বিশ্বব্যাক
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। দুর্বল হয়ে পড়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কমছে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা।
অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারসহ বিভিন্ন খাতে সরকার বড় অঙ্কের ভর্তুকি ও সহায়তা দিলেও এর উল্লেখযোগ্য অংশ দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে অনেক সচ্ছল পরিবার সুবিধা পেলেও দরিদ্রতম বহু পরিবার সামাজিক সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে দেশের অর্থনীতির এমন চিত্র উঠে এসেছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’।
প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সুশাসন নিশ্চিত করা এবং কর-রাজস্ব বাড়ানোকে সংস্কারের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। পরের দুই অর্থবছরে তা কমে যথাক্রমে ৪ দশমিক ২ ও ৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়।
গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ২ দশমিক ২ শতাংশে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে এটিই সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি।
প্রবৃদ্ধির গতি কমার অন্যতম বড় কারণ বিনিয়োগে সংকোচন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নও ঐতিহাসিকভাবে নিচু পর্যায়ে নেমেছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্প পর্যালোচনা, নতুন প্রকল্প অনুমোদনে সতর্কতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার দুর্বলতার কারণে উন্নয়ন ব্যয় কমেছে।
শিল্প ও কর্মসংস্থানে চাপ
২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। তবে তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে শিল্প খাতের এটিই প্রথম সংকোচন।
গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রেখেছে কিংবা কর্মী ছাঁটাই করেছে।
বাংলাদেশ ২০১৭ সাল পর্যন্ত গ্যাসে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। এখন মোট চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে। কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্র ও মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে কোনো একটি স্থাপনায় সমস্যা দেখা দিলে বড় এলাকায় গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
অর্থনীতির ধীরগতির প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারেও। শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারানো নারীদের অনেকে শ্রমবাজার থেকে বেরিয়ে গেছেন। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে।
তবে ২০২৫ সালের পর নতুন শ্রমশক্তি জরিপ না থাকায় সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
মূল্যস্ফীতি কমলেও চাপ রয়ে গেছে
২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। গত আগস্টে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার সমস্যা এবং মুদ্রা সরবরাহের প্রবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি এখনো উঁচু পর্যায়ে রয়েছে। খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।
কম আয়ের শ্রমিকদের মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল রাখতে পারেনি। ফলে আগস্টে তাঁদের প্রকৃত মজুরি আবারও ঋণাত্মক হয়ে যায়।
বিশ্বব্যাংকের মতে, সরকারের ব্যাংকঋণ, ভর্তুকি ও সুদসহ চলতি ব্যয়, প্রবাসী আয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার কারণে অর্থ সরবরাহ বেড়েছে। কিন্তু বেসরকারি ঋণ ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়েনি। ফলে অর্থ সরবরাহের প্রবৃদ্ধি উৎপাদনের তুলনায় দামের ওপর বেশি চাপ তৈরি করতে পারে।
এক বছরে নতুন করে দরিদ্র ২১ লাখ মানুষ
বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমায় দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে এই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে।
জাতীয় দারিদ্র্যসীমাতেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। টানা চতুর্থ বছরের মতো দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। ২০২২ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে।
একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।
ব্যাংক খাতে বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকিগুলোর একটি হিসেবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। ইসলামি ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ।
ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। অথচ নিয়ন্ত্রক ন্যূনতম হার ১০ শতাংশ।
প্রভিশন সংরক্ষণের নিয়ম শিথিল করায় ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ প্রভিশন রাখতে হয়নি। এতে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক দুর্বলতা পুরোপুরি প্রকাশ পাচ্ছে না বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা ২০২৬ সালের জুনে ৭৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ছয়টি ইসলামি ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনা শেষ হলেও অন্য ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি ধীর।
ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ও আমানত সুরক্ষা আইন পাস করাকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছে বিশ্বব্যাংক। তবে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বারবার ছাড় ও তারল্য সহায়তা দেওয়ায় প্রকৃত লোকসান শনাক্ত ও সমাধানের প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি
বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩০ জুলাই নীতি সুদহার ০ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। ছয় বছরের মধ্যে এটিই প্রথম নীতি সুদহার কমানোর ঘটনা।
