ঢাকা,  সোমবার
১২ অক্টোবর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

৭ অক্টোবরের হামাসের সিদ্ধান্ত: কৌশলগত বিচক্ষণতা, নাকি বড় ধরনের ভুল হিসাব?

প্রকাশিত: ০৯:৪১, ১১ অক্টোবর ২০২৬

৭ অক্টোবরের হামাসের সিদ্ধান্ত: কৌশলগত বিচক্ষণতা, নাকি বড় ধরনের ভুল হিসাব?

৭ অক্টোবরের হামাসের সিদ্ধান্ত: কৌশলগত বিচক্ষণতা, নাকি বড় ধরনের ভুল হিসাব?

ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের উচ্ছেদ, দখলদারত্ব, অবরোধ ও সংগ্রামের ইতিহাসের বাইরে রেখে ৭ অক্টোবরের ঘটনাবলি বোঝা সম্ভব নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উচ্ছেদের শিকার হওয়া ফিলিস্তিনিদের নিজেদের প্রতিরোধের অধিকার কেন আছে, তা দিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করাও যুক্তিসংগত নয়। তাদের সেই অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই।

প্রশ্ন তোলা যেতে পারে অন্য জায়গায়। কেন হামাস ঠিক সেই সময়ে, ঠিক সেই পথটি বেছে নিয়েছিল? ৭ অক্টোবরের আগে হামাসের নেতারা যা জানতেন এবং যুক্তিসংগতভাবে যে পরিণতিগুলো অনুমান করতে পারতেন, সেগুলোর বিচারে সিদ্ধান্তটি কতটা যৌক্তিক ছিল?

এ প্রশ্নের সঙ্গে আরও একটি বিষয় জড়িয়ে আছে—হামাসের সামনে যেসব বিকল্প ছিল, সেগুলোর মধ্যে ৭ অক্টোবরের অভিযান কি সবচেয়ে উপযুক্ত কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল? এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার পেছনে তাদের কৌশলগত মূল্যায়ন কী ছিল?

পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের আলোকে এসব প্রশ্ন দেখা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বি’তসেলেম, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলার্স এবং জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গাজায় গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সেখানে নির্মূল অভিযান ও গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের নথি প্রকাশ করেছে।

তিন বছর ধরে গাজা এমন মাত্রার ধ্বংস ও প্রাণহানির শিকার হয়েছে, যা ৭ অক্টোবরের আগে খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পেরেছিলেন।

তবে অতীতের অভিজ্ঞতা দিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের বিচার করাই যথেষ্ট নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় নেতারা কী জানতেন, কী নিয়ে আশঙ্কা করতেন এবং কী পরিণতি যুক্তিসংগতভাবে প্রত্যাশা করেছিলেন, প্রথমে তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্তটির যৌক্তিকতা বিচার করতে হবে। সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত সঠিক ছিল কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার সময় এখনো আসেনি।

৭ অক্টোবরের আগের বছরগুলোতে হামাসের অভ্যন্তরীণ আলোচনার নথি থেকে দেখা যায়, সংগঠনটির নেতৃত্ব ক্রমেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে বিদ্যমান পরিস্থিতিই একটি কৌশলগত হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

এসব আলোচনার যে চিত্র পাওয়া যায়, তার মূল ভিত্তি হলো গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জব্দ করা অভ্যন্তরীণ নথি। এর অধিকাংশই প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মেইর আমিত ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড টেররিজম ইনফরমেশন সেন্টার। এসব নথি ৭ অক্টোবরের আগের বছরগুলোতে গাজায় হামাসের নেতাদের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে ধারণা দেয়।

হামাসের কৌশলগত হিসাবকে পাঁচটি বিষয় প্রভাবিত করেছিল: গাজা অবরোধ, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, জেরুজালেম ও আল-আকসা মসজিদ নিয়ে সংঘাত, ইসরায়েলের কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের পরিস্থিতি এবং আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া—বিশেষ করে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তি।

