ঢাকা,  বুধবার
১৪ অক্টোবর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

একক প্রার্থীর চ্যালেঞ্জে বিএনপি, ইসিতে আশ্বস্ত নয় জামায়াত

প্রকাশিত: ১৬:৩৩, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

একক প্রার্থীর চ্যালেঞ্জে বিএনপি, ইসিতে আশ্বস্ত নয় জামায়াত

ইউপি নির্বাচন

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে ২৭ মে পর্যন্ত পাঁচ ধাপে দেশের প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদে ভোট গ্রহণ করা হবে। তবে ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ক্ষমতাসীন বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় পর্যায়ের কোন্দল সামলে চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী বাছাই করা।

সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সভাকক্ষে ইসির ১৩তম কমিশন সভায় নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হয়। পরে ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ নির্বাচনের রোডম্যাপ তুলে ধরেন।

চূড়ান্ত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২৯ এপ্রিল, ১৩ মে ও ২৭ মে পাঁচ ধাপে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ জানান, আনুমানিক ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। আইন অনুযায়ী, এসব পরিষদের নির্বাচন ২০২৭ সালের ২৭ মের মধ্যে শেষ করা হবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের এই সময়সূচি নিয়ে বিএনপি কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে এর আগে নভেম্বর থেকে নির্বাচন শুরুর ঘোষণা দিয়েও সরকারের প্রতিক্রিয়ার পর ইসি পিছু হটেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবারও ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী।

দলটির নেতাদের আশঙ্কা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংঘাতের কারণে ক্ষমতাসীন বিএনপি নির্বাচন পেছাতে চাইতে পারে। তবে জামায়াত নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। এনসিপিও দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

কমিশন সভায় চূড়ান্ত সময়সূচি

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় অন্য চার নির্বাচন কমিশনার, ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।

ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ১৩ সেপ্টেম্বরের প্রাক্‌-প্রস্তুতিমূলক সভায় সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের কথা ভাবা হয়েছিল। তবে সময়ের স্বল্পতার কারণে তা কমিয়ে পাঁচ ধাপে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তিনি জানান, প্রতিটি ধাপের নির্বাচনের আগে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা তপশিল ঘোষণা করবেন। সাধারণত ৪২ থেকে ৪৫ দিন সময় দিয়ে তপশিল ঘোষণা করা হয়। প্রথম ধাপে সব জেলাতেই নির্বাচন শুরু হবে। এ ক্ষেত্রে সদর উপজেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যেসব ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলোকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সানাউল্লাহ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সঙ্গে পৃথক সভা করা হবে। এর আগে অনুষ্ঠিত সভায় সব বাহিনীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা জানিয়েছিলেন, নভেম্বরের মধ্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শেষ করবেন।

নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের বাকি কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চলবে। ভালো নির্বাচনের যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে কমিশন।

এর আগে ১৩ সেপ্টেম্বর ইসির প্রাক্‌-প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের খসড়া সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন প্রথম ধাপে ১২ নভেম্বর দেশের ৮০টি উপজেলার সব ইউনিয়ন পরিষদে ভোট গ্রহণের কথা জানানো হয়।

কিন্তু পরদিনই মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীরা জানান, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার কিছু জানে না এবং এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনাও হয়নি। স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি ইসির একক এখতিয়ার নয় বলেও দাবি করেন তাঁরা। পরে ইসির পক্ষ থেকে বলা হয়, নভেম্বরের নির্বাচনের তারিখ ছিল প্রাথমিক।

এ নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে দূরত্ব ও টানাপোড়েন প্রকাশ্যে আসে। ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর ইসি জানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ও বিভিন্ন পরীক্ষার কারণে নভেম্বরে নির্বাচন শুরু করা সম্ভব নয়। পরীক্ষা ছাড়াও রোজা, ঈদ ও পূজার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী কমিশন সভায় নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ে শঙ্কা

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গত রোববারের সভায়ও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সভা শেষে কমিটির সভাপতি এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব বলেন, নির্বাচন পরিচালনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। বাহিনীকে প্রস্তুতির সময় দিয়ে তপশিল ঘোষণা করা উচিত।