তবে ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রবৃদ্ধি জুনে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ।
গত ২৯ জুন ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা অর্থায়ন ছাড়া অন্যান্য ঋণে আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এভাবে সুদের ব্যবধান বেঁধে দিলে ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসার ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে। এতে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বড় প্রতিষ্ঠান বা সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হতে পারে। এর ফলে ব্যাংকের মুনাফা ও মূলধন পুনর্গঠনের সক্ষমতাও কমতে পারে।
রেমিট্যান্সে স্বস্তি, রপ্তানি ও বিনিয়োগে দুর্বলতা
২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে একই সময়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
গত অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি ০ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে আমদানি ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৭১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের বাজারেও বাংলাদেশের চাপ বেড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি ৭ দশমিক ১ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া থেকে পোশাক আমদানি বেড়েছে।
নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ১৫ শতাংশ কমে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা জিডিপির মাত্র ০ দশমিক ৩ শতাংশ। বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা বাড়লেও নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ কমেছে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ।
রাজস্ব কম, বাড়ছে সরকারের চলতি ব্যয়
২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ কর আদায় করেছে। মোট রাজস্ব জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। এর মধ্যে কর-রাজস্ব প্রায় ৭ শতাংশ।
সীমিত করভিত্তি, কর ফাঁকি, দুর্বল প্রশাসন ও অতিরিক্ত করছাড়কে রাজস্ব বৃদ্ধির বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনকে আলাদা করার উদ্যোগও কার্যকর হয়নি।
অন্যদিকে সরকারের মোট ব্যয় জিডিপির ১১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। চলতি ব্যয় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও মূলধনি ব্যয় ২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
নতুন সরকারি বেতনকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে মূল বেতন ও ভাতা গড়ে প্রায় ১২০ শতাংশ এবং পেনশন প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় জিডিপির প্রায় ০ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে।
সরকারের অর্থায়নের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যাংক থেকে
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট-ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে।
অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সরকারের মোট অর্থায়নের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে। আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের মতে, সরকার বেশি ব্যাংকঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমতে পারে। এর ফলে ঋণের সুদহার উঁচু থাকতে পারে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সরকারি ঋণও জিডিপির ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। সুদ পরিশোধের ব্যয় পৌঁছেছে জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশে।
আগামী দুই বছরও দুর্বল থাকতে পারে প্রবৃদ্ধি
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে। এটি গত ১০ বছরের গড় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম।
২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।
আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। তবে দ্রুত দারিদ্র্য কমানোর জন্য এই কর্মসংস্থান যথেষ্ট হবে না বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। পরের অর্থবছরে তা সামান্য কমে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে।
একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ৮ দশমিক ৬ ও ৭ দশমিক ১ শতাংশ থাকতে পারে।
তিন খাতে সংস্কারের তাগিদ
অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে তিনটি ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
প্রথমত, ব্যাংক খাত। সম্পদের মান পর্যালোচনা দ্রুত শেষ করে কোন ব্যাংক টিকে থাকার সক্ষমতা রাখে, তা নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের মালিক, বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য অংশীজনকে লোকসানের দায় বহনের সুযোগ তৈরি এবং নিয়ন্ত্রক ছাড় ধীরে ধীরে তুলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানি খাত। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও এলএনজি অবকাঠামো বাড়ানো, বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা উন্নত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ কেনাকাটা ও প্রকল্প গ্রহণে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয়ত, রাজস্ব খাত। করনীতি ও কর প্রশাসনকে আলাদা করা, সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে কর ফাঁকি শনাক্ত করা এবং অকার্যকর করছাড় পর্যায়ক্রমে কমানোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে একাধিক চাপের চিত্র উঠে এসেছে—কম প্রবৃদ্ধি, দুর্বল বিনিয়োগ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তে থাকা দারিদ্র্য, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।



.png)
.png)