এই পাঁচটি বিষয়ই একই উপসংহারের দিকে ইঙ্গিত করছিল—সময় নিরপেক্ষ নয়। অপেক্ষা করাও একটি সিদ্ধান্ত। হামাসের ক্রমবর্ধমান বিশ্বাস ছিল, অপেক্ষা করার ফলে ফিলিস্তিনিদের সামনে থাকা বিকল্পগুলো ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।

অবরোধ, বসতি ও আল-আকসা

প্রথমেই ছিল গাজার পরিস্থিতি। ২০২৩ সালে গাজায় অবরোধের মেয়াদ ১৬ বছর ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ২২ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি একটি সংকীর্ণ উপকূলীয় ভূখণ্ডে কার্যত আটকে ছিলেন। তাদের চলাচল, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ ছিল। গাজায় প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়ার ওপরও ছিল কঠোর নিয়ন্ত্রণ।

বর্তমান যুদ্ধ শুরুর আগেই, ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে গাজায় বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ৪৪ শতাংশ। ওই বছরের পরবর্তী সময়ে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

গাজার ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করতেন। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর কাছ থেকে জরুরি খাদ্যসহায়তা নিয়ে মৌলিক চাহিদা মেটাতেন ১২ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী।

হামাস গাজা শাসন করলেও অবরোধ তুলে নিতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষের কারণে ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীকে কিছু মূল্য দিতে হলেও পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। ধ্বংসযজ্ঞের পর সীমিত পুনর্গঠন হয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে সাময়িক কিছু ছাড় পাওয়া গেছে, কিন্তু অবরোধ বহাল থেকেছে।

অতএব, পরিস্থিতিটি কখনোই কেবল যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যকার একটি সরল পছন্দ ছিল না। বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই অব্যাহত সহিংসতা, অবরুদ্ধ অবস্থা এবং ক্রমাবনতির বাস্তবতা ছিল।

পশ্চিম তীরে বিপদটি ছিল ভিন্ন ধরনের, তবে সমানভাবে জরুরি। ইসরায়েলি বসতির সম্প্রসারণ একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অবশিষ্ট ভূখণ্ডগত ভিত্তিকে ক্রমাগত ধ্বংস করছিল। ২০২৩ সাল নাগাদ অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছিলেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব বসতি অবৈধ।

২০২২ সালের শেষ দিকে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে গঠিত সরকারে বেজালেল স্মোট্রিচের মতো ব্যক্তিরা পশ্চিম তীরের ওপর নজিরবিহীন প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পান। স্মোট্রিচ প্রকাশ্যেই ফিলিস্তিনিদের সামনে তিনটি বিকল্প তুলে ধরেছিলেন: ইসরায়েলি শাসন ও আধিপত্য মেনে নিয়ে জাতীয় আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করা, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া, অথবা প্রতিরোধ করলে প্রাণঘাতী শক্তির মুখোমুখি হওয়া।

হামাসের কাছে এর কৌশলগত তাৎপর্য শুধু বসতি সম্প্রসারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সময় যে ফিলিস্তিনিদের পক্ষেই কাজ করবে, তার নিশ্চয়তা ছিল না। প্রতিটি অতিরিক্ত বছর ভূখণ্ডের বিভক্তি বাড়াচ্ছিল, ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত করছিল এবং পরিস্থিতি পাল্টে দেওয়ার সুযোগ কমিয়ে আনছিল। এমন পরিস্থিতিতে কৌশলগত ধৈর্য একসময় কৌশলগত স্থবিরতায় পরিণত হতে পারে।

জেরুজালেম ও আল-আকসা মসজিদ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ২০২১ সালের মে মাসে ‘সাইফ আল-কুদস’ নামে পরিচিত সংঘর্ষ দেখিয়েছিল, আল-আকসা কীভাবে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করে ফিলিস্তিনি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।

হামাসের কাছে সেই সংঘর্ষ গাজা ও ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে আরেকটি যুদ্ধের চেয়ে বড় কিছু ছিল। তাদের মনে হয়েছিল, গাজা, জেরুজালেম, পশ্চিম তীর, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ইসরায়েলের ভূখণ্ডে থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী, বন্দি এবং প্রবাসী ফিলিস্তিনিদের একটি অভিন্ন জাতীয় সংগ্রামের আওতায় আনা সম্ভব।

