মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স পাঠাতে খরচ বেশি, সবচেয়ে কম যুক্তরাষ্ট্রে
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও বাড়ছে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। দেশের মোট রেমিট্যান্সের ৮৫ শতাংশের বেশি আসছে মাত্র ১০টি দেশ থেকে। তবে এসব দেশের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান ও কাতার থেকে অর্থ পাঠাতে খরচ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম খরচে রেমিট্যান্স পাঠানো যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালি থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, রেমিট্যান্সের পরিমাণ যত কম, অর্থ পাঠানোর খরচের হার তত বেশি।
প্রথমবারের মতো রেমিট্যান্স আহরণের শীর্ষ ১০ দেশ থেকে অর্থ পাঠানোর খরচের তুলনামূলক তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে রেমিট্যান্স পাঠানোর গড় খরচ ছিল ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৮২ শতাংশে।
অর্থ পাঠানোর পরিমাণ অনুযায়ী খরচের হারেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। ২০০ ডলার পর্যন্ত পাঠাতে জানুয়ারি-মার্চ সময়ে গড়ে খরচ হয়েছে ২ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এপ্রিল-জুন সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৯৪ শতাংশে। ২০১ থেকে ৫০০ ডলার পাঠানোর ক্ষেত্রে খরচ ০ দশমিক ৯৬ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ০ দশমিক ৯৪ শতাংশ হয়েছে। তবে ৫০০ ডলারের বেশি পাঠানোর ক্ষেত্রে খরচ ০ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ০ দশমিক ৫০ শতাংশ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া তুলনামূলক জটিল ও ব্যয়বহুল। কম আয়ের শ্রমিকদের জন্য এসব দেশে ব্যাংক হিসাব খোলাও কঠিন। ফলে আগে থেকেই এসব দেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বেশি ছিল। এর মধ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ায় অর্থ পাঠানোর খরচ আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে মোট ৮৫৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ দেশ থেকে এসেছে ৭৩২ কোটি ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের ৮৫ দশমিক ২২ শতাংশ।
দেশভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে সৌদি আরব থেকে। প্রথম তিন মাসে দেশটি থেকে এসেছে ১৬৫ কোটি ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্য থেকে এসেছে ১২২ কোটি ডলার। তৃতীয় অবস্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে ৭৮ কোটি ৭৪ লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ৭৭ কোটি ৪৯ লাখ ডলার এবং মালয়েশিয়া থেকে ৬৬ কোটি ৬৭ লাখ ডলার।
এ ছাড়া ইতালি থেকে ৬০ কোটি ২২ লাখ, কুয়েত থেকে ৪৪ কোটি ১৮ লাখ, সিঙ্গাপুর থেকে ৪১ কোটি ৮১ লাখ, ওমান থেকে ৪১ কোটি ২৩ লাখ এবং কাতার থেকে ৩৬ কোটি ২৫ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
দেশভেদে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ২০০ ডলার পর্যন্ত রেমিট্যান্স পাঠাতে সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছে ওমান থেকে। দেশটি থেকে অর্থ পাঠাতে গড়ে ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ ব্যয় করতে হয়েছে প্রবাসীদের। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ খরচ হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। কাতার থেকে গড়ে ৫ দশমিক ১১ শতাংশ, কুয়েত থেকে ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং সৌদি আরব থেকে ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ খরচ হয়েছে।
অন্যদিকে মালয়েশিয়া থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত পাঠাতে গড়ে খরচ হয়েছে ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। যুক্তরাজ্য থেকে ২ দশমিক ১০ শতাংশ, সিঙ্গাপুর থেকে ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ইতালি থেকে ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সবচেয়ে কম ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ খরচ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
কেন মধ্যপ্রাচ্যে খরচ বেশি?
ব্যাংকারদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ও মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বেশি হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এসব দেশে কর্মরত অনেক শ্রমিকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কারিগরি দক্ষতা তুলনামূলক কম। কম আয়ের শ্রমিকদের জন্য ব্যাংক হিসাব খোলার প্রক্রিয়াও অনেক ক্ষেত্রে জটিল। ফলে তাঁদের নগদ অর্থ নিয়ে সরাসরি এক্সচেঞ্জ হাউস, ব্যাংক কিংবা মানি ট্রান্সফার এজেন্সিতে যেতে হয়।
এসব প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থ গ্রহণ, কাগজপত্র যাচাই এবং ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় বাড়তি খরচ হয়। সেই ব্যয় মেটাতে গ্রাহকদের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়।
এ ছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবা বা ফিনটেক অ্যাপের ব্যবহার ও প্রবেশাধিকার সীমিত। ফলে অর্থ স্থানান্তরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতাও কম। অন্যদিকে এক্সচেঞ্জ হাউস চালু করতে দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নিয়ম, বিপুল অঙ্কের মূলধন এবং নানা আইনি জটিলতা পেরিয়ে লাইসেন্স নিতে হয়।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্সের উৎস সৌদি আরবে এক্সচেঞ্জ হাউস খোলার অনুমোদন না থাকাও অর্থ পাঠানোর খরচ বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স এলেও তা দেশে পাঠাতে প্রবাসীদের তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।



.png)
.png)