গুলশান আরা।

সে সময় অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের গণভবনে গিয়ে শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন জানানোর ঘটনা সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল।

পুলিশের দাবি, পরবর্তী সময়ে ১০১ জন সহযোগীকে নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ’ নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছে।

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, সংগঠনটির মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন টক শোতে অংশ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অবজ্ঞা প্রকাশের অভিযোগও রয়েছে।

মামলায় ১০১ জন অজ্ঞাতনামা আসামি

পল্লবী থানায় করা মামলাটির বাদী ডিবির পল্লবী জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক মো. আলী আকবর। এতে দণ্ডবিধি, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

আদালতে দেওয়া রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা পাঁচটি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো—সহযোগী আসামিদের পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত করা, রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কাজে জড়িত বলে সন্দেহ করা দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত অন্যান্য ওয়েবসাইট ও পেজ শনাক্ত করা এবং মামলার মূল ঘটনা উদ্‌ঘাটন করা।

এ ছাড়া অবৈধ অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানের কথাও বলা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং অন্য কারা জড়িত, তা যাচাই করতে দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

আদালতে অভিযোগ অস্বীকার আসামিপক্ষের

রিমান্ড শুনানিতে পুলিশের অভিযোগের বিরোধিতা করেন দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তার আইনজীবীরা। তাঁরা অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

কাজী গুলশান আরার আইনজীবী মোহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, একটি টক শোতে অংশ নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছেন বলে তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু টক শোতে তিনি কী বক্তব্য দিয়েছেন, যার কারণে দেশ অস্থিতিশীল হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তা রিমান্ড আবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কী তথ্য পাওয়া গেছে, সেটিও উল্লেখ নেই বলে দাবি করেন এই আইনজীবী।

অন্যদিকে দেবাশীষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মনসুর বলেন, তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হলেও কী কারণে এ অভিযোগ করা হয়েছে এবং তাঁর অপরাধ কী, সে বিষয়ে রিমান্ড আবেদনে ব্যাখ্যা নেই বলে তিনি দাবি করেন।

তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ বলেন, আসামিরা দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে পতিত সরকারের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন। তাঁদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি গুপ্তচরদেরও যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এ বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যাবে।

পুলিশের অভিযোগের বিপরীতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ঘাটতির কথা তুলে ধরেছেন। এখন রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের মাধ্যমে এসব অভিযোগের সত্যতা এবং অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে।

Advertisement
Advertisement