২০২২ ও ২০২৩ সালের ঘটনাবলি আল-আকসা নিয়ে হামাসের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। মসজিদ প্রাঙ্গণে ইসরায়েলিদের বারবার প্রবেশ, মুসল্লিদের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং সেখানে ইসরায়েলি ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান দাবির কারণে হামাসের আশঙ্কা হয়, বিদ্যমান ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলা হচ্ছে।

হেবরনের ইব্রাহিমি মসজিদের অভিজ্ঞতা ছিল একটি অশনিসংকেত। প্রথমে মসজিদটি বিভক্ত করা হয়, পরে সেখানে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা হয়। হামাসের কাছে মনে হয়েছিল, ফিলিস্তিনিদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ red line বা সীমারেখা ক্রমেই মুছে যাচ্ছে।

বন্দি ও সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া

চতুর্থ চাপটি ছিল ইসরায়েলের কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি বন্দিদের নিয়ে। ৭ অক্টোবরের আগে ইসরায়েলের কারাগারগুলোতে ৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বন্দি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিলেন। কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক রাখা হয়েছিল ১ হাজার ২০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনিকে।

ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ইতামার বেন-গভির ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর আরও বিধিনিষেধ আরোপ করতে শুরু করেন।

তবে বন্দিবিনিময়ের ইতিহাস হামাসকে ভিন্ন একটি শিক্ষা দিয়েছিল। ১৯৮৫ সালের জিব্রিল চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের কারাগারে আটক ১ হাজার ১৫০ জন বন্দিকে মুক্ত করা হয়েছিল। ২০০৪ ও ২০০৮ সালে হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের বন্দিবিনিময়ও একই বিষয় সামনে এনেছিল।

হামাসের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ছিল ২০১১ সালের গিলাদ শালিত বন্দিবিনিময়। ওই চুক্তিতে একজন ইসরায়েলি সেনার বিনিময়ে ১ হাজার ২৭ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল—কূটনৈতিক আলোচনায় যেখানে প্রায়ই অগ্রগতি হয় না, সেখানে বন্দি আটক করার মাধ্যমে দর-কষাকষির সুযোগ তৈরি হয়। ফলে ইসরায়েলি সেনাদের আটক করা হামাসের কাছে ৭ অক্টোবর উদ্ভাবিত কোনো নতুন লক্ষ্য ছিল না; বরং এটি ছিল তাদের আগে থেকেই অনুসরণ করা একটি কৌশলগত ধারণার অংশ।

পঞ্চম বিষয়টি ছিল আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ। সম্ভবত পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০২৩ সাল নাগাদ হামাস ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল যে আঞ্চলিক রাজনীতিতে এমন পরিবর্তন আসছে, যার ফলে ফিলিস্তিন প্রশ্ন একেবারেই গুরুত্বহীন হয়ে পড়তে পারে।

২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তি দেখিয়ে দিয়েছিল, ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান ছাড়াই আরব সরকারগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারে। এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছিল—সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা।

এর প্রতীকী তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, ৭ অক্টোবরের হামলার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহু তাঁর ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গড়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং এশিয়া ও ইউরোপকে মধ্যপ্রাচ্যের মধ্য দিয়ে যুক্ত করার একটি অর্থনৈতিক করিডর।

নেতানিয়াহু যে মানচিত্র প্রদর্শন করেছিলেন, তাতে কার্যত ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনকে ইসরায়েল হিসেবে দেখানো হয়েছিল; সেখানে কোনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল না। হামাসের কাছে আশঙ্কাটি ছিল স্পষ্ট—আঞ্চলিক রাজনীতিতে ফিলিস্তিনকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হতে পারে।

এই ছিল সেই প্রেক্ষাপট, যার মধ্যে হামাস সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। গাজা তখনো অবরুদ্ধ, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ চলছিল, আল-আকসা ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছিল, হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বন্দি ছিলেন এবং সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া ফিলিস্তিনকে আঞ্চলিক রাজনীতির প্রান্তে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছিল।

