ঢাকা,  সোমবার
২২ জুলাই ২০২৪

Advertisement
Advertisement

ভারতের রাজনীতিতে দ্রুত কমছে মুসলমানদের অংশ গ্রহণ

প্রকাশিত: ১৫:৩৬, ১৯ জুন ২০২৪

আপডেট: ২১:৩৬, ২২ জুন ২০২৪

ভারতের রাজনীতিতে দ্রুত কমছে মুসলমানদের অংশ গ্রহণ

ভারতে মুসলমানদের রাজনীতি

এবার বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় বিষয়টিকে অনেকে হিন্দুত্ববাদের পরাজয় হিসেবে দাবি করছে। তবে এ দাবি অবান্তর বলে তা উড়িয়ে দেয়া যাবে না। কারণ ভারত সৃষ্টির পর এবারই প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় কোনো মুসলমান মন্ত্রীর স্থান হয়নি। গত ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতের  লোকসভায় মুসলমান জনপ্রতিনিধির সংখ্যা কমতে থাকে। একইসঙ্গে সরকারেও মুসলমানদের অংশ গ্রহণ হ্রাস পায়। গত ২০১৪ ও ২০১৯ সালে সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয়টি পেয়েছিলেন দুজন মুসলিম এমপি। ২০১৪ সালে নাজমা হেপতুল্লাহ এবং ২০১৯ সালে মুখতার আব্বাস নাকভি।

১৯৫২ সালে ভারতের প্রথম নির্বাচন থেকে মুসলমান এমপির হার ৫ শতাংশের নিচে যায়নি। ১৯৫৭ সালে দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক আবহাওয়ার কারণে মুসলমান এমপির হার ৪ দশমিক ৬৬ এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৯৬ সালে ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ হয়েছিল। এ ছাড়া প্রতিবারই ভারতে মুসলমান এমপির সংখ্যা লোকসভায় ছিল ৫ শতাংশের ওপরে।

কংগ্রেসের শাসনামলেও লোকসভায় মুসলমান প্রতিনিধির হার ৫ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যে ছিল। ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচন থেকে ভারতে মুসলমান জনসংখ্যা কখনোই ১০ শতাংশের নিচে যায়নি। কিন্তু ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে এই হার দ্রুত কমতে শুরু করেছে। ২০১৪ সাল থেকে পরপর তিনটি নির্বাচনে লোকসভায় মুসলমান এমপির গড় হার ৪ দশমিক ৪৮। ১৯৫২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই গড় ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে লোকসভায় মুসলমান জনপ্রতিনিধিত্ব গড়ে দেড় শতাংশ কমেছে।

২০১৪ সাল থেকে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে বিজেপিবিরোধী সংখ্যাগরিষ্ঠ ও তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোও লোকসভায় মুসলমান প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিয়েছে। ২০১৪ সালে মোট ৩ হাজার ২৪৫ প্রার্থীর মধ্যে ৩২০ জন মুসলমান ছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালে অন্তত ৮ হাজার ৩৩৭ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, যার মধ্যে মুসলমান প্রার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৭৮ জন। মানে, ভারতে গত ১০ বছরে মুসলিম প্রার্থীর হার ৯ দশমিক ৯ থেকে কমে শূন্য  দশমিক ৯৩ হয়েছে।

দিল্লির গবেষক আসিফ মুজতবাকে উদ্ধৃত করে ‘মক্তব মিডিয়াই সম্প্রতি জানিয়েছে, এ মুহূর্তে যে আসনে মুসলমান জনসংখ্যা ও ভোটার বেশি রয়েছে, সেই আসন পরবর্তী সময়ে তফসিলি জাতি ও উপজাতির জন্য সংরক্ষিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ডিলিমিটেশনের কারণে।

কিন্তু ওপরের তথ্য থেকে পরিষ্কার, ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো বিজেপি বা হিন্দুত্বের ভয়ে মুসলমান প্রার্থী দেওয়া অসম্ভব হারে কমিয়ে দিয়েছে। যেমন কংগ্রেস ২০১৯ সালে দিয়েছিল ৩৪ জন, এবারে দিয়েছে ১৯ জন। তৃণমূল কংগ্রেস তেরো থেকে নেমেছে ছয়ে, সমাজবাদী পার্টি আট থেকে চারে, লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল পাঁচ থেকে দুইয়ে এবং বিজেপি তিন থেকে একে। তবে বিজেপি দু-একজনের বেশি মুসলমান প্রার্থী কোনোবারই দেয় না, এবারও দেয়নি।

