ঢাকা,  রোববার
০৪ অক্টোবর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

হেফাজতের ৯ দফায় নারীর প্রসঙ্গ বাদ, বদলেছে দাবির ধরন

প্রকাশিত: ০৯:৩৪, ৪ অক্টোবর ২০২৬

হেফাজতের ৯ দফায় নারীর প্রসঙ্গ বাদ, বদলেছে দাবির ধরন

হেফাজতের ৯ দফায় নারীর প্রসঙ্গ বাদ, বদলেছে দাবির ধরন

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের দাবিনামায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২০১৩ সালে সংগঠনটির দেওয়া ১৩ দফায় নারীর বিষয়ে কঠোর ও রক্ষণশীল অবস্থান থাকলেও গত আগস্টে সরকারকে দেওয়া নতুন ৯ দফায় নারীর প্রসঙ্গ রাখা হয়নি। দাবিগুলো বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

হেফাজত নেতারা বলছেন, নারীর বিষয়ে ইসলাম সব সময় উদার এবং ইসলামের মূলনীতি ঠিক রেখেই তারা নারীর শালীনতায় বিশ্বাসী। তাদের দাবি, এটি কোনো আদর্শিক পরিবর্তন নয়; বরং সময়ের সঙ্গে দাবিগুলোকে উপযোগী করতেই তালিকায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

২০১৩ সালের ১৩ দফার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সংবিধান, সংস্কৃতি, নারী-পুরুষের সামাজিক আচরণ, গণমাধ্যম এবং মূর্তি-ভাস্কর্য নিয়ে তৎকালীন দাবিগুলোর বড় অংশই নতুন ৯ দফায় নেই। শুধু চারটি দফা বাদ পড়েনি, প্রায় প্রতিটি দাবির ভাষা, পরিধি ও রাজনৈতিক তাৎপর্যেও পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিধিনিষেধের দাবি কমিয়ে নতুন তালিকায় বিচার, কওমি শিক্ষা, রাষ্ট্রীয় কাজে আলেমদের অংশগ্রহণ এবং তাবলিগ জামাত ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নারী-পুরুষের সামাজিক আচরণের বিষয়টি বাদ

২০১৩ সালের চতুর্থ দফায় ‘বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার’, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ এবং ‘বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ’ বন্ধের দাবি ছিল। নতুন ৯ দফায় এসবের কোনোটি রাখা হয়নি। অর্থাৎ ব্যক্তিজীবন, সামাজিক আচরণ ও সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ন্ত্রণের দাবি থেকে হেফাজত অনেকটাই সরে এসেছে।

একইভাবে, পুরোনো দাবিতে ‘ইসলামবিরোধী নারীনীতি’ ও ‘ধর্মহীন শিক্ষানীতি’ বাতিলের কথা থাকলেও নতুন তালিকায় নারীনীতি বাতিলের দাবি নেই। শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিও বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি রাখা হয়েছে।

সংবিধান সংশোধনের দাবিতেও পরিবর্তন

২০১৩ সালের প্রথম দফায় সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন বাতিলের দাবি ছিল। নতুন ৯ দফায় সংবিধানের মূলনীতিতে পরিবর্তনের বিষয়টি রাখা হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে, ‘কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস করা যাবে না।’

হেফাজত নেতাদের ভাষ্য, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় দাবিটি নতুন তালিকায় রাখা হয়নি।

‘মৃত্যুদণ্ড’ থেকে ‘সর্বোচ্চ শাস্তি’

আল্লাহ, রাসুল (সা.), কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননার বিরুদ্ধে আইন করার দাবি পুরোনো ও নতুন—দুই তালিকাতেই রয়েছে। তবে ভাষায় পরিবর্তন এসেছে। ২০১৩ সালের দাবিতে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের কথা স্পষ্টভাবে বলা হলেও নতুন ৯ দফায় শুধু ‘সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান’ রাখার কথা বলা হয়েছে। ‘মৃত্যুদণ্ড’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘কুৎসা’ রোধের বিষয়টিও নতুন দাবিতে নেই।

শাহবাগ, ব্লগার ও মূর্তি-ভাস্কর্যের দাবি বাদ

২০১৩ সালের ১৩ দফায় শাহবাগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ‘স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ’, ব্লগার ও ইসলামবিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ছিল। নতুন ৯ দফায় বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে।

একইভাবে, মূর্তি ও ভাস্কর্যবিরোধী দাবিও পুরোপুরি বাদ পড়েছে। ২০১৩ সালের সপ্তম দফায় রাস্তার মোড়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপনের বিরোধিতা করা হয়েছিল। নতুন তালিকায় মূর্তি বা ভাস্কর্য নিয়ে কোনো দাবি নেই।