এসব ঘটনা অবশ্য প্রমাণ করে না যে ৭ অক্টোবরের হামলাই ছিল একমাত্র কার্যকর প্রতিক্রিয়া। তবে এগুলো দেখায়, অভিযানটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছিল।

যৌক্তিকতার বিচার

কোনো সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা বিচার করতে হয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়কার পরিস্থিতির ভিত্তিতে, পরবর্তী ফলাফল দেখে নয়। গাজার ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করার পর পেছন ফিরে মনে হতে পারে, যে সিদ্ধান্তের পরিণতিতে এত বিপর্যয় ঘটেছে, সেটি নিশ্চয়ই অযৌক্তিক ছিল। কিন্তু কৌশলগত সিদ্ধান্তের ন্যায়সংগত মূল্যায়ন এভাবে করা যায় না।

হামাসের সিদ্ধান্তের বিচার করার আগে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। গাজায় গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের দায় ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী এবং যারা এই কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেছে, তাদের। এখানে প্রশ্নটি হলো, হামাস সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া যথাযথভাবে অনুমান করতে পেরেছিল কি না এবং সেই প্রতিক্রিয়াকে নিজেদের কৌশলগত হিসাবের মধ্যে রেখেছিল কি না। ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের কারণে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড ঘটেছে কি না, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন।

হামাস নিশ্চয়ই ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক হামলার আশঙ্কা করেছিল। গাজার সীমান্ত বেড়া ভেঙে ফেলা, সামরিক অবস্থানগুলো দখল, শত শত ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীকে হত্যা এবং বিপুলসংখ্যক ইসরায়েলিকে আটক করার মতো অভিযানের পর ইসরায়েল বড় ধরনের যুদ্ধে জড়াবে না—এমনটা কোনো দায়িত্বশীল নেতা বিশ্বাস করতে পারেন না।

আগের যুদ্ধগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে হামাসের মার্কিন সহায়তার ব্যাপকতা সম্পর্কেও ধারণা থাকার কথা।

তবে বড় ধরনের সামরিক হামলার আশঙ্কা করা আর পরবর্তী নজিরবিহীন যুদ্ধের পূর্বাভাস দেওয়া এক বিষয় নয়। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধটি দীর্ঘস্থায়ী গণহত্যামূলক অভিযানে রূপ নেয়, প্রায় পুরো জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করে, গাজার বিশাল অংশ ধ্বংস করে এবং বিশ্বজুড়ে সমালোচনা সত্ত্বেও অনাহার ও বঞ্চনার পরিস্থিতি তৈরি করে।

যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রত্যাশিত হলেও সেই সমর্থনের ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্ব ছিল নজিরবিহীন। ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানি বাড়তে থাকা এবং আন্তর্জাতিক নিন্দা তীব্র হওয়ার পরও ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে অত্যাধুনিক অস্ত্র, ধ্বংসাত্মক গোলাবারুদ, গোয়েন্দা সহায়তা এবং কূটনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে গেছে।

ইউরোপের বড় দেশগুলোর সরকারও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অবস্থান বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, আরব ও মুসলিম দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত দুর্বল। ৭ অক্টোবরের আগে হামাসের কৌশলগত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ইরান, হিজবুল্লাহ এবং বৃহত্তর ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ নিয়ে আলাদা প্রশ্ন রয়েছে। হামাস বহু বছর ধরে এসব সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল এবং অঞ্চলের বিভিন্ন প্রতিরোধ আন্দোলনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। ২০২১ সালের সাইফ আল-কুদস সংঘর্ষের পর হামাসের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ফিলিস্তিনি সংগ্রামকে ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করার আগ্রহ ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছিল।

তবে নথিপত্রের ভিত্তিতে এ সরল দাবি সমর্থন করা যায় না যে ইরান বা হিজবুল্লাহ সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধে যোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলেই হামাস ৭ অক্টোবরের অভিযান চালায়।

