জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব, জোট ছাড়ার পথে এনসিপি
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক দূরত্ব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। জোটের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এককভাবে পথ চলার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়া, জোটের কর্মসূচিতে শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি এবং নিজস্ব উদ্যোগে নির্বাচনী প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সম্পর্কের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত মিলছে।
এমনকি জোটের যৌথ কর্মসূচিতে দলের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের অংশ না নেওয়াসহ বেশ কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের বৈঠকে। দলটির একাধিক সূত্র ঢাকা পোস্টকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ অক্টোবর এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেনের উপস্থিতিতে ওই বৈঠকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে সমঝোতা না করে এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। জামায়াতের সঙ্গে কোনো ধরনের নির্বাচনী সমঝোতায় না যাওয়ার পক্ষে মত দেন পর্ষদের সদস্যরা।
এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রস্তুতি জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রার্থী ঘোষণা শুরু করেছে দলটি। এর অংশ হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
সিনিয়র নেতাদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল নির্বাচনী কৌশল নয়; বরং জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ পুনর্বিবেচনারও ইঙ্গিত। ভবিষ্যতে দুই দলের সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বৈঠক সূত্র জানায়, রাজনৈতিক পর্ষদের সভায় জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের কর্মসূচিতে এনসিপির অংশগ্রহণ সীমিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, জোটের কর্মসূচিতে দলের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব সরাসরি অংশ নেবেন না। পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও বৈঠকে প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন সদস্য।
নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা যাচাই এবং সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যেও এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র।
সম্পর্কে ফাটল নেই, দাবি এনসিপির
তবে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি কিংবা জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করছেন এনসিপি নেতারা। তাঁদের দাবি, এটি কোনো রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি এবং নিজস্ব কর্মসূচি বাস্তবায়নের কৌশল।
এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির কোনো আদর্শিক জোট নেই। নির্বাচনী ঐক্যের ভিত্তিতে ১১ দলীয় জোট গঠিত হয়েছে। ফলে জোটের কর্মসূচির পাশাপাশি এনসিপি নিজেদের কর্মসূচিও পালন করছে। সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করাই এর লক্ষ্য।’
সম্পর্কের অবনতির বিষয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছে, এটা কে বলল? না, সম্পর্ক খারাপ—এমন কিছু নয়। একটা দলের সঙ্গে আরেকটা দলের সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভালো বা খারাপ হওয়ার মতো নয়। আমাদের প্রত্যেকটি দলের কিছু নিজস্ব এজেন্ডা আছে। যেখানে এক ধরনের ঐক্য তৈরি হয়, সেখান থেকেই মূলত একটি জোট গড়ে ওঠে।’
মনিরা শারমিন আরও বলেন, ‘দলের কিছু কর্মসূচি আমরা আলাদাভাবেই করছি। আর এটা তো করারই ছিল। যেহেতু এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে আদর্শিক কোনো জোটে নেই, সুতরাং তাদের সঙ্গে যে কর্মসূচি, সেটাই আমাদের কর্মসূচির বিষয়—ব্যাপারটি এমন নয়। আমাদের নিজস্ব কিছু পরিকল্পনা আছে।’
লংমার্চে শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি
জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির দূরত্বের আলোচনা আরও জোরালো হয় ১১ দলীয় ঐক্যের সাম্প্রতিক লংমার্চ কর্মসূচিতে দলটির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে। ঢাকা, খুলনা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ায় আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের দেখা যায়নি। অথচ এর আগের দুটি লংমার্চে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ কেন্দ্রীয় নেতারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
তবে ঢাকার কর্মসূচিতে শীর্ষ নেতারা অংশ না নিলেও লংমার্চের বিভিন্ন পর্যায়ে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ও আবদুল হান্নান মাসউদ এবং যুগ্ম সদস্যসচিব এস এম সাইফ মুস্তাফিজ।
এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ১১ দলীয় জোট থেকে এনসিপির বের হয়ে যাওয়ার গুঞ্জন সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সম্পর্কে কোনো ফাটল বা দূরত্বও তৈরি হয়নি। লংমার্চে এনসিপির দুজন সংসদ সদস্য অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক পর্ষদের একাধিক সদস্যও উপস্থিত ছিলেন। ঢাকায় তাঁরা হয়তো যোগ দেননি, তবে বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সারোয়ার তুষার বলেন, ‘না, আমরা জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে যাচ্ছি না। এককভাবে নির্বাচন করছি। ইতোমধ্যে আমরা প্রায় ১০০ উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীর মধ্যে একজনকে সমর্থন দিয়েছি। বাকিদের বিষয়ে পর্যায়ক্রমে ঘোষণা আসবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ ঢাকার বাইরের কয়েকটি সিটি করপোরেশনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। সুতরাং এই জায়গা থেকে আমরা এককভাবে নির্বাচন করছি। এই নির্বাচনকে শুধু নির্বাচন হিসেবে দেখতে চাই না। বরং এনসিপির সাংগঠনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করা, নতুন মানুষকে দলের সঙ্গে যুক্ত করা এবং তৃণমূল ও ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানোর কাজ হিসেবেও দেখছি।’
১১ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতির ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘এই সময়টা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের নিজেদের কিছু কর্মসূচি রয়েছে। নেতৃত্বে থাকা কারও কারও বিদেশ সফর আছে, আবার কারও সাংগঠনিক ব্যস্ততা ও সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব কারণে দলগতভাবে আমাদের কিছু ব্যস্ততা চলছে।’
এনসিপি-শিবির নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
জোটের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্বের পাশাপাশি এনসিপি ও জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ছাত্রশিবিরের নেতাদের বক্তব্যেও পাল্টাপাল্টি অবস্থান স্পষ্ট হচ্ছে। সম্প্রতি এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে জামায়াতের ভূমিকার সমালোচনা করে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। এর জবাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম।
সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ের একটি উপনির্বাচনের উদাহরণ টেনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা দেখেছি, ঠাকুরগাঁওয়ে একটি উপনির্বাচন হয়েছে। সকাল থেকে বিভিন্ন জায়গায় প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ব্যালটে সিল মেরে রেখেছেন, সেগুলো ধরাও পড়েছে। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, সরকারি প্রার্থী ও বিরোধী প্রার্থী একে অপরকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন। আমরা গণতন্ত্রের অত্যন্ত সংকটময় ও দুরবস্থার একটি সময় পার করছি।’
এনসিপি নেতার এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি লেখেন, ‘এনসিপির প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার দুর্বল ছিল। তারা যদি এ ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থানে থাকত এবং বিএনপির প্রতারণায় পা না দিত, তবে ১১ দলীয় ঐক্যের এই আন্দোলন এখন করতে হতো না। আর গণভোট আগে হলে এবং সব সংস্কার শেষে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে, জাতিকে আজ এই সংকটে পড়তে হতো না। বিএনপি যে কথা রাখবে না, তা আমরা আগেই বুঝতে পেরেছিলাম।’
ছাত্র-উপদেষ্টাদেরও সমালোচনা করে শিবির সভাপতি বলেন, ‘ছাত্র-উপদেষ্টারা মসনদে বসে যে দায়িত্ব পালনের কথা ছিল, তা না করে নিজেদের আখের গুছিয়েছেন। উপদেষ্টা হওয়ার পর তাঁদের মৌলিক দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্র সংস্কারে ভূমিকা রাখা। কিন্তু তাঁরা সে দায়িত্ব পালনে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছেন, যার খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে।’
অন্যদিকে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করলেও ১১ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন এনসিপির নেতারা। মনিরা শারমিন বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই আশঙ্কা করছিলাম, বিএনপি গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতটা আন্তরিক নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিএনপি সেটাই প্রমাণ করছে। পরবর্তী সময়ে এই জায়গা থেকে সংসদে কথা বলার জন্য আমাদের মধ্যে একটি ঐক্য দরকার ছিল। এখনো আমরা লংমার্চ করছি, এরপরও একসঙ্গেই কর্মসূচি করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কমিটি পুনর্গঠনের পাশাপাশি সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করাই আমাদের লক্ষ্য। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর মাধ্যমে দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো এবং নিজস্ব কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে বোঝাতে চাই, আমরা কী চাই এবং কোন বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছি।’
সব মিলিয়ে, এনসিপি নেতারা জোট ছাড়ার সম্ভাবনা নাকচ করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়া, নিজস্ব কর্মসূচিতে গুরুত্ব দেওয়া এবং জোটের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মসূচিতে সীমিত উপস্থিতি—এসব ঘটনায় জামায়াতের সঙ্গে দলটির রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আপাতত জোটে থাকলেও ভবিষ্যতে দুই দলের রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের কর্মসূচি ও নির্বাচনী অবস্থানের ওপর।



.png)
.png)