ঢাকা,  বুধবার
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Advertisement
Advertisement

বিবেকের কারণে ‘বন্দে মাতরম’ না গাইলে শাস্তি নয়: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

প্রকাশিত: ১৮:৫১, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিবেকের কারণে ‘বন্দে মাতরম’ না গাইলে শাস্তি নয়: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

ভারতীয় সুপ্রিমকোর্ট

বিবেকের তাড়নায় কেউ ভারতের জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে অস্বীকৃতি জানালে সেটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখা উচিত নয়—এমন মৌখিক পর্যবেক্ষণ করেছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার এক মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দেন।

কর্ণাটকী সংগীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণের করা এক রিট আবেদনের শুনানিতে আদালত বলেন, কোনো নাগরিক বিবেকের কারণে জাতীয় গানের পুরোটা গাইতে না চাইলে তাকে জোর করে গাওয়ানো বা শুধু না গাওয়ার কারণে শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি আদালত খতিয়ে দেখতে পারে। তবে জাতীয় গানের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা আদালতের এখতিয়ার নয় বলেও বেঞ্চ উল্লেখ করেন।

‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত যেভাবে

‘বন্দে মাতরম’-এর মোট ছয়টি স্তবক রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকারি ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে সাধারণত প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া হয়ে আসছে। কারণ, পরের স্তবকগুলোতে হিন্দু দেবী দুর্গা, কালী, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর উল্লেখ রয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে গানটির পূর্ণাঙ্গ অংশ নিয়ে আপত্তি ওঠার পর ১৯৩৭ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত জানতে চেয়েছিলেন। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলসহ নেতারা এ বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নেন। এরপর প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার রীতি চালু হয়।

আইনি সুরক্ষা নিয়ে নতুন বিতর্ক

২০২৬ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ‘বন্দে মাতরম’-কে জাতীয় সংগীতের মতো আইনি সুরক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এ জন্য ‘Prevention of Insults to National Honour (Amendment) Bill, 2026’ আনা হয়। বিলটিতে জাতীয় গান গাওয়ায় ইচ্ছাকৃত বাধা দেওয়া বা গান পরিবেশনের সময় কোনো সমাবেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাকে অপরাধের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়।

সংসদের উভয় কক্ষেই বিলটি পাস হয়েছে। এর আওতায় ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রতি অবমাননা, গান গাওয়ায় বাধা বা পরিবেশনের সময় বিশৃঙ্খলার জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

তবে মঙ্গলবারের শুনানিতে মূল প্রশ্নটি ছিল—কেউ যদি গানটিতে অংশ না নেন, বিশেষ করে বিবেক বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কারণে পুরো গানটি না গান, তাহলে শুধু সেই কারণে তাকে অপরাধী করা যাবে কি না।

বিজোই ইমানুয়েল মামলার নজির টানলেন বিচারপতি

শুনানির সময় বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ১৯৮৬ সালের বহুল আলোচিত বিজোই ইমানুয়েল মামলার প্রসঙ্গ তোলেন। ওই মামলায় ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কেরালার একটি স্কুলে জাতীয় সংগীত না গাওয়ায় তিন শিক্ষার্থীকে আইনি সুরক্ষা দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট।

সুপ্রিম কোর্টের সেই রায়ে বলা হয়েছিল, জাতীয় সংগীতের প্রতি অসম্মান না দেখিয়ে শুধু গানটিতে কণ্ঠ না মেলানোর কারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান প্রয়োগ করা যায় না।

এই নজির সামনে রেখে মঙ্গলবারের শুনানিতে আদালত বিবেক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়টি বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে।

কেন্দ্রের বক্তব্য জানতে চেয়েছে আদালত

মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারের মতামত জানতে চেয়েছে এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে তা জমা দিতে বলেছে। তবে এ বিষয়ে কেন্দ্রকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়নি।

মামলাটি করেছেন বিশিষ্ট কর্ণাটকী সংগীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণ। তাঁর আবেদনে জাতীয় গানের ছয়টি স্তবক গাওয়া বাধ্যতামূলক করার সরকারি বিধান এবং তা না মানলে শাস্তির আইনি কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

শুনানিতে তীব্র বাক্‌বিতণ্ডা

শুনানির সময় আবেদনকারীর আইনজীবী এস মুরলীধর ও সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার মধ্যে তীব্র বাক্‌বিতণ্ডা হয়।

মুরলীধর যুক্তি দেন, ‘বন্দে মাতরম’-এর শেষ চার স্তবকে হিন্দু দেবীদের উল্লেখ রয়েছে। তাই পুরো গান গাওয়া বাধ্যতামূলক করা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাঁর দাবি, জাতীয় ঐকমত্য বা পর্যাপ্ত জনমত তৈরির প্রক্রিয়া ছাড়াই সংশোধনী আনা হয়েছে।

জবাবে তুষার মেহতা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই আইন প্রণয়ন করা হয়। এ সময় তিনি নকশালপন্থীদের চিন্তাভাবনার প্রসঙ্গ তোলেন। মুরলীধর এর প্রতিবাদ করে বলেন, স্বাধীনচেতা মানুষ হওয়া মানেই নকশালপন্থী হওয়া নয়।

বিচারপতিরা এই বিতর্কে হস্তক্ষেপ করেননি। তবে জানিয়েছেন, আইনজীবীদের ওই মন্তব্যগুলো আদালতের নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।

কংগ্রেসের অনুষ্ঠানে এখনো প্রথম দুই স্তবক

কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন আইনি উদ্যোগের মধ্যেও কংগ্রেসের দলীয় অনুষ্ঠানগুলোতে এখনো ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার রীতি অব্যাহত রয়েছে।

সম্প্রতি কর্ণাটক বিধানসভা ও বিধান পরিষদে কংগ্রেসের বিধায়কেরা প্রথম দুই স্তবক গেয়ে থেমে যান। এর প্রতিবাদে বিরোধী সদস্যরা পুরো গানটি পরিবেশন করেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে।

কংগ্রেস নেতাদের বক্তব্য, প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার রীতি ১৯৩৭ সাল থেকেই চলে আসছে এবং এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসুসহ তৎকালীন নেতাদের সিদ্ধান্ত জড়িত।

ওমর আবদুল্লাহর অবস্থান

‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে বিতর্কে জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহও অবস্থান জানিয়েছেন। সরকারি এক অনুষ্ঠানে কংগ্রেস নেতারা প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার ওপর জোর দিলেও ওমর বলেন, সরকার আইন ভঙ্গ করতে পারে না।

কংগ্রেসকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, তারা ক্ষমতায় এলে আইন পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু আইন পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তিনি বিদ্যমান আইন মেনেই চলবেন।

ওমর বলেন, ‘আমি চাই না কাশ্মীরিদের এ কারণে জেলে যেতে হোক।’

এদিকে সুপ্রিম কোর্টে টি এম কৃষ্ণের মামলার শুনানি এখনো চলমান। ফলে ‘বন্দে মাতরম’ না গাওয়া, আংশিক গাওয়া এবং ইচ্ছাকৃতভাবে গানটিতে বাধা দেওয়ার মধ্যে আইনি পার্থক্য কী হবে—সেটি আদালতের পরবর্তী শুনানি ও কেন্দ্রের বক্তব্যের পর আরও স্পষ্ট হতে পারে।

Advertisement
Advertisement