প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবু
রংপুরের কাউনিয়ায় কারাগারে থাকা অবস্থায় ‘শিক্ষা ছুটি’র নামে বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে মীরবাগ ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবুর বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিতি, হাজিরা খাতায় ভুয়া স্বাক্ষর এবং আর্থিক অনিয়মসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
এসব অভিযোগের পর তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। বুধবার মাউশির রংপুর অঞ্চলের পরিচালক মো. গোলাম মাজেদের সই করা ওই নোটিশে সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।
কারাগারে থেকেও বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ
মাউশির নোটিশে বলা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা লঙ্ঘন করে গভর্নিং বডির অনুমোদন, চার বছরের চুক্তিপত্র এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়াই দীর্ঘদিন ‘শিক্ষা ছুটি’র নামে অনুপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ আলী বাবু।
এ ছাড়া দুর্নীতি ও ফৌজদারি মামলায় কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় প্রতারণামূলকভাবে অবৈধ সুবিধা নিয়ে সরকারি এমপিওভুক্ত পূর্ণ বেতন-ভাতা উত্তোলন ও আত্মসাৎ করার অভিযোগও আনা হয়েছে। মাউশির ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারি অর্থের অপচয়ের শামিল।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও হাজিরা খাতায় ছদ্মবেশে ও অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ‘ভৌতিক’ স্বাক্ষর করেছেন তিনি।
মাউশির তদন্তে ২০২৪ সালে ৪৪ দিন এবং ২০২৫ সালে ৯ দিন তাঁর সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকার তথ্যও উঠে এসেছে। তাঁর দীর্ঘ অনুপস্থিতি ও দায়িত্বে অবহেলার কারণে ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ইংরেজি বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
চাকরি থেকে বরখাস্তের বিষয়েও জবাব চাওয়া
মাউশির নোটিশে বলা হয়েছে, শিক্ষা বিধিমালা ও সরকারি চাকরি আইনের পরিপন্থী গুরুতর অসদাচরণ, জালিয়াতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে কেন তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না—তা সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
সরেজমিন তদন্তে অনিয়মের তথ্য
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, কারাগারে থেকেও শিক্ষা ছুটির নামে বেতন উত্তোলনসহ বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৯ আগস্ট মীরবাগ ডিগ্রি কলেজ পরিদর্শন করেন মাউশির রংপুর অঞ্চলের পরিচালক মো. গোলাম মাজেদ এবং উপপরিচালক (কলেজ) কামরুজ্জামান পাইকার।
পরিদর্শনের সময় তাঁরা কলেজের বিভিন্ন দাপ্তরিক নথিপত্র পর্যালোচনা করেন। এতে মোহাম্মদ আলী বাবুর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
এর পর আগস্ট মাস থেকে তাঁর বেতন বন্ধ করা হয়। ৩০ আগস্ট মাউশিতে পাঠানো তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ ও বিভিন্ন মতামত তুলে ধরা হয়।
মাউশির রংপুর অঞ্চলের পরিচালক মো. গোলাম মাজেদ বলেন, মোহাম্মদ আলী বাবুর বিরুদ্ধে বিনা অনুমতিতে দীর্ঘদিন অনুপস্থিতি, কারাবন্দী থাকা অবস্থায় অবৈধভাবে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন এবং হাজিরা খাতায় ভুয়া স্বাক্ষরের গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
হজে পাঠানো ও চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার অভিযোগ
মোহাম্মদ আলী বাবুর বিরুদ্ধে হজে লোক পাঠানো এবং চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলাও রয়েছে বলে জানান মাউশির ওই কর্মকর্তা।
তিনি জানান, ২০২৪ সালে হজে পাঠানোর নামে ৭৫ জন হজযাত্রীর সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে ওই বছরের ২০ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে চিঠি পাঠায় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
এর আগে হজযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে দিয়া ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি হজ এজেন্সির পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলী বাবুসহ তিনজনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জননিরাপত্তা বিভাগে চিঠি দিয়েছিল ধর্ম মন্ত্রণালয়।
দুই দফায় গ্রেপ্তার, কারাগারে থাকলেও এমপিও শিটে নাম
মাউশির রংপুর অঞ্চলের পরিচালক জানান, ২০২৪ সালের শেষ দিকে নীলফামারী থেকে মোহাম্মদ আলী বাবুকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর তিনি জামিনে বের হন।
সবশেষ গত ১৫ মে দিবাগত রাতে রংপুর মহানগর এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন ১৬ মে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় দুই মাস কারাগারে থাকার পর তিনি আবার জামিনে বের হন।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি কারাগারে থাকা অবস্থাতেও কলেজের এমপিও শিটে তাঁর নাম তালিকাভুক্ত ছিল। একই সময়ে মে, জুন ও জুলাই মাসের পূর্ণ বেতন-ভাতাও তাঁকে দেওয়া হয়।
তবে উপস্থিতি রেজিস্টারে তাঁর নামের পাশে ১০ মে থেকে ‘শিক্ষা ছুটি’ উল্লেখ করা হয়েছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে মীরবাগ ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ আলী বাবুর মোবাইল ফোনে কল করা হয় এবং খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবে এ বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।



.png)
.png)