ঢাকা,  বুধবার
০৭ অক্টোবর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

বন্ধুত্ব থেকে রাজনৈতিক বৈরিতা, নওয়াজ-ইমরানের সম্পর্কের গল্প

প্রকাশিত: ১৮:০৬, ৬ অক্টোবর ২০২৬

বন্ধুত্ব থেকে রাজনৈতিক বৈরিতা, নওয়াজ-ইমরানের সম্পর্কের গল্প

ইমরান খান ও নওয়াজ শরীফ

১৯৯২ সাল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ তখন দেশটির বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেট দলের সম্মানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন সদ্য বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খান।

অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ার ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক নওয়াজ শরীফকে প্রশ্ন করেন, ‘এই তরুণ ছেলেটিকে নিয়ে কি আপনি গর্বিত?’

প্রধানমন্ত্রীর জবাব ছিল, ‘অবশ্যই, তিনি অসাধারণ কাজ করেছেন।’

এরপর সাংবাদিক জানতে চান, ইমরান খান যদি রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তাকে নিজের সঙ্গে রাখবেন কি না। প্রশ্ন শুনে অনুষ্ঠানে হাসির রোল পড়ে। তবে নওয়াজ শরীফ ছিলেন গম্ভীর। ইমরান খানের কাঁধে হাত রেখে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক আগেই তাকে এ প্রস্তাব দিয়েছিলাম, কিন্তু সে তা প্রত্যাখ্যান করেছিল।’

তখন নওয়াজ শরীফের বয়স ৪৩ আর ইমরান খানের ৪০। দুজনই নিজেদের পেশাগত জীবনের শীর্ষে। সম্ভবত তখন তারা কেউই ভাবেননি, একদিন পাকিস্তানের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে তারা তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হবেন।

ক্রিকেটই ছিল পরিচয়ের সূত্র

নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খান—দুজনের জন্মই লাহোরের সচ্ছল পরিবারে। নওয়াজ এসেছেন ব্যবসায়ী পরিবার থেকে, আর ইমরান খান বেড়ে উঠেছেন জামান পার্কে; তার বাবা ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। রাজনীতির প্রতি শুরুতে কারও তেমন আগ্রহ ছিল না। দুজনের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম সূত্র ছিল ক্রিকেট।

ইমরান খান ১৯৭১ সালেই পাকিস্তানের টেস্ট দলে জায়গা করে নেন। অন্যদিকে নওয়াজ শরীফের ক্রিকেট ক্যারিয়ার ছিল সীমিত। তবে ক্রিকেটের প্রতি তার আগ্রহ ছিল প্রবল।

লাহোর জিমখানা ক্রিকেট ক্লাবের সাবেক সম্পাদক ও ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটার জামিল রানা জানান, নওয়াজ ও তার ভাই শাহবাজ শরীফকে জিমখানা ক্লাবের সদস্য করার ক্ষেত্রেও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। নওয়াজ নিজেও ইত্তেফাক ক্রিকেট ক্লাব নামে একটি দল গড়েছিলেন। সেখানে সে সময় অনেক নামী ক্রিকেটার খেলতেন।

জিমখানায় ইমরান-নওয়াজের প্রথম পরিচয়

১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে লাহোর জিমখানা ক্লাবে ইমরান খান ও নওয়াজ শরীফের পরিচয় হয়। ইমরান তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তখন নওয়াজকে তার কাছে রাজনীতির চেয়ে ক্রিকেটে বেশি আগ্রহী একজন সাধারণ মানুষ মনে হয়েছিল। এমনকি তার ধারণা ছিল, নওয়াজের স্বপ্ন ছিল পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হওয়া।

তবে প্রথম দিকে তাদের সম্পর্ক খুব একটা ঘনিষ্ঠ ছিল না। বরং ইমরান খানের দ্রুতগতির বোলিংয়ে নওয়াজ শরীফকে প্রায়ই বিপাকে পড়তে হতো। সাবেক ক্রিকেটার পি জে মীরের ভাষ্য অনুযায়ী, ইমরান প্রায়ই নওয়াজকে বাউন্সার দিতেন। পরে অবশ্য ক্রিকেটের সূত্র ধরেই দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়।