হামাস আরও গভীর সমন্বয় চেয়েছিল, একাধিক রণাঙ্গন ও বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, লেবাননসহ অন্যান্য জায়গা থেকে চাপ সৃষ্টি হলে ইসরায়েলের সামরিক হিসাব জটিল হয়ে উঠতে পারে। হামাসের নেতারা ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ রাখছিলেন। কিন্তু যোগাযোগ থাকা আর বাধ্যতামূলক সামরিক জোট থাকা এক বিষয় নয়।

একইভাবে, ৭ অক্টোবরের অভিযানের সময় ও পরিচালনাগত বিস্তারিত তথ্য ইরান বা হিজবুল্লাহ আগে থেকেই জানত—এমন প্রমাণও নেই। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হামাসের কাছে এমন কোনো নিশ্চয়তা ছিল বলেও প্রমাণ পাওয়া যায় না যে ইরান বা হিজবুল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।

ভুল হিসাব ও বিকল্প পথ

হামাস যদি মনে করে থাকে যে অভিযান শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ইরান ও হিজবুল্লাহ সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধে যোগ দেবে, তাহলে তাদের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুমান শুরুতেই ব্যর্থ হয়েছিল। তবে বিদ্যমান তথ্যপ্রমাণ বরং ইঙ্গিত করে, হামাস তাৎক্ষণিক সর্বাত্মক যুদ্ধের পরিবর্তে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক চাপ বৃদ্ধির প্রত্যাশা করেছিল। তাদের ধারণা ছিল, একাধিক রণাঙ্গন থেকে চাপ তৈরি হলে ইসরায়েলের সামরিক ও কৌশলগত ব্যয় বাড়বে, যদিও তাতে সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু নাও হতে পারে।

বাস্তবে এমনটি ঘটেছিল, তবে গাজার ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকানোর মতো মাত্রায় নয়। হিজবুল্লাহ লেবানন থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটি সহায়ক রণাঙ্গন খুলেছিল। ইয়েমেন থেকে হুতিরা হস্তক্ষেপ করেছিল। ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মার্কিন অবস্থানে হামলা চালিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ইরান নিজেও আক্রান্ত হওয়ার পর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

যদি কৌশলগত ভুল হিসাব থেকে থাকে, তাহলে তা ছিল একাধিক প্রতিকূল পরিস্থিতি একসঙ্গে তৈরি হওয়ার বিষয়টি আগাম অনুমান করতে না পারা। এর মধ্যে ছিল—আগের প্রায় সব সীমা অতিক্রম করা ইসরায়েলি হামলা; গণহত্যার প্রমাণ বাড়তে থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমা দেশগুলোর ধারাবাহিক সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন; আরব ও মুসলিম সরকারগুলোর অসাধারণ দুর্বল প্রতিক্রিয়া; প্রতিরোধ অক্ষের সদস্যদের মধ্যে সীমিত সমন্বয়, যাদের অনেকেই অভিযানের সময় সম্পর্কে বিস্মিত হয়েছিল; এবং পশ্চিম তীর কিংবা ১৯৪৮ সালের সীমারেখার ভেতরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বড় ধরনের গণ-অভ্যুত্থান না ঘটা।

এসব বাধার কয়েকটি আলাদাভাবে হামাসের অনুমান করার কথা ছিল। কিন্তু সবগুলো বাধা একই সময়ে এত বড় মাত্রায় দেখা দেবে—তা আগাম বুঝতে না পারা ছিল গুরুতর কৌশলগত দুর্বলতা।

৭ অক্টোবরের প্রতিটি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে: এর বিকল্প কী ছিল?

হামাসের সামনে বিকল্প ছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংগঠনটির নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার ইতিমধ্যে সেসব বিকল্পের কয়েকটি অনুসরণ করেছিলেন। ২০১৭ সালে গাজায় নেতৃত্ব গ্রহণের পর তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে পুনর্মিলনের চেষ্টা করেন। অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিনি গাজার প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার মধ্যে সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতায় হামাস দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থাও অনুসরণ করেছিল। ২০১৮-১৯ সালে গাজার ফিলিস্তিনিরা ‘গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন’ নামে মূলত শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনে অংশ নেন। কিন্তু এর জবাবে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন। আহতদের মধ্যে শিশুরাও ছিল।

