ডেঙ্গু নয়, তবু জ্বর-শরীরব্যথা
জ্বর, মাথাব্যথা, প্রচণ্ড শরীরব্যথা ও দুর্বলতা—এসব উপসর্গ নিয়ে সম্প্রতি চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন অনেকেই। কারও কারও শরীরের তাপমাত্রা উঠছে ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত। ডেঙ্গুর আশঙ্কায় পরীক্ষা করিয়েও মিলছে নেগেটিভ ফল। বুকের এক্স-রেতেও ধরা পড়ছে না কোনো অস্বাভাবিকতা। রক্ত পরীক্ষায় কখনো সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিনের (সিআরপি) মাত্রা সামান্য বেশি পাওয়া গেলেও জ্বরের নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা যাচ্ছে না।
আক্রান্তদের কেউ কেউ তিন থেকে চার দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠছেন। তবে জ্বর কমে যাওয়ার পরও শরীরে দুর্বলতা ও ক্লান্তি থাকছে এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময়। এ পরিস্থিতিতে অনেকের মনেই প্রশ্ন, দেশে কি নতুন কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, নাকি পরিচিত কোনো ভাইরাসের কারণেই এমন জ্বর হচ্ছে?
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক জ্বরের পেছনে নতুন কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি। তবে ডেঙ্গু ও হামের মতো পরিচিত রোগের পাশাপাশি ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের সংক্রমণ থাকতে পারে।
আইইডিসিআর জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের নমুনা পরীক্ষা করে। ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্তের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেই শরীরে কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ নেই, এমনটি ভাবার কারণ নেই। ইনফ্লুয়েঞ্জা, রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) ও অ্যাডিনোভাইরাসের সংক্রমণেও জ্বর, মাথাব্যথা ও শরীরব্যথা হতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে এসব ভাইরাস শনাক্তে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয় না। রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসা দেন চিকিৎসকেরা। তা ছাড়া সব ধরনের ভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষার সুযোগও দেশের সব জায়গায় নেই। ফলে জ্বরের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর মতে, নতুন কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার আগে পরিচিত রোগগুলোর সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বছরের এই সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ভাইরাসের সংক্রমণের পাশাপাশি টাইফয়েড, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য কারণেও জ্বর হতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
একই উপসর্গ, হতে পারে ভিন্ন রোগ
ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও কোভিড-১৯-এর উপসর্গের মধ্যে বেশ মিল রয়েছে। ফলে শুধু উপসর্গ দেখে কোন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
ডেঙ্গুতে হঠাৎ তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরব্যথা, বমিভাব ও ত্বকে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। চিকুনগুনিয়ায় জ্বরের পাশাপাশি অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা হয়। অন্যদিকে ইনফ্লুয়েঞ্জায় জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, সর্দি-কাশি ও দুর্বলতা দেখা যায়।
তাই ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। পরীক্ষার ধরন এবং জ্বর শুরুর কত দিন পর পরীক্ষা করা হয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে পুনরায় পরীক্ষা করাতে হতে পারে।
জ্বর হলে যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
ঋতু পরিবর্তনের সময় বাংলাদেশে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের জ্বরের প্রকোপ বাড়ে। আবহাওয়ার ওঠানামার পাশাপাশি ডেঙ্গুসহ নানা সংক্রমণ এর কারণ হতে পারে। তাই জ্বর হলে ডেঙ্গুর সম্ভাবনাও মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি।
বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তক্ষরণ, অস্বাভাবিক অস্থিরতা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, রক্তচাপ কমে যাওয়া, নাড়ির স্পন্দন দুর্বল হওয়া কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গুতে জ্বর কমে যাওয়ার পরও গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
শিশু হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে পড়লে কিংবা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে অবহেলা করা যাবে না। একইভাবে বয়স্ক ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জ্বর হলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
জ্বর হলে কী করবেন?
জ্বর হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি পানি ও অন্যান্য তরল খাবার বেশি করে পান করতে হবে। জ্বর ও শরীরব্যথা কমাতে প্রয়োজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল সেবন করা যেতে পারে। তবে ডেঙ্গুর আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আইবুপ্রোফেন, অ্যাসপিরিনসহ অন্যান্য ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। এসব ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
জ্বরকে সাধারণ ভাইরাসজনিত সংক্রমণ ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। নিজে থেকে ওষুধ কিনে খাওয়া কিংবা জ্বর কমে গেলেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন বলে ধরে নেওয়া—দুটিই ঝুঁকিপূর্ণ।
অর্থাৎ, নতুন কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত না হলেও জ্বরের পেছনে একাধিক পরিচিত ভাইরাস ও অন্যান্য রোগের ভূমিকা থাকতে পারে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকা এবং উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



.png)
.png)