গাজী নজরুল ইসলাম
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে গত দুই মাসে একের পর এক ঘটনা ঘটেছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই প্রবীণ রাজনীতিক প্রথমে ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় আলোচনায় আসেন। পরে দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ার কথা জানিয়ে তাঁকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী। এরপর তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর মধ্যেই তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যু নতুন করে তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ন্যাম ভবনের এসব ফ্ল্যাট সংসদ সদস্যদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ এবং গাজী নজরুলকে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তবে মামলায় করা নির্যাতনের অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়া থেকে দলীয় বহিষ্কার
ঘটনার সূত্রপাত জুলাইয়ের শেষ দিকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুলের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর অনেক নেতা-কর্মী ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেন। পরে গাজী নজরুল নিজেই জানান, ভিডিওর তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম।
গাজী নজরুলের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমের সম্মতিতে মরিয়মকে বিয়ে করেন তিনি। এরপর বিষয়টি নিয়ে জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক তদন্ত শুরু করে।
২২ জুলাই দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জামায়াত জানায়, দলীয় তদন্তে তাঁর ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হয়েছে। পরে সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনকেও বিষয়টি জানানো হয়।
বহিষ্কারের পরও সংসদ সদস্য পদ নিয়ে প্রশ্ন
দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ তখনই বাতিল হয়নি। তিনি নিজেও বলেছিলেন, দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি বহাল আছেন।
এরপর সংসদের বিভিন্ন কার্যক্রমে তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাঁকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। সরকারি প্রতিশ্রুতি-সম্পর্কিত কমিটিতে তাঁর নাম রাখা নিয়েও বিতর্ক হয় এবং পরে নাম বাদ দেওয়া হয়।
সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, শুধু কোনো রাজনৈতিক দল একজন সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলেই তাঁর সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়—এমন সরাসরি বিধান নেই। এ বিষয়ে স্পিকার সিদ্ধান্ত দিতে পারেন এবং প্রয়োজনে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাতে পারেন। তবে এ বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেননি।
এরপর মরিয়মের মৃত্যু
বহিষ্কারের প্রায় দুই মাস পর, ২০ সেপ্টেম্বর মরিয়ম খাতুনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ প্রথম দিকে ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি হত্যা, তা নিশ্চিত করেনি। পরে মরিয়মের বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের বিয়েতে তাঁর মামা ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা ছিল। বিয়ের পর মরিয়ম তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করতেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এগুলো বাদীপক্ষের অভিযোগ, যার সত্যতা এখনো তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়নি।
মৃত্যুর আগের কয়েক ঘণ্টা
এজাহারে বলা হয়েছে, ২০ সেপ্টেম্বর বেলা আনুমানিক ৩টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে কোনো একসময় মরিয়মের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত বাসায় আসতে বলেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাসুম বিল্লাহ সেখানে গিয়ে মেয়েকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি কথিত আত্মহত্যার নোটও উদ্ধার করা হয়। এতে বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা ও কাছের মানুষের কারণে বিপর্যস্ত হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নোটটি মরিয়মের নিজের কি না, তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
দুই মাসে বদলে গেছে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপট
মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে ঘটনাপ্রবাহ একের পর এক নতুন মোড় নিয়েছে। জুনে দ্বিতীয় বিয়ে, জুলাইয়ে সেই সম্পর্কের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও প্রকাশ, এরপর জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার এবং সংসদ সদস্য পদ নিয়ে অনিশ্চয়তা—এরপর সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের মৃত্যু ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের তদন্ত এখনো চলছে। ফলে মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং মামলায় ওঠা অভিযোগের সত্যতা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের তিনবারের এই সংসদ সদস্য সর্বশেষ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে সংসদে যান। কিন্তু সংসদে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ব্যক্তিগত জীবন, দলীয় অবস্থান এবং এখন ফৌজদারি মামলাকে কেন্দ্র করে তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এই ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।



.png)
.png)