হামাস চাইলে সংযম বজায় রাখা, আরও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো, সীমিত মাত্রায় সংঘাত বাড়ানো, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা কিংবা কেবল সংগঠনটির টিকে থাকার ওপর মনোযোগ দেওয়ার পথ বেছে নিতে পারত।

২০১৭ সালে প্রকাশিত হামাসের ‘সাধারণ নীতি ও রাজনৈতিক অবস্থানসংক্রান্ত দলিল’ও সংগঠনটির উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক নমনীয়তার প্রমাণ দেয়। সেখানে ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে একটি পূর্ণ সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে জাতীয় ঐকমত্যের সূত্র হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল, যদিও ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পেছনের জায়নবাদী প্রকল্পের বৈধতা স্বীকার করা হয়নি।

২০২৩ সাল নাগাদ হামাসের নেতারা এসব পদ্ধতি নিয়ে বছরের পর বছর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু কোনো পদ্ধতিই গাজার অবরোধ তুলে নিতে, বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করতে, আল-আকসাকে সুরক্ষিত রাখতে, হাজার হাজার বন্দিকে মুক্ত করতে কিংবা আঞ্চলিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া উল্টে দিতে পারেনি।

৭ অক্টোবরের সমালোচনার বড় দুর্বলতা এখানেই। সিদ্ধান্তটি কৌশলগতভাবে ভুল বা অযৌক্তিক ছিল, তা প্রমাণ করতে পরবর্তী বিপর্যয়ের দিকে আঙুল তুললেই যথেষ্ট নয়। ৬ অক্টোবর হামাসের সামনে বাস্তবসম্মত কোন বিকল্প ছিল এবং সেই বিকল্প অনুসরণ করলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারত, তা-ও বিবেচনা করতে হবে।

অপেক্ষা করাও একটি সিদ্ধান্ত ছিল। হামাসের উপসংহার ছিল, অপেক্ষা করলে কৌশলগত পরিবেশ আরও খারাপ হবে এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ আরও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়বে। সেই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্তটির পেছনে যুক্তি ছিল না—এমন দাবি করা যায় না।

মূল্য ও পরিণতি

তাহলে হামাসের দৃষ্টিকোণ থেকে ৭ অক্টোবর কি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল? এটি সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। আমার বিশ্বাস, এখনই এর চূড়ান্ত উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।

মানবিক মূল্য ছিল ভয়াবহ। অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও কয়েক হাজার বেশি হতে পারে। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ। গাজার অধিকাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, অনেকে একাধিকবার। পরিবার, পাড়া-মহল্লা, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, হাসপাতাল, মসজিদ, গির্জা এবং বেসামরিক অবকাঠামোর বিশাল অংশ ধ্বংস হয়েছে।

কোনো কৌশলগত মূল্যায়নই এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করতে পারে না। একই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিও বিসর্জন দেওয়া যায় না: গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের দায় ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী এবং যারা সেই কর্মকাণ্ডে সহায়তা ও সমর্থন দিয়েছে, তাদের। কোনো প্রতিরোধ আন্দোলন যে শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করছে, সেই শক্তির সংঘটিত অপরাধের দায় তার ওপর চাপানো যায় না।

অন্যথায়, অধিক শক্তিশালী পক্ষ এক অসাধারণ ক্ষমতা পেয়ে যায়। বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে যথেষ্ট নিষ্ঠুরতার হুমকি দিলেই তারা প্রতিরোধের যেকোনো পদক্ষেপকে কৌশলগত বা নৈতিকভাবে অবৈধ বলে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, কারণ পরবর্তী সময়ে প্রতিরোধকারীদের ওপর ভয়াবহ শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিচার করার মানদণ্ড এমন হতে পারে না।

