ঢাকা,  বুধবার
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

কুমিল্লায় থামছে না কিশোর গ্যাং, অস্ত্রের মহড়া থেকে খুনে জড়াচ্ছে তরুণেরা

প্রকাশিত: ১২:৩৬, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কুমিল্লায় থামছে না কিশোর গ্যাং, অস্ত্রের মহড়া থেকে খুনে জড়াচ্ছে তরুণেরা

কিশোর গ্যাং

কুমিল্লা শহরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দিন দিন উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দল গঠন, মোটরসাইকেল ও দামি মুঠোফোন ঘিরে প্রভাব বিস্তার থেকে শুরু করে হত্যা, মাদক কারবার ও সংঘর্ষ—বিভিন্ন অপরাধে এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম আসছে।

সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনা নতুন করে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ও তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। চলতি বছরের সাড়ে আট মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় গ্যাং সদস্যদের নাম এসেছে বলে জানা গেছে। শহরে বর্তমানে অন্তত ২০টি গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।

রামদা-চাপাতি নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া

গত মে মাসের এক শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লার গোমতী নদীর তীরের ভাটারপুকুর থেকে কাপ্তানবাজার, বৌবাজার, চানপুর ও সংরাইশ এলাকায় ১০০ থেকে ১৫০ কিশোর ও তরুণ ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে মহড়া দেয়। তাদের কারও হাতে ছিল রামদা, কারও হাতে চাপাতি ও লাঠি। সামনে ছিল উচ্চ শব্দ করে চলা কয়েকটি মোটরসাইকেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েই তারা এই মহড়ায় নামে।

কাপ্তানবাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, অস্ত্রধারী কিশোরদের এমন মিছিল দেখে আতঙ্কিত হয়ে ব্যবসায়ীরা দোকানের শাটার নামিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন। পথচারীরাও ছোটাছুটি শুরু করেন। ভয়ে ওই ব্যবসায়ী নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি।

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুল আনোয়ার জানান, ওই দলটির নাম ‘ক্রাইম সেটআপ’। সেদিনই নতুন এই দলের আত্মপ্রকাশের তথ্য পুলিশের নজরে আসে।

অপ্রতিম হত্যায় সামনে এল গ্যাংয়ের ভূমিকা

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন নয়। তবে সম্প্রতি ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি জঙ্গলে নিয়ে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়া ও হত্যার ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এ ঘটনায় দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনও একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন বলে জানা গেছে। অপ্রতিমকেও সেই দলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। টিকটকের জন্য ভিডিও তৈরির আড়ালে অন্য কিশোরদের জড়ো করার চেষ্টা চলছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

অভিযুক্ত কিশোরদের কয়েকজনের দামি মুঠোফোন ও মোটরসাইকেল ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের ভাষ্য, তাদের মধ্যে একজন সৌদিপ্রবাসী বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আইফোন কিনেছিল এবং সেটি দিয়ে নিয়মিত টিকটক ভিডিও বানাত। আরেকজন কিনেছিল মোটরসাইকেল।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। মঙ্গলবার শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল করেন। তাঁদের অভিযোগ, অপ্রতিমের মা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কয়েকজন কিশোর গ্যাং সদস্যকে পুলিশে সোপর্দ করেছিলেন। সেই ক্ষোভ থেকে তাঁর সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

এক যুগে ১২ হত্যাকাণ্ডে নাম

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ২০১৫ সালের দিকে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তখন তিন-চারটি দল সক্রিয় থাকলেও ২০২২ সালের দিকে সেই সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২০টিতে দাঁড়ায়। শাখা ও উপদল ধরলে সংখ্যা আরও বেশি ছিল।

সেই সময় রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, ইগল, আরজিএস, র‍্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিএমসি, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ ও বসসহ বিভিন্ন গ্যাংয়ের নাম আলোচনায় আসে।

বিভিন্ন এলাকায় দেয়ালে গ্যাংয়ের নাম ও লোগো লেখা, মেসেঞ্জার গ্রুপ তৈরি, একই ধরনের পোশাক ও চুলের ছাঁট এবং নির্দিষ্ট আড্ডাস্থল—এসব ছিল তাদের পরিচিতির অংশ। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যার ঘটনায় এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম এসেছে। শতাধিক অন্যান্য অপরাধেও তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

এখন আলোচনায় পাঁচ গ্যাং

কুমিল্লা জেলা পুলিশের কাছে কিশোর গ্যাংয়ের হালনাগাদ কোনো তালিকা নেই। তবে অনুসন্ধানে শহরে বর্তমানে কিং স্কোয়াড, স্কোয়াড বা রতন গ্রুপ, ইগল, সিবিকে ও ক্রাইম সেটআপ—এই পাঁচটি গ্রুপ সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে। এর বাইরে অপু ও সাব্বিরের নামে আরও দুটি গ্রুপের কথা জানা গেছে।

২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট হাউজিং এলাকার কেটিসিসি মাঠে কিং স্কোয়াডের ২১ সদস্যকে আটক করে পুলিশ। তাদের বয়স ছিল ১৫ থেকে ২১ বছর। পুলিশের ভাষ্য, ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে তারা প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরে তাদের কাছ থেকে চাপাতি, চায়নিজ কুড়াল, হকিস্টিক ও রড উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের নথিতে গ্যাংগুলোর মধ্যে সদস্যদের দল বদল বা একাধিক দলের সঙ্গে চলাফেরার ঘটনাও রয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তানজিম আবদুল্লাহকে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানিয়েছিল, তিনি সিবিকে ও এর একাধিক উপদলের নেতৃত্ব দিতেন।