তাঁর পাশে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সভাপতির বক্তব্যে আপত্তি করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, ওই সভায় বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন। স্থায়ী কমিটির এই সদস্যের ভাষ্য, জামায়াত আগেও দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে, এখনো জানাচ্ছে।

স্থানীয় কোন্দল সামলানো বিএনপির চ্যালেঞ্জ

ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে বিএনপির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন বলয়ে বিভক্তি থাকায় প্রার্থী বাছাইয়ে সংকট তৈরি হতে পারে। দলটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কোন্দল সামলে চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী নির্ধারণ করা।

গত রোববার রাতে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে নেতাদের সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এবং এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা যাবে না, যাতে সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। দলীয় সংসদ সদস্যদের দল-সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে থাকার নির্দেশনাও দেন তিনি।

তৃণমূল নেতাদের দিকনির্দেশনা দিতে বিভাগীয় ও বড় জেলার নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন তারেক রহমান। এসব বৈঠকে একক প্রার্থী বাছাইয়ের পাশাপাশি ত্যাগী, যোগ্য ও জনপ্রিয় নেতাদের গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ৭৮টি আসনে বিএনপির নেতারা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। তাঁদের সবাইকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এসব নেতা ও মনোনয়ন না পাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের বিরোধ অনেক এলাকায় দলীয় কোন্দল ও বিভক্তি বাড়িয়েছে।

তারেক রহমান সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে স্পষ্ট করেছেন, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও প্রার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত সামষ্টিক হতে হবে। নির্বাচনে একক প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। কেন্দ্র থেকেও স্থানীয় নেতাদের যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হচ্ছে।

সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে উপজেলা নেতাদের। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাই করবেন জেলার নেতারা।

বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত বলেন, দলের চেয়ারম্যান সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দিয়েছেন। সাংগঠনিক অবস্থান ভালো এবং অতীতের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা ছিল—এমন গ্রহণযোগ্য নেতাদের চেয়ারম্যান পদে দলীয় সমর্থন দেওয়া হবে। জেলা ও উপজেলার দায়িত্বশীল নেতারা একক প্রার্থী ঠিক করবেন। বিভাগীয় সাংগঠনিক নেতারা সমন্বয় করবেন এবং প্রয়োজনে কেন্দ্র হস্তক্ষেপ করবে।

জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করবে না। শুধু সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

নির্বাচন নিয়ে শঙ্কায় জামায়াত, প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিপি

ইউপি নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, দলের সব প্রস্তুতি রয়েছে। কিন্তু নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। মন্ত্রীরা না চাইলে ইসি আবারও নির্বাচনের সময় পিছিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।

নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, কমিশন আজ্ঞাবহ ও মেরুদণ্ডহীন। সংসদ নির্বাচনে এর প্রমাণ দেখা গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে জামায়াতের এই নেতা বলেন, স্থায়ী কমিটির সভাপতি যখন বলছেন বাহিনী প্রস্তুত নয়, তখন নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজনে সহায়তার প্রস্তুতি না থাকলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কীভাবে পদে থাকেন—সেই প্রশ্নও ওঠে।

হামিদুর রহমান আযাদের দাবি, পরাজয়ের আশঙ্কায় বিএনপি নির্বাচন পেছাতে চাইছে। দলটির বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় কোন্দল রয়েছে। নির্বাচন হলে ব্যাপক সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে নির্বাচন হলেও জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে, এনসিপি এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত রোববার দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। পর্ষদ সদস্য সালেদ উদ্দিন সিফাত জানান, এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। শিগগিরই দল-সমর্থিত প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু হবে।

জামায়াতের ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, ইউপি নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে জোটগত অংশগ্রহণের পরিকল্পনা নেই। তবে স্থানীয় পর্যায়ে শরিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হলে তা হতে পারে।

Advertisement
Advertisement

আরো পড়ুন