তবে গণহত্যার দায় যথাস্থানে নির্ধারণ করার অর্থ এই নয় যে ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব নিজেদের কৌশলগত সিদ্ধান্তের পর্যালোচনা থেকে অব্যাহতি পাবে। একটি প্রতিরোধ আন্দোলনের দায়িত্ব হলো নিজেদের সক্ষমতা, সম্ভাব্য পরিণতি, বিকল্প পথ এবং মিত্র ও প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য আচরণ মূল্যায়ন করা। এ কারণেই ৭ অক্টোবরের ঘটনা স্লোগানের পরিবর্তে গভীর বিশ্লেষণ দাবি করে।

৭ অক্টোবরের হামলা যে ফিলিস্তিন প্রশ্নের গতিপথ বদলে দিয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ওই দিনের আগে ফিলিস্তিন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছিল।

আব্রাহাম চুক্তি এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামো তৈরি করেছিল, যেখানে আরব সরকারগুলো ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিশ্চিত না করেই ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারত। সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এগিয়ে যাচ্ছিল। নেতানিয়াহু জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে এমন একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র দেখাতে পারছিলেন, যেখানে ফিলিস্তিন কার্যত অদৃশ্য।

৭ অক্টোবর সেই গতিপথ ভেঙে দেয় এবং ফিলিস্তিনকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনে।

ইসরায়েলের দখলদারত্ব, বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণ কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক পর্যবেক্ষণ ও সমালোচনার মুখে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নতুন প্রজন্ম শুধু ইসরায়েলের নীতি নয়, জায়নবাদ, বসতি স্থাপনকারী ঔপনিবেশিকতা, নাকবা এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে শুরু করে।

এই যুদ্ধ পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গভীর অসংগতিগুলোও সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে, যার প্রভাব ফিলিস্তিনের সীমানা ছাড়িয়ে তাদের গ্রহণযোগ্যতার ওপরও পড়েছে। আঞ্চলিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিন নিয়ে আলোচনার ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। যদিও বিভিন্ন দেশের সরকারি নীতি সেই পরিবর্তনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

তবে পরিবর্তন মানেই বিজয় নয়।

গাজাকে প্রায় অকল্পনীয় মূল্য দিতে হয়েছে। ফিলিস্তিনি সমাজ বিপুল ক্ষতির শিকার হয়েছে, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এখনো অনিশ্চিত এবং হামাস, ফিলিস্তিনি জাতীয় আন্দোলন, ইসরায়েল রাষ্ট্র ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের ওপর এর প্রভাব এখনো তৈরি হচ্ছে।

তাই ৭ অক্টোবরকে ঐতিহাসিক কৌশলগত বিজয় কিংবা ভয়াবহ কৌশলগত ব্যর্থতা—কোনোটিই বলে দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। এত বড় ঘটনার পরিণতি যখন এখনো unfolding বা বিকাশমান, তখন ইতিহাস সাধারণত চূড়ান্ত রায় দেয় না।

ইতিহাসের রায়

১৯৩৬ সালের ফিলিস্তিনি বিদ্রোহকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে পরাজিত বলে মনে হয়েছিল। প্রথম ইন্তিফাদা শেষ পর্যন্ত অসলো চুক্তির পথ তৈরি করেছিল। শুরুতে অনেকেই এটিকে ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই প্রক্রিয়া ভূখণ্ডের বিভক্তি, নিরাপত্তা সমন্বয়, বসতি সম্প্রসারণ এবং ব্যর্থ রাজনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর পূর্ণ তাৎপর্য বোঝা যায় সেসবের পরিণতির মধ্য দিয়ে, যা প্রকাশ পেতে কয়েক বছর, কখনো কখনো কয়েক দশকও লেগে যায়।

আক্রমণ, দখলদারত্ব ও বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কোনো জাতিকে অসাধারণ দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছে—এমন বহু উদাহরণ ইতিহাসে রয়েছে। কিন্তু সেই দুর্ভোগই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের ফলাফল নির্ধারণ করে দেয় না।

নাৎসি জার্মানিকে পরাজিত করতে গিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন দুই কোটিরও বেশি মানুষ হারিয়েছিল। ফরাসি ঔপনিবেশিকতা ও মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কয়েক দশকের যুদ্ধে ভিয়েতনাম লাখ লাখ মানুষ হারানোর পর পুনরেকত্রীকরণ ও স্বাধীনতা অর্জন করে। আফগানিস্তানও দুই দশকের মার্কিন দখলদারত্বে বিপুল মানবিক মূল্য দেওয়ার পর ২০২১ সালে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহার প্রত্যক্ষ করে।

