ঢাকা,  রোববার
০১ নভেম্বর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

হরমুজ প্রণালি খুলতে দুই দিনের পরিকল্পনায় রাজি ইরান, যুক্তরাষ্ট্রকে মানতে হবে ৭ শর্ত

প্রকাশিত: ১০:৫৩, ১ নভেম্বর ২০২৬

হরমুজ প্রণালি খুলতে দুই দিনের পরিকল্পনায় রাজি ইরান, যুক্তরাষ্ট্রকে মানতে হবে ৭ শর্ত

হরমুজ প্রণালি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়সীমা সাত দিন থেকে কমিয়ে দুই দিন করতে সম্মত হয়েছে ইরান। তবে এ জন্য ওয়াশিংটনকে সাতটি শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন। একই বিষয়ে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ীও বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

আরাঘচি জানান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য শুরুতে সাত দিনের একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছিল ইরান। এতে প্রণালিতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে তেহরানের শর্তগুলো নির্ধারণ করা হয়। পরে কাতারের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়সীমা সাত দিন থেকে কমিয়ে পাঁচ দিন বা তারও কম করার অনুরোধ জানানো হয়। গতকাল কাতারের একটি প্রতিনিধিদলের ইরান সফরের সময় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সময়সীমা কমিয়ে দুই দিন করার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্রকে নির্ধারিত একগুচ্ছ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয় দিনে হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়ে সেখানে নৌ-চলাচল আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে।

আরাঘচি বলেন, ইরান ও ওমানের আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হরমুজ প্রণালির নতুন নৌ-চলাচল পথকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। একই সঙ্গে অন্য সব নৌপথ বন্ধের দাবি জানিয়েছে তেহরান। ইরানের শর্ত মেনে প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়া হলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরুর পথ তৈরি হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের সাত শর্ত

শান্তি আলোচনা শুরু এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে সাতটি শর্ত পূরণের দাবি জানিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ী জানিয়েছেন, গত সেপ্টেম্বরেই এসব শর্ত নির্ধারণ করেছিল তেহরান। তবে সে সময় তিনি শর্তগুলোর কয়েকটি প্রকাশ করেছিলেন।

ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, জুলাইয়ে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ভেঙে যাওয়ার পর দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমাতে হবে। পাশাপাশি ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে জুনে ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে যে ছাড় দেওয়া হয়েছিল, তা পুনর্বহাল করতে হবে।

এ ছাড়া কাতারে রাখা অর্থসহ বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সব তহবিল ও অর্থ ছাড় করে দিতে হবে। ইরান ও ওমানের নির্ধারিত হরমুজ প্রণালির নতুন নৌ-চলাচল পথ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং অন্য সব নৌপথ বন্ধ করতে হবে।

তেহরানের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—সব রণাঙ্গনে যুদ্ধ বন্ধ করা, বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করা এবং সংশ্লিষ্ট সব অঞ্চলে সংঘাতের অবসান নিশ্চিত করা।

গত সেপ্টেম্বরে রেজায়ী আরও কয়েকটি দাবি জানিয়েছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। বিশেষ করে ইরানের সরকারবিরোধীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন তিনি।

যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ইরান, আত্মসমর্পণ করবে না তেহরান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য ইরানের সামরিক প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিনি বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন যুদ্ধের জন্য বেশি প্রস্তুত। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত রয়েছে।

আরাঘচির দাবি, যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র আগের সংঘাতগুলোর মতো এবারও নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে। বরং ওয়াশিংটনের পরাজয়ের তালিকায় আরও একটি পরাজয় যুক্ত হবে বলে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন তিনি।

ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের কথাও স্বীকার করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে অর্থনৈতিক চাপের মুখে তেহরান আত্মসমর্পণ করবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। আরাঘচি বলেন, অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরান তার মর্যাদা কিংবা স্বাধীনতা বিসর্জন দেবে না। নিজেদের সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে এসব সমস্যা মোকাবিলা করে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখবে দেশটি।

ভ্যান্সের চিঠি নিয়ে কী বললেন আরাঘচি

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো একটি চিঠি নিয়েও কথা বলেছেন আরাঘচি। তাঁর দাবি, চিঠিটির মূল উদ্দেশ্য দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রাখা এবং অমীমাংসিত মতপার্থক্যগুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা।

আরাঘচি বলেন, আলোচনার পথ খোলা রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে চিঠিটি যদি নতুন করে সংঘাত উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়ে থাকে, তাহলে সেটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক ভুলের তালিকায় আরেকটি সংযোজন।

সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার পরিকল্পনার সময়সীমা সাত দিন থেকে কমিয়ে দুই দিনে আনতে সম্মত হলেও ইরান এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থানে অনড়। তেহরানের স্পষ্ট বার্তা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সামরিক উপস্থিতি কমানো, জব্দ অর্থ ফেরত দেওয়াসহ নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ না হলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি সম্ভব নয়।

Advertisement
Advertisement