একজন অধিনায়ক, অন্যজন মুখ্যমন্ত্রী

১৯৮২ সালে ইমরান খান পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হন। এর আগে ১৯৮১ সালে পাঞ্জাবের অর্থমন্ত্রী হওয়া নওয়াজ শরীফ ১৯৮৫ সালে প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী হন।

রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পরও ক্রিকেটের প্রতি নওয়াজের আগ্রহ কমেনি। তিনি নিয়মিত জিমখানায় ক্রিকেট খেলতেন এবং দুটি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচেও অংশ নেন।

১৯৮৭ সালে এমনই এক ম্যাচে ইমরান খানকে রীতিমতো চমকে দিয়েছিলেন নওয়াজ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচে নওয়াজ শুধু মাঠে উপস্থিতই হননি, ক্রিকেট কিট পরে টস করতেও নেমেছিলেন। টসে জিতে তিনি মুদাস্সির নাজারের সঙ্গে ওপেন করার সিদ্ধান্ত নেন।

ইমরান খান তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভয়ংকর ফাস্ট বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে নওয়াজকে ব্যাট করতে দেখে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য নওয়াজ দ্বিতীয় বলেই বোল্ড হয়ে যান।

বিশ্বকাপজয়ে নওয়াজের ভূমিকা কতটা?

১৯৮৮ সালে নওয়াজ শরীফ আবার পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হন। ১৯৯০ সালে তিনি প্রথমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। একই সময়ে ইমরান খানের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য—১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়।

জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিক কামার আহমেদের দাবি, বিশ্বকাপের আগে ফিটনেস সমস্যার কারণে জাভেদ মিয়াঁদাদকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরে নওয়াজ শরীফ বিষয়টি জানতে পেরে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মিয়াঁদাদকে দলে ফেরানোর কথা বলেন।

তবে মিয়াঁদাদ নিজে বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। তিনি শুধু জানান, ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরই তিনি দলে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। ফলে বিশ্বকাপ দলে তার অন্তর্ভুক্তিতে নওয়াজের ভূমিকা ছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়।

শওকত খানম হাসপাতালেও নওয়াজের সহায়তা

ইমরান খানের অন্যতম বড় উদ্যোগ শওকত খানম মেমোরিয়াল ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও নওয়াজ শরীফ সহায়তা করেছিলেন।

১৯৯২ বিশ্বকাপের আগে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নওয়াজ হাসপাতালের জন্য জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে ইমরানকে সহযোগিতা করেন। ১৯৯১ সালের এপ্রিলে হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে নওয়াজ শরীফ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের পর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানানো হয়, হাসপাতালের জন্য এক কোটি রুপি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

ইমরানকে রাজনীতিতে আনার চেষ্টা

১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ের পর নওয়াজ শরীফ প্রকাশ্যে জানান, তিনি আগেই ইমরান খানকে রাজনীতিতে আসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ইমরান তখন জানান, তাকে দুবার রাজনীতিতে আসার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি নিজেকে রাজনীতিবিদ হওয়ার উপযুক্ত মনে করেননি।

তবে চার বছর পর, ১৯৯৬ সালে, তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করেন ইমরান।

রাজনীতিতে প্রবেশের আগে নওয়াজ শরীফ আবারও তাকে দলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ইমরানের ভাষ্য অনুযায়ী, নওয়াজ প্রথমে তাকে দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। পরে জাতীয় পরিষদে ২০টি আসন নিয়ে জোট করার প্রস্তাবও দেন।

পি জে মীরের দাবি, নওয়াজ ইমরানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করার কথাও বলেছিলেন। তবে ইমরান সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। নিজের বইয়ে তিনি লিখেছেন, সে সময় তিনি নওয়াজ ও বেনজির ভুট্টো—দুজনকেই দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করতেন।

মুশাররফের বিরুদ্ধে আবারও একসঙ্গে

১৯৯৭ সালের নির্বাচনে ইমরান খান ও তার দল বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে। অন্যদিকে নওয়াজ শরীফ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।