পাল্টাপাল্টি হামলা ও অস্ত্রের প্রদর্শন

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ধর্মসাগরপারের রানীর কুঠি এলাকায় নাফিজ অময়কে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় রতন গ্রুপের তিনজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত প্রায় ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। স্বজনদের ভাষ্য, হামলায় নাফিজের একটি হাত প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর জখম হয়।

এরপর ২৫ এপ্রিল রানীর দিঘি, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায় সিবিকে, ইগলসহ কয়েকটি পক্ষের অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটে। দুই দিন পর দুর্গাপুর ও রেসকোর্স এলাকায় সেনাবাহিনী ও র‍্যাবের যৌথ অভিযান এবং পুলিশের পৃথক অভিযানে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। যৌথ অভিযানে পিস্তল, রিভলভার, গুলি, দেশীয় অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের কথা জানানো হয়।

নির্দিষ্ট এলাকায় বেশি তৎপরতা

কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এখন আর কুমিল্লার নির্দিষ্ট একটি এলাকা বা অপরাধে সীমাবদ্ধ নেই। তবে কান্দিরপাড়, ধর্মসাগর, রানীর দিঘি, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়া–সংলগ্ন এলাকাগুলোতে সংঘাত বেশি বলে জানা গেছে।

মফিজাবাদ ও রেসকোর্স এলাকায় রতন নেটওয়ার্কের প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। অশোকতলায় গ্যাং-সংশ্লিষ্ট মাদক কারবার নিয়ে বিরোধে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। হাউজিংয়ের কেটিসিসি মাঠে কিং স্কোয়াড এবং গোমতীর তীরবর্তী ভাটারপুকুর, কাপ্তানবাজার, বৌবাজার, চানপুর ও সংরাইশ এলাকায় ক্রাইম সেটআপের তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেছে।

২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর অশোকতলায় সজীব হোসেন ওরফে বাবুকে মারধর ও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরদিন হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশের ভাষ্য, ঘটনার নেপথ্যে কিশোর গ্যাংয়ের মাদক কারবার ছিল।

গত ২৪ জুন কাঁটাবিল এলাকায় মাদক কারবার নিয়ে অপু ও সাব্বির গ্রুপের বিরোধের পর সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনায় ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইথান আহমেদ গুলিবিদ্ধ হয়। পরে পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করে এবং একটি বিদেশি পিস্তল ও ছয়টি গুলি উদ্ধারের কথা জানায়।

কিশোর গ্যাংয়ে শুধু কিশোররাই নেই

নাম ‘কিশোর গ্যাং’ হলেও এসব দলের সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক নয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে একটি অভিযানে ১৯, ২০, ২১, ২৮, ২৯, ৩৫, ৪৫ ও ৪৭ বছর বয়সী ব্যক্তিদের নাম আসে। সেখানে ৩৫ বছর বয়সী একজনকে অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ কারণে স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোরদের সঙ্গে বয়সে বড় তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের যোগাযোগের বিষয়টিও সামনে এসেছে। পুলিশ অপ্রতিমের সঙ্গে তাকে হত্যায় অভিযুক্তদের বন্ধুত্বকে ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

টিকটক, দামি ফোন ও মোটরসাইকেল

কুমিল্লার বিভিন্ন গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা গেছে। টিকটক ভিডিও বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে তারা একত্রিত হয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

গ্যাং সদস্যদের অনেকের হাতে আইফোনসহ দামি মুঠোফোন রয়েছে। এসব ফোনে ভিডিও তৈরি করে বিভিন্ন সংলাপ যুক্ত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি অনেকের কাছে রয়েছে মোটরসাইকেল। কিছু মোটরসাইকেলে অতিরিক্ত শব্দ তৈরির জন্য পরিবর্তন আনার কথাও জানা গেছে।

স্থানীয় মোটরসাইকেল ব্যবসায়ী মো. নাদিম খান বলেন, আর্থিকভাবে সচ্ছল না হলেও অনেক তরুণ দামি মোটরসাইকেল ও ফোন ব্যবহার করে। তাঁর মতে, এসব বিষয়ে নজরদারি না বাড়ালে গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধ করা কঠিন।

পুলিশের অভিযান, তবু কমছে না তৎপরতা

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, গত বছরের ৩০ নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২৫০ জনের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে বয়স কম হওয়ায় অনেকে গ্রেপ্তারের পর দ্রুত মুক্তি পেয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে। অনেকের মা-বাবাকে ডেকে মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সুপারের মতে, কিশোরদের বয়স কম হওয়ায় শুধু পুলিশের তৎপরতার মাধ্যমে এই অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।

অপ্রতিম হত্যায় অভিযুক্তদের বাড়িতে গিয়ে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেও পরিবার, বন্ধুত্ব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক যোগাযোগের বিষয়টি উঠে এসেছে। অভিযুক্তদের কয়েকজনের ক্ষেত্রে দামি ফোন ও মোটরসাইকেল তাদের সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, পরিবারকে সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং কী করছে—এসব বিষয়ে নজর রাখতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সব মিলিয়ে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন শুধু কিশোরদের বিচ্ছিন্ন অপরাধের বিষয় নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মাদক, অস্ত্র, মোটরসাইকেল, বয়সে বড় অপরাধীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন পক্ষের সংঘাত—সবকিছু মিলিয়ে এটি জটিল একটি সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে।

Advertisement
Advertisement