ইশরাক হোসেন
রাজধানীর গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন দয়াগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ও তাঁর সহযোগীদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা তদন্ত করছে পুলিশ। এ ঘটনায় আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে আইন লঙ্ঘনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম। প্রতিমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে অস্ত্র তাক করতে দেখা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওয়ারী বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারকে ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে আইনের ব্যত্যয়ের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শনিবার বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অভিযানের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ভিডিওটির শিরোনাম ছিল, ‘ইশরাকের অ্যাকশন: মাদক আস্তানা গুঁড়িয়ে বিক্রেতাদের পুলিশে সোপর্দ’। ভিডিওটি প্রকাশের পর আইন মেনে অস্ত্র ব্যবহার এবং প্রতিমন্ত্রীর এ ধরনের অভিযানে সরাসরি অংশগ্রহণ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইনজ্ঞরাও।
ভিডিওতে দেখা যায়, হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গাড়ি থেকে নামছেন ইশরাক হোসেন। এরপর তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা রেললাইনের পাশে অবস্থান করা কয়েকজনকে আটক করতে এগিয়ে যান। এ সময় কয়েকজন যুবককে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার, আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ স্যার।’ জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পুলিশ আসবে, তারপর কথা হবে।’
অভিযানের সময় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর নিয়োগ দেওয়া দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলু এবং একজন সরকারি দেহরক্ষী ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের কাছেও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। ভিডিওতে সরকারি দেহরক্ষীকে অস্ত্র তাক করতে দেখা যায়।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার রেললাইন-সংলগ্ন একটি বস্তিতে মাদকের আস্তানায় আকস্মিক অভিযান চালান প্রতিমন্ত্রী। এ সময় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগেও নিজের নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন স্থানে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েছেন ইশরাক হোসেন।
গেণ্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান মনির সংবাদমাধ্যমকে বলেন, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ছয়জনকে আটক করে থানায় ফোন দেন। পরে থানা থেকে পুলিশ সদস্যরা গিয়ে তাঁদের নিয়ে আসেন। আটক ব্যক্তিদের কাছে সাদা পাউডারজাতীয় পদার্থ পাওয়া গেছে। সেগুলো হেরোইন কি না, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় প্রতিমন্ত্রীর হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটির বৈধতা এবং বৈধ অস্ত্র হলেও প্রকাশ্যে এভাবে তা প্রদর্শন করা আইনসম্মত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইনজ্ঞদের মতে, একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নির্বাহী বিভাগের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও নীতিনির্ধারক হলেও মাঠপর্যায়ে সরাসরি পুলিশি অভিযান পরিচালনা কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা সংবিধান বা ফৌজদারি কার্যবিধিতে দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০১৬’ অনুযায়ী, বৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে কাউকে ভয়ভীতি দেখানো, প্রদর্শনীবাজি করা বা হয়রানি করা নিষিদ্ধ। আইনজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধী ধরার বা আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত অস্ত্র প্রকাশ্যে উঁচিয়ে অভিযান পরিচালনার বিষয়টিও এ নীতিমালার আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে প্রতিমন্ত্রীর ব্যবহৃত অস্ত্রটির লাইসেন্সের বৈধতা এবং অভিযানের সময় অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তদন্তের ফলাফল এখনো জানা যায়নি। পুলিশের তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।



.png)
.png)