কিন্তু ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর জেনারেল পারভেজ মুশাররফ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নওয়াজ সরকারের পতন ঘটান। নওয়াজ কারাবন্দী হয়ে পরে সৌদি আরবে নির্বাসিত হন।

অন্যদিকে ইমরান খানও প্রথম দিকে মুশাররফকে সমর্থন করলেও ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে দূরে সরে যান। ২০০৭ সালে তিনিও মুশাররফের আমলে কারাবন্দী হন।

এরপর লন্ডনে নওয়াজ শরীফের সঙ্গে ইমরান খানের সাক্ষাৎ হয়। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দুজন আবারও একসঙ্গে অবস্থান নেন। ২০০৭ সালের জুনে তারা মুশাররফের বিরুদ্ধে যৌথভাবে কাজ করার ঘোষণা দেন এবং ‘অল পার্টিজ ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট’-এর অংশ হন।

তবে সেই জোটও বেশিদিন টেকেনি। নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে মতবিরোধের জেরে ইমরান নওয়াজের ওপর ক্ষুব্ধ হন। ইমরানের অভিযোগ ছিল, নওয়াজ শেষ মুহূর্তে নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত থেকে সরে গিয়ে অন্যদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন।

বন্ধুত্ব থেকে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত

২০১১ সালে লাহোরের মিনার-ই-পাকিস্তানে বড় সমাবেশের মাধ্যমে ইমরান খান নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। সে সময় তার প্রধান সমালোচনার লক্ষ্য ছিল পিপিপি। নওয়াজ শরীফের সঙ্গে তার সম্পর্কেও তখনও কিছুটা ‘সফট কর্নার’ ছিল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১৩ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি বদলে যায়। ইমরান ও নওয়াজের রাজনৈতিক সংঘাত ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, দুজনই যখন বুঝতে পারেন যে ক্ষমতার লড়াই মূলত পরস্পরের বিরুদ্ধে, তখন তাদের রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণও কঠোর হয়ে ওঠে।

২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে নওয়াজ শরীফ দণ্ডিত হয়ে কারাগারে যান। আর ঠিক সেই সময় ইমরান খান প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ওঠেন—যে বাসভবনে একসময় নওয়াজ তাকে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

কিন্তু ইমরানের প্রধানমন্ত্রিত্বও পূর্ণ মেয়াদ পায়নি। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার জন্য তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পাশাপাশি তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়াকেও দায়ী করেন। নওয়াজ শরীফও এর আগে একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিলেন।

আবার কি মিত্র হতে পারেন নওয়াজ-ইমরান?

পাকিস্তানের রাজনীতিতে মিত্রতা ও শত্রুতার সমীকরণ বহুবার বদলেছে। এর বড় উদাহরণ নওয়াজ শরীফ ও বেনজির ভুট্টো। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধের পর ২০০৭ সালে তারা ‘চার্টার অব ডেমোক্রেসি’তে স্বাক্ষর করেছিলেন।

তাহলে কি নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খানও ভবিষ্যতে নিজেদের বিরোধ ভুলে আবারও একসঙ্গে দাঁড়াতে পারেন?

সোহেল ওয়ারাইচ মনে করেন, নওয়াজ ও ইমরানের মধ্যে এখন আর জোটের সুযোগ নেই। তবে পি জে মীরের ধারণা, কোনো না কোনোভাবে তাদের মধ্যে সমঝোতা হতে পারে এবং ভবিষ্যতে তারা সামরিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একসঙ্গে অবস্থানও নিতে পারেন।

তার মতে, দুজনের চিন্তাভাবনায় একটি জায়গায় মিল রয়েছে—তারা কেউই সেনাবাহিনীকে নিজেদের ঊর্ধ্বে দেখতে চান না।

একসময় ক্রিকেটের মাঠে পরিচিত হওয়া দুই ব্যক্তি পরে পাকিস্তানের রাজনীতির দুই মেরুতে অবস্থান নিয়েছেন। বন্ধুত্ব, সহযোগিতা, জোট, মতবিরোধ এবং শেষ পর্যন্ত তীব্র রাজনৈতিক বৈরিতা—নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খানের সম্পর্ক তাই পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

Advertisement
Advertisement