এসব অভিজ্ঞতার সঙ্গে ফিলিস্তিনের পরিস্থিতির সরাসরি মিল নেই এবং যান্ত্রিকভাবে তুলনাও করা উচিত নয়। তবে এগুলো একটি বিষয় দেখায়: কোনো জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগের ব্যাপকতা দিয়ে একা নির্ধারণ করা যায় না যে তাদের প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত কৌশলগতভাবে ভুল ছিল কি না। সেই বিচার নির্ভর করে সংগ্রামটি কী অর্জন করেছে, কী বিকল্প ছিল এবং সময়ের সঙ্গে এর পরিণতি কীভাবে বিকশিত হয়েছে তার ওপর।

শেষ পর্যন্ত ৭ অক্টোবরের অভিযানকে ভয়াবহ কৌশলগত ভুল হিসেবেও দেখা হতে পারে। আবার এমন একটি মুহূর্ত হিসেবেও স্মরণ করা হতে পারে, যখন একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং ফিলিস্তিন প্রশ্ন আবার ইতিহাসের মঞ্চে ফিরে আসে।

এখনই একটি বিষয় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা যায়: হামাসের সিদ্ধান্তটি একটি সুসংগত কৌশলগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল। সংগঠনটির নেতৃত্ব মনে করেছিল, বিদ্যমান পরিস্থিতি টেকসই নয়, কারণ সময়ের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সামনে থাকা বিকল্পগুলো ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তাই তারা সেই গতিপথ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের মূল্য তারা সঠিকভাবে হিসাব করতে পেরেছিল কি না, সেটি আলাদা বিষয়। ভয়াবহ সামরিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা করা আর ইতিহাসের প্রায় সব সীমা অতিক্রম করা ধ্বংসযজ্ঞসহ গণহত্যামূলক অভিযানের পূর্বাভাস দেওয়া এক নয়।

পাশাপাশি, ইসরায়েলের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘস্থায়ী সমর্থনের মাত্রা, আরব ও মুসলিম সরকারগুলোর দুর্বল প্রতিক্রিয়া, আঞ্চলিক সামরিক হস্তক্ষেপের সীমাবদ্ধতা কিংবা পশ্চিম তীর ও ১৯৪৮ সালের ভূখণ্ডে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সীমিত প্রতিরোধের বাইরে বড় কোনো গণ-অভ্যুত্থান না ঘটার বিষয়গুলো হামাসের নেতৃত্ব সঠিকভাবে অনুমান করতে পেরেছিল কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়।

৭ অক্টোবরের হামলা চালানোর সিদ্ধান্তকে একটি কৌশলগত পছন্দ হিসেবে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একে ব্যাখ্যাতীত সহিংসতার বিস্ফোরণ হিসেবে দেখলে চলবে না। একই সঙ্গে সিদ্ধান্তটিকে সমালোচনার ঊর্ধ্বেও রাখা উচিত নয়।

কাজটি হলো, হামাস তখন কী জানত, কী নিয়ে আশঙ্কা করছিল, তাদের সামনে কী বিকল্প ছিল এবং ইসরায়েল, ফিলিস্তিনি জনগণ, প্রতিরোধ অক্ষ, আরব ও মুসলিম বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে তারা কী প্রত্যাশা করেছিল—সেসব পুনর্গঠন করা। এরপর সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবে যা ঘটেছে, তার তুলনা করতে হবে।

এটুকু বিশ্লেষণ শুরু করার জন্য যথেষ্ট, যাতে বোঝা যায় সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক ছিল কি না। কিন্তু সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত সঠিক ছিল কি না, তা বিচার করতে হলে ৭ অক্টোবরের ঐতিহাসিক পরিণতি পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার পর ফিলিস্তিনি সংগ্রাম কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটিও জানতে হবে।

Advertisement
Advertisement