গণমাধ্যমে দাড়ি-টুপি ও ইসলামী সংস্কৃতি নিয়ে হাসিঠাট্টা, নাটক-সিনেমায় ধর্মীয় পোশাককে নেতিবাচক চরিত্রে ব্যবহারসহ সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমকেন্দ্রিক দাবিগুলোও নতুন ৯ দফায় রাখা হয়নি।

কাদিয়ানিদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিযবুত তওহিদ

কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি পুরোনো ও নতুন—দুই তালিকাতেই রয়েছে। তবে নতুন দাবিতে কাদিয়ানিদের পাশাপাশি হিযবুত তওহিদকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি যুক্ত হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়েও দাবির ধরন পরিবর্তন হয়েছে। ২০১৩ সালের দাবিতে সারা দেশে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও ও খ্রিষ্টান মিশনারিদের ধর্মান্তরকরণসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বন্ধের কথা বলা হয়েছিল। নতুন তালিকায় বিষয়টি সীমিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশি-বিদেশি মিশনারিদের ‘ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা’ বন্ধের দাবি করা হয়েছে।

শাপলা ও জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলোর বিচার দাবি

নতুন ৯ দফায় বিচারসংক্রান্ত দাবিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শাপলা চত্বরে ‘গণহত্যায়’ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪ সালের জুলাইয়ের হত্যাযজ্ঞে জড়িত হুকুমের আসামি ও খুনিদের বিচার নিশ্চিত করার দাবি তোলা হয়েছে।

অর্থাৎ অতীতে হেফাজত নেতাকর্মীদের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার ও হামলার বিচারকে কেন্দ্র করে যে দাবিগুলো ছিল, নতুন তালিকায় তা রাজনৈতিক সহিংসতার বিচার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

কওমি মাদ্রাসা নিয়ে নতুন দাবি

কওমি মাদ্রাসাকে ঘিরেও দাবির ধরনে পরিবর্তন এসেছে। ২০১৩ সালে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা, হুমকি ও হয়রানি বন্ধের দাবি থাকলেও নতুন ৯ দফায় কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগের বিষয়টি যুক্ত হয়েছে।

দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করে দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করা এবং সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিকে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি আলেম-ওলামাকে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে অংশীদার করার দাবিও নতুন তালিকায় যুক্ত হয়েছে। পুরোনো দাবিতে আলেমদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ ও মামলা প্রত্যাহারকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও নতুন দাবিতে রাষ্ট্র পরিচালনা ও পুনর্গঠনে তাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে এসেছে।

তাবলিগ জামাত ও সাদ কান্ধলভী প্রসঙ্গ

নতুন ৯ দফায় তাবলিগ জামাত ও ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে ঘিরেও স্পষ্ট দাবি রয়েছে। হেফাজতের দাবি, বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম ও বিশ্ব ইজতেমা ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে এসেছে।

একই সঙ্গে সাদ কান্ধলভীর বাংলাদেশে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থিদের ইজতেমা আয়োজনের অনুমতি না দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

হেফাজতের বক্তব্য

হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ১৩ দফাকে কমিয়ে ৯ দফা করা হয়েছে। এতে কিছু বিষয় নতুন করে যুক্ত হয়েছে, আবার কিছু বিষয় বাদও দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, নারীর বিষয়ে ইসলাম সব সময় উদার এবং ইসলামের মূলনীতি ঠিক রেখেই তারা নারীর শালীনতায় বিশ্বাসী।

কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদীও বলেন, ইসলাম নারীকে অধিকার দিয়েছে এবং নারীর অধিকারের নামে তাদের পণ্যে পরিণত করার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে আসছে সংগঠনটি।

অন্যদিকে, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরীর মতে, সরকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি এড়াতে কৌশল হিসেবেও হেফাজত এই পরিবর্তন এনে থাকতে পারে।

সার্বিকভাবে ১৩ দফা থেকে ৯ দফায় হেফাজতের দাবিনামায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিধিনিষেধের বিষয়গুলো কমেছে। বিপরীতে বিচার, কওমি শিক্ষা, আলেমদের রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণ এবং তাবলিগ জামাতের মতো বিষয়গুলো নতুন তালিকায় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় অবমাননার বিরুদ্ধে আইন, কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা এবং মুসলিম শিক্ষার্থীদের ইসলাম ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার মতো মূল দাবিগুলো বহাল রয়েছে।

Advertisement
Advertisement