ভারতে ২০১১ সাল থেকে মুসলমান জনসংখ্যার হার ১৪  দশমিক ২, অর্থাৎ ১৭ কোটির কিছু বেশি। ভারতে দীর্ঘদিন ধরে সেন্সাস বা আদমশুমারি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয় না, ফলে এ সংখ্যা সম্ভবত আরও বেড়ে থাকতে পারে। মুসলমান সমাজ জনসংখ্যার অন্তত ১৪ দশমিক ২ শতাংশ হলেও এবার লোকসভায় প্রতিনিধিত্ব ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। যাবতীয় তথ্য প্রমাণ করে, মুসলমান সমাজের সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ দ্রুতগতিতে কমছে।

এর অর্থ, ২০২৪ সালে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও ভারতের রাজনীতির ‘প্লুরালিস্ট বা বহুত্ববাদী চরিত্র হারিয়ে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের কাঠামো প্রতি নির্বাচনেই শক্তপোক্ত হচ্ছে। ওপরের পরিসংখ্যানই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী দলের শক্তি কমুক বা বাড়ুক, বিজেপিবিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো বিজেপির মোকাবিলা করতে গিয়ে আরও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে কমসংখ্যক মুসলমান প্রার্থী দিচ্ছে। তারা ধরেই নিচ্ছে যে, হিন্দু অঞ্চলে বা এমনকি সেখানে বড়সংখ্যক মুসলমান ভোটার রয়েছেন, সেখানেও মুসলমানদের জেতার সম্ভাবনা কম। এর ফলে মুসলমানরা শুধু সেই অঞ্চলেই মনোনয়ন পাচ্ছেন, যেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংখ্যা ৫০ শতাংশ বা তার বেশ খানিকটা বেশি।

এটা চলতে থাকলে নিশ্চিতভাবে ভারতে মুসলমান সমাজ ভারতের কয়েকটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। এখনো যেমন কিছু অঞ্চলে, যেখানে হিন্দু ভোটার বেশি, সেখানে মুসলমান প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বা জিতছেন, সেটা আর ভবিষ্যতে হবে না।

এবারেই পশ্চিমবঙ্গে মোট ছয়জন এমপির মধ্যে পাঁচজন এসেছেন মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে। ভবিষ্যতে এই ‘ট্রেন্ড সম্ভবত আরও বাড়বে। রাজ্যস্তরের নির্বাচনগুলোকে বিশ্লেষণ করলেও মোটামুটিভাবে একই ফল পাওয়া যাবে।

এখানে এটাও উল্লেখ্য, বিজেপি নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (এনডিএ) একজন মুসলমান প্রার্থী এবারের নির্বাচনে জেতেননি। বস্তুত, এনডিএর ২৯৩ জন এমপির মধ্যে মুসলিম, খ্রিষ্টান বা শিখ সমাজের সংখ্যালঘু এমপি একজনও নেই। শুধু উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচল প্রদেশ থেকে বিজেপির এক বৌদ্ধ এমপি এবারেও জিতেছেন।

ভারতে মুসলমান প্রতিনিধিত্ব ভবিষ্যতে আরও কমবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। সে কারণেই মুসলমান সম্প্রদায়ের বিষয় নিয়ে ভারতে যে ওয়েবসাইটটি নিয়মিত লেখালেখি করে, সেই ‘মক্তব মিডিয়ায় গত বছরে এক উপসম্পাদকীয়তে সমাজকর্মী ও সাংবাদিক শার্জিল ইমাম আনুপাতিক হারের ভিত্তিতে মুসলমান জনপ্রতিনিধি ভারতের পার্লামেন্টে পাঠানোর পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিলেন।

পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, আগামী দিনে যখন কেন্দ্রীয় স্তরে ভোটার বৃদ্ধির কারণে নতুন করে নির্বাচনী কেন্দ্র ভাগ হবে (ডিলিমিটেশন), তখন মুসলমান প্রতিনিধিত্ব আরও কমবে।

Advertisement
Advertisement

Notice: Undefined variable: sAddThis in /mnt/volume_sgp1_05/p1kq0rsou/public_